এ তবু একরকম। আজ দুপুরে যে সিনেমাটি দেখেছি, সেটা অসাধারণ ফিল্মের সিম্বল। কী অবস্থা যাচ্ছে বলতে গিয়ে সেদিন আপনি রসিকতা করেছিলেন যে–কে একজন আপনার পরিচিত ফিল্ম তুলছে, তার বইয়ে কোনও মৃত্যুর দৃশ্য নেই। দেখানো হল একজন লোক রাস্তা পার হচ্ছে উলটোদিক থেকে, বহুদূরে একটা গাড়ি আসছে, তারপরেই আদিগন্ত সবুজ, সতেজ ফলভারনমিত পটলক্ষেত, একজন পটল তুলছে অর্থাৎ পূর্ব দৃশ্যের পথচারীটি লরি চাপা পড়ে পটল তুলল।
এখানে অন্য একজন সাংবাদিক বললেন যে, কোনও একটা ফিল্মে নাকি দেখানো হয়েছে যে ভীষণ ভিড়ের ট্রেনে একটা লোক পকেটে অনেক টাকা নিয়ে যাচ্ছে। তার পরের দৃশ্যে একটা লোক। স্টেশনে একটা দোকান থেকে এক প্যাকেট কঁচি সিগারেট কিনল। সিজার্সের প্যাকেটটা একবার ক্লোজ আপে দেখানো হল। এর পরেই প্রথম লোকটি হায় হায় করছে, আর দ্বিতীয় লোকটি দ্রুত হাঁটছে। অর্থাৎ, প্রথম লোকটির পকেট কেটে দ্বিতীয় লোকটি পালাচ্ছে। কঁচি হল পকেট কাটার প্রতীক।
ভদ্রলোকের গল্প শুনে আমরা খুব হাসলাম। দুপুরের সিনেমা দেখে কিন্তু খুব ঘাবড়িয়ে গেলাম। জানি না, এটাও সিম্বল কিনা। দেবদারু আর পাইনের গাছ, আকাশে বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ, নায়িকা ঘুরে ঘুরে গুনগুন করে গান গাইছেন–আশ্চর্য মোহময় পরিবেশ। এমন সময় কড় কড় কড়াৎ, বিনামেঘে বজ্রপাত। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশ থেকে ছিটকে এসে নায়িকার মাথায় লাগল। তারপরে ডেড আউট। পরের দৃশ্যে নায়িকা হাসপাতালে, মাথায় ব্যান্ডেজ। একেই বোধ হয় বজ্রাহত বলে।
বিশ্বাস করুন, এরপরেও আরেকটা বই দেখেছি। এরকম বিশ্বস্ত সাংবাদিক আর জীবনে পাবেন। এ বইটি ক্রাইম ড্রামা। অনেকটা আমাদের বোম্বাইয়ের বইগুলোর মতো। বোম্বাইয়ের বই জানেন তো, অবশ্য আপনি খুব বেশি দেখেননি, সেই লাস্ট সিন নায়ক আর ভিলেন, জাহাজের মধ্যে রিভলভার হাতে মারামারি। দুজনের হাত থেকে রিভলভার খসে সমুদ্রে পড়ে গেল, এবার বেরুল। ছোরা। ছোরা হাতে দুই জনে জাপটাজাপটি করতে করতে ঢুকে পড়ল বয়লারের মধ্যে, সেখান থেকে মেশিনের মধ্যে দিয়ে জাহাজের চোঙার ভিতর দিয়ে আগুন আর ধোঁয়ার সঙ্গে দুজনে বেরিয়ে এল, উঠে গেল জাহাজের মাস্তুল বেয়ে। তারপর দুই জনেই পড়ল সমুদ্রের জলে। এর মধ্যে একবার সাগরের মধ্যে ক্লোজআপে একটা ক্ষুধার্ত হাঙর দেখানো হয়েছে। পড়া মাত্র হাঙর এসে ভিলেনকে ধরল, ধরেই তাকে গিলে ফেলল। ভাববেন না যেন, এইখানেই বই শেষ হল। এর পরেও আছে দশ মিনিট ধরে সাসপেন্স, নায়কের কী হল? সমুদ্রের তীর দেখানো হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে কৃষ্ণশাড়ি পরিহিতা ব্যাকুলা নায়িকাকে দূরের জাহাজে করুণ উদাত্তস্বরে গান গাইতে, কিন্তু নায়কের কী হল? দর্শক সমাজ উৎকণ্ঠিত, ক্ষুধার্ত হাঙর নায়ককে কি ভিলেন ভেবে খেয়ে ফেলল। না তা হয় না কোনওদিন; দেখা গেল হাঙরের পিঠে নায়ক চেপে বসেছেন আর দুই হাত দিয়ে ধারালো দাঁত সমেত হাঙরের চোয়াল চিরে ফেলেছেন, হাতের মাসলগুলো ফুলে উঠেছে। দর্শক-সাধারণ হাততালি দিল, নায়িকা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। এখন সম্মুখে নিরুদ্বিগ্ন মধুর জীবন।
আমি একবার একজন পরিচালককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মশায়, ভিলেনকে হাঙর খেয়ে ফেলার পর ওই দশ মিনিট দর্শকদের ঝুলিয়ে রাখার মানে কী?
তিনি অবাক হয়েছিলেন, সে কী বুঝতে পারেননি?
আজ্ঞে না।
হাঙর আগে ভিলেনকে খেয়ে হজম করুক, তারপর নায়ক তাকে মারবে। না হলে আবার তো ভিলেন বেরিয়ে আসতে পারে, তার মানে আরও দেড় হাজার ফুট। আর বলবেন না মশায়, কাঁচা ফিল্মের যা বাজার হয়েছে।
আজ যে ক্রাইমড্রামা দেখলাম, সেটাও মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশের, তবে একটু আলট্রামডার্ন; আর সেখানে বোম্বে ফিল্মের খুব কদর। তাদেরও লাস্ট সিন ওই একই রকম, সেই জাহাজে মারামারি সেই নায়ক আর ভিলেন। কিন্তু একটু অন্যরকম। নীচে উত্তাল তরঙ্গসংকুল সমুদ্র, নায়ক আর ভিলেন ধস্তাধস্তি করতে করতে জাহাজ থেকে পড়ল, কিন্তু পরের দৃশ্যে দেখা গেল সমুদ্রের নাম গন্ধ নেই, তৃণাচ্ছাদিত বিশাল প্রান্তরে দুজনে কুস্তি হচ্ছে, একপাশে নায়িকা পঁড়িয়ে কখনও হাততালি দিচ্ছে, কখনও চোখ মুছছে।
আজ এই পর্যন্ত। ভয়ংকর দাঁতে ব্যথা করছে। ছোটবেলা থেকে লক্ষ করছি, কেন জানি না, একসঙ্গে অনেক মেয়ে দেখলে আমার দাঁতে কেন যেন খুব ব্যথা হয়। ছোটবেলায় বিয়েবাড়িতে গেলেই পরদিন দাঁতে ব্যথা হত। বড় হয়ে ব্যাপারটা ভেবে দেখেছি কিন্তু কিছু বুঝতে পারিনি। প্রথম যৌবনে আড়াই বছর মেয়েদের কলেজে মাস্টারি করেছিলাম, চারটে দাঁত তুলে ফেলতে হয়েছিল। এ বয়সে আর সহ্য হয় না। এত চিত্রতারকার ভিড়, কী ভীষণ ব্যথা করছে যে মাড়ির দাঁতগুলোয়!
সিঙ্গাপুরী নৃত্যপটিয়সী চিত্রতারকা লুনমুন কাল এক সান্ধ্যবাসরে আমাকে বলেছিলেন, বাঙালিদের ঠোঁটের গড়ন তার খুব পছন্দ। আজ এমন সময় তিনি কোথায় থাকতে পারেন তারও একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
কিন্তু দাঁতের ব্যথায় যে গেলাম, এখন এই মধ্য রাত্রির নিস্তব্ধ মরু নগরে বেরোতে হচ্ছে ডেন্টিস্টের সন্ধানে, ভালয় ভালয় ফিরলে কালকের ডাকে পরবর্তী খবর বিস্তারিত জানাব, শুভরাত্রি। ইতি—
পুঃ বাসায় বাজার খরচ দিয়ে আসিনি। দয়া করে আপনার বউদিকে গোটা পনেরো টাকা পাঠিয়ে দেবেন আর দাঁতের ব্যথার কথাটা জানাবেন না।
ফুঃ
ঘরের মধ্যে সোফায় বসে একবার ফুঃ করেছিলেন অমরজিৎ। তারপর চুপচাপ গম্ভীর মুখে রাস্তায় বেরিয়ে এসে সাদা মারুতি গাড়িটার পেছনের সিটে বসে আবার আরেকবার ফুঃ করলেন। অমরজিৎ চক্রবর্তী।
