পাশাপাশি শুকনো মুখে হেঁটে আসছিলেন মিলনবাবু, মিলনলাল সেনগুপ্ত। তাঁর দালালগিরির সুদীর্ঘ জীবনে তিনি আর কখনও এতটা অসফল, এতটা হতাশ হননি। ব্যাপারটা কী যে হল, পরপর পাঁচবার ফুঃ, এরকম তো হওয়ার কথা নয়–কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না মিলনবাবুর।
ঘটনাটা বোধহয় আর বেশিক্ষণ হেঁয়ালির কুয়াশায় ঢেকে রাখা উচিত হবে না। এরপরে পাঠিকাসুন্দরী হয়তো নিজেই ঠোঁট উলটিয়ে ফুঃ বলে গল্পটা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন।
সুতরাং।
সুতরাং গল্পটা বরং সংক্ষেপে আদ্যোপান্ত বলি। এবং একমাত্র বলি যে গল্পটা ঠিক গল্প নয়, একেবারে সাহেবরা যাকে বলে জীবন থেকে নেওয়া, ঠিক তাই। সুতরাং এই গল্পে যদি চরিত্রাবলির নামধাম ঠিকানা ঘটনা কোনও কারণে মিলে যায় তার জন্য সম্পূর্ণ দায়িত্ব এই গল্পকারের এবং তার অক্ষম কল্পনাশক্তির।
বিধান সরণিতে অর্থাৎ পুরনো কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে খুব নাম করা গয়নার দোকান চক্রবর্তী অ্যান্ড কোম্পানি, গোল্ড মার্চেন্টস অ্যান্ড জুয়েলার্স। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে রমরমা চলছে এই দোকান, বাঙালির যেকোনও ব্যবসার পক্ষেই সেটা গৌরবজনক। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়েছেন মূল প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গত বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তীর পৌত্র শ্রীযুক্ত অমরজিৎ চক্রবর্তী।
চক্রবর্তী ব্রাহ্মণের পক্ষে সোনার গয়নার ব্যবসা, স্যাকরার পেশা খুব স্বাভাবিক নয়। কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল একটি সামান্য এবং পুরনো কারণে।
বৈকুণ্ঠনাথের পিতৃনিবাস ছিল উত্তরবঙ্গের কোনও এক জেলায়। চল্লিশ বছর বয়েসে পিতৃহীন হয়ে একটা সাবেকি বড় সংসারের পুরো দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। তখনও তার কনিষ্ঠতমা বোনের বিয়ে হয়নি। গৃহেনগদ অর্থ বিশেষ ছিল না কিন্তু স্থায়ী ধন ছিল মা ঠাকুমার স্বর্ণালংকার। কালাশৌচের বছর পার হতেই বোনের বিয়ে স্থির করে ফেললেন বৈকুণ্ঠনাথ। বোনের বিয়ের আগে নতুন গয়না করতে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে কিছু পুরনো ভারী অলংকার নিয়ে বৈকুণ্ঠনাথ কলকাতায় আসেন। বড়বাজারে, বউবাজারে দু-চারটি গয়নার দোকানে ঘোরাঘুরি করার পর তরুণ বৈকুণ্ঠনাথ একটি তত্ত্ব অবহিত হন যে পুরনো গয়না ভেঙে নতুন গয়না করাতে গেলে পানমরা নামক একটি পদার্থ যায়। পুরনো গয়না বিক্রি করতে গেলেও ঠিক তাই। দশ ভরি ওজনের পুরনো সোনার গয়নার বদলে বড় জোর সাড়ে আট, নয় ভরি নতুন সোনার গয়না পাওয়া যাবে, বেচতে গেলে অনেক সময় তার চেয়েও কম।
বৈকুণ্ঠনাথের উপায় ছিল না, তিনি বাধ্য হয়ে পানমরা বাদ দিয়ে কিছু পুরনো গয়নার বদলে নতুন গয়না বানিয়ে এবং কিছু সোনা পানমরা বাদ দিয়ে বেচে অর্থসংগ্রহ করে বিয়ের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফিরলেন।
কিন্তু এই পানমরা ব্যাপারটা তার মাথার মধ্যে প্রবেশ করে গিয়েছিল। নতুন গয়নায় পানমরা থাকে না অথচ সে গয়না পুরনো হলেই সেটার মধ্যে পানমরা প্রবেশ করে এবং সোনা কেনাবেচা করতে গেলে বা সোনার গয়না বানাতে গেলে অতি ধুরন্ধর এবং বিচক্ষণ ক্রেতাকেও যে পানমরা ব্যাপারটা মেনে নিতে হয়–এই ঘটনার তাৎপর্য বৈকুণ্ঠনাথের মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল।
সে যা হোক বোনের বিয়ে ভালভাবে মিটে গেল। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পুরোদমে চলছে। একদিন কলকাতায়ও বোমা পড়ল, কলকাতা থেকে দলে দলে লোক পালাতে লাগল, লোক পালানোর রীতিমতো হিড়িক পড়ে গেল। দোকানে দোকানে তালা ঝুলল, অবিশ্বাস্য সব কম দামে চালু ব্যবসা বিক্রি হয়ে যেতে লাগল। কলকাতায় বাড়ির দাম হু হু করে পড়ে যেতে লাগল, হাজার হাজার শূন্য বাড়ির দরজায় লাগানো হল টু-লেট বিজ্ঞাপন, মানে ভাড়া দেওয়া হবে।
এই সময়েই অসম সাহসী বৈকুণ্ঠনাথ গ্রামের জমিজমা সব বেচে দিয়ে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে একটি জুয়েলারি দোকান এবং হাতিবাগানে একটা দোতলা বাড়ি কিনে কলকাতায় উঠে এলেন। কয়েকদিন আগেই কলকাতায় বোমা পড়েছে এই সময় গ্রাম থেকে কলকাতা চলে আসায়, যখন সবাই গ্রামে পালাচ্ছে, অনেকে বৈকুণ্ঠনাথকে উন্মাদ ভেবেছিলেন কিন্তু তা না হলে তো তিনি খাস কলকাতায় সাড়ে এগারো হাজার টাকায় দোতলা বাড়ি আর দুহাজার টাকায় আসবাব সমেত দোকান কোনওদিনই পেতেন না।
প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে কথা এসব। গত অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে চক্রবর্তীদের সোনার দোকান রমরমা চলেছে। বৈকুণ্ঠনাথও বহুদিন বিগত হয়েছেন।
আমাদের এই গল্প বৈকুণ্ঠবাবুর নাতি অমরজিৎকে নিয়ে। অমরজিৎ বছর খানেক আগে পিতৃহীন হয়েছে, সেই এখন দোকান ব্যবসার মালিক। তাঁর পিতামহ তার বাবাকে একুশ বছর বয়েসে এবং তাকে বাইশ বছর বয়েসে বিয়ে দিয়েছিলেন।
এখন অমরজিতের বয়েস পঁয়ত্রিশ, তার স্ত্রী শ্যামলীর বয়েস অমরজিতের ধারণা তার থেকে কিছু বেশিই হবে অন্তত ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ তো হবেই। তাদের পাঁচটি ছেলেমেয়ে, তার মধ্যে প্রথম তিনটি মেয়ে এবং তারপরে যমজ ছেলে।
এই বয়েসেই শ্যামলী কেমন যেন মোটা, থপথপে হয়ে গিয়েছে, রাত দিন পান দোক্তা চিবোচ্ছে, টানা রিকশায় চড়ে ঘুরে ঘুরে বাংলা সিনেমা দেখছে, না হয় বাড়িতে বসে টিভিতে বস্তাপচা সিরিয়ালে সময় নষ্ট করছে। লোডশেডিংয়ের সময় শ্যামলীর টিভি দেখতে যাতে বাধা না হয় সে জন্য অমরজিৎকে শক্তিশালী ইনভারটার কিনতে হয়েছে।
