ওপাশের ফুটপাথে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটতে কাটতে এতক্ষণ জনার্দন নির্বিকারভাবে পল্টন মাধুরীকে দেখেছিল, হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছে। জনার্দনের মেজাজের সঙ্গে পল্টন আমাদের মতোই সুপরিচিত, সুতরাং সন্ত্রস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু মাধুরী প্রতিবাদ জানাল, হঠাৎ দোকানে ঢুকব কেন, কী ব্যাপার? এই মোড়ের মাথাতেই একটু দাঁড়াই না?
আরে, ওই ষাঁড়টা আসছে যে!পল্টনের কথা শুনে মাধুরী যখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখন রাস্তা পার হচ্ছে জনার্দন ধীর মন্দ গতিতে, দেখলে কিছু অনুমান করাই কঠিন।
মাধুরী যেন একটু চটেই গেল, মাথা খারাপ হল নাকি? ষাঁড়টা কী করবে?
কী আর করবে, গুঁতো দেবে! যা বলছি শোনো, এই দোকানের ভিতরে চলে এসো। পল্টন চাচা বাঁচা থিয়োরি অনুসরণ করে একাই দোকানে ঢুকে পড়ল।
একটা নিরীহ শিং কাটা ষাঁড়কে এত ভয়…
কথাটা শেষ করতে পারল না মাধুরীকরুণ আর্তনাদে আমরা ছুটে গেলাম। বিশেষ কিছু না পর পর দুটো গুঁতো–কাটা শিংয়ে এর বেশি প্রয়োজন ছিল না। শাড়ির চার জায়গা থেকে চারটে ভেঁড়া টুকরো, তিনটে চুলের কাঁটা, সামান্য রক্ত, কয়েকটি দ্রুত দীর্ঘশ্বাস আর গোটা দশেক ভাঙা লাল কাঁচের চুড়ি হাজরার মোড়ের ফুটপাথে একটি অসম্পূর্ণ প্রেম-কাহিনির উপর যবনিকা টেনে দিল।
ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের চিঠি
প্রিয় সম্পাদক,
প্ৰথম খবর এই যে ভালভাবে পৌঁছেছি। পথে যা যা ঘটবার যথারীতি ঘটেছে অর্থাৎ আকাশ মেঘলা থাকায়, পেশোয়ার থেকে প্লেন দেড় ঘণ্টা পরে ছেড়েছে। এখানকার এয়ারপোর্টে পাসপোর্ট চেক করে ফেরত দেওয়ার সময় আমারটা ভুল করে জনৈকা বেগম ফজল নাদিরাকে দিয়ে দেয়, আর তারটা আমাকে। পাসপোর্টে বেগমের ঠিকানা দেখে পালটাতে গিয়ে সে প্রায় জেল খাটার বন্দোবস্ত আর কী!
সে যা হোক, এসব কথা ফিরে গিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা যাবে। এখন ফেস্টিভ্যাল সম্বন্ধে কিছু খবর পাঠাই। কেন যে এই জুন মাসে মরুভূমির মধ্যে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়েছে, আমার মোটেই মাথায় আসছে না। ব্যাপারটা হয়তো পুরোপুরিই রাজনৈতিক, তাতে অবশ্য কী আসে যায়, আমার তো বিনি ভাড়ায় প্লেন চড়া হয়ে গেল।
কিন্তু মশা? কী ভয়ংকর মশা আফ্রিকার এই শহরে! ছোটবেলায় ভূগোল বইতে আফ্রিকার জীবজন্তুর মধ্যে মশার নাম ছিল কিনা কিছুতেই মনে পড়ছে না। চিত্রতারকা বা যারা এসেছেন, বেশ বহাল তবিয়তেই আছেন। তাদের, মুখ চোখ সারা শরীর পেন্ট করা, মশার কামড়ে কিছু করতে পারছে না। কিন্তু আমরা, হতভাগ্য ফিল্ম সাংবাদিকরা দিনে গরম এবং রাত্রে মশা–অস্থির, একেবারে পাগলের মতো হয়ে উঠেছি। আমার ক্যামেরার কেসটা বোধ হয় কাঁচা চামড়ার ছিল, মশায় কামড়ে সেটাকেও ফুটো ফুটো করে দিয়েছে।
গতকাল থেকে ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনটা ভাল পড়া নেই। এই ফিল্মগুলো সম্বন্ধে আলোচনা করতে ভরসা পাচ্ছি নে। যা হোক, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির নাম জানাব না।
প্রথম ফিল্মটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে। ভাষা কিছু বোঝা গেল না। তবে দেশটি খুব পর্দানশিন। এই বইয়ে সমস্ত মহিলা চরিত্র বোরখা পরিহিতা। একটি সিন আছে, পাঁচটি মেয়ে বোরখা পরে নাচছে। ইংরেজিতে বইয়ের বিজ্ঞপ্তি বাইরে দেখলাম তাতে লেখা রয়েছে কুইন অফ ডেসার্ট এই বইয়ের নায়িকা। শতাধিক বোরখার অন্তরালে সত্যিই কোনটি কুইন, সে রহস্য রয়ে গেল অবশ্য। পরে শুনলাম বোরখাবিহীনা পাত্রী কিছু কিছু মূল বইয়ে ছিল, কিন্তু বাইরে দেখানোর আগে সে দেশের সেন্সারবোর্ড সেই জায়গাগুলো কেটে দিয়েছে। হয়তো আপত্তির কিছু নেই, বেআব্রু রমণীদের বাইরে না পাঠানোই ভাল।
কালকের দ্বিতীয় বই এক সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের। দুঃখের বিষয়, সেই রাষ্ট্রের জনৈক চিত্র সাংবাদিকের সঙ্গে এখানে আসার সময় আলাপ হয়েছিল। তার কাছেই প্রথমে তাদের দেশের বইয়ের সম্বন্ধে আলোচনা শুনি। শখের থিয়েটারে যেমন মধ্যে মধ্যে প্রম্পটারের গলা শোনা গেলে, আপত্তির কিছু নেই, এঁদের সিনেমাতেও কখনও কখনও ডিরেক্টরের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সে এক বিষম অভিজ্ঞতা।
নির্জন সমুদ্রতীর। নারিকেল কুঞ্জে হাওয়া বইছে। অপরাহ্নের আলো ম্লান হয়ে আসছে। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ। নায়ক নায়িকা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এবং সেই চিরদিনের ডায়ালগ।
নায়ক : এই সমুদ্রতীরে আজ এই বিকালের আলো, আমার কেমন যেন মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
এর প্রতিবাদে নায়িকার যথারীতি করুণ অনুনয় এবং অবশেষে সহমরণের বাসনা। এই রোমান্টিক সিচুয়েশানে সমুদ্রের উদ্দাম হাওয়ায় অসম্ভূতপদা নায়িকা; নায়কের উড়ু উড়ু চুল, সহসা একটি কাংস্য কণ্ঠ শোনা গেল, যেন নিয়তি, যেন বুভুক্ষু দর্শকের অন্তরাত্মা কথা বলে উঠল,–
বুক থেকে শাড়ির আঁচল আরেকটু ফেলে দিন, আরেকটু ঘেঁষে দাঁড়ান। পরিচালকের কণ্ঠস্বর, নায়িকার প্রতি নির্দেশ স্পষ্ট শোনা গেল।
নায়িকার বাবা এইমাত্র মারা গেছেন। ও গড বলে সিনেমার সেই প্রবীণ ডাক্তার মাথার টুপি খুলে ফেলেছেন (সিনেমার ডাক্তারদের মাথায় কেন যে টুপি থাকে!), ঘরে সবাই নিস্তব্ধ, এক। নায়িকার চাপা গোঙানি ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই, হঠাৎ শোনা গেল, সাবধান পা নাড়াবেন না, সাবধান। মনে রাখবেন এটা মৃত্যুর দৃশ্য। মৃতের ভূমিকায় যিনি অভিনয় করছিলেন নিশ্চয়ই তার প্রতি এই নির্দেশ। কলকাতার স্টুডিওতে একবার এক ডিরেক্টর নাকি মৃতের ভূমিকার অভিনেতাকে বলেছিলেন, অমন কাঠ হয়ে পড়ে থাকবেন না, একটু লাইফ আনুন–এ অবশ্য তার চেয়েও মারাত্মক।
