দোকানে দোকানে বিক্রির জন্যে ঘুড়ি টাঙানো থেকেছে, কিন্তু জনার্দন সেদিকে চোখ তুলেও তাকাবে না। তার অপরিসীম উৎসাহ ছিল কাটাঘুড়ি খাওয়ায়। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় দেখেছি, কঞ্চি হাতে, বাঁশ হাতে ছেলেরা ছুটোছুটি করছে এদিক থেকে ওদিক। ভোকাটা-ভো, এই একটা ঘুড়ি কাটল-জনার্দন আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়িয়ে একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে কাটা ঘুড়িটা দেখল, তারপর কখনও হেলতে দুলতে কখনও ছুটে চলল ছেলেদের সঙ্গে। অত্যন্ত কায়দা করে গা। বাঁচিয়ে যাতে কারও বিশেষ কোনও চোট না লাগে, শিং দিয়ে একে একটা আলতো গুঁতো দিয়ে ওকে ছোট একটা ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে সর্বশেষ সে এক অত্যাশ্চর্য শারীরিক কৌশলে সামনের পা দুটো। আকাশের দিকে তুলে গলা বাড়িয়ে ঘুড়িটাকে জিভ দিয়ে ধরে ফেলত। এই প্রতিযোগিতায় হেরে হেরে শেষে আমাদের পাড়ার ছেলেরা ঘুড়ি ধরা ছেড়েই দিয়েছিল। দীর্ঘকাল আমাদের পাড়া থেকে খবরের কাগজে ঘটনা দুর্ঘটনায় ঘুড়ি ধরিতে গিয়া বালকের মৃত্যু এই রকম কোনও সংবাদ বেরোয়নি আর।
জনার্দনের এসব ব্যাপারের তবু ব্যাখ্যা ছিল। কিন্তু তার কতকগুলি আচরণ আমাদের বুদ্ধিরও অগম্য ছিল। ট্রাফিক সিগন্যাল আশ্চর্য বুঝত, পুলিশের হাত দেখলেই মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়ত, হাত নামালে তবে রাস্তা পার হত। যখন ট্রাফিক লাইটিং-এর ব্যবস্থা হল, একদিন দেখলাম জনার্দন খুব গম্ভীর হয়ে লালসবুজ আলোগুলো লক্ষ করছে, তারপর থেকে সবুজ আলো না দেখে রাস্তা পেরুত না।
রামপ্রসন্নবাবুর ভাগিনেয়ী যে সন্ধ্যাবেলা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করত আমরা কোনওদিনই টের পেতুম না, যদিনা একদিন অন্ধকারে তিনতলার চিলেকোঠায় জনার্দন উঠে যেত। সেদিন রুষ্ট যণ্ডের আক্রমণ থেকে গোপন প্রেমিকের আত্মরক্ষা অসম্ভব ছিল, যদি সে (পরে জানতে পেরেছিলাম) সেবছর লং ডিস্ট্যান্স জাম্পের বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন না হত। এক লাফে প্রেমিকের বাহুপাশ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে, তারপর হইচই, চোর-চোর, জনার্দন, রামপ্রসন্নবাবুর ভাগিনেয়ীর ফোঁপানি ইত্যাদি সে এক কেলেঙ্কারি।
পল্টনকেও জনার্দনই রক্ষা করেছিল। আমাদের সাধারণত জনার্দন কিছু বলত না, শুধু আমাদের পাড়ার মতির একটু পানদোষ ছিল, একবার প্রথমদিকে যখন সে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরত সেই সময় একদিন তাড়া করে জনার্দন তাকে ডাস্টবিনের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, নেশা না কাটা পর্যন্ত ছাড়েনি, ডাস্টবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোঁসফোঁস করেছে। শেষে মতির বাড়ির লোকেরা এবং আমরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম, জনার্দনও আর মতিকে কিছু বলত না, তবে বেপাড়ার মাতালদের সঙ্গে নিয়ে এলে তাদের পুঁতিয়ে একাকার করে দিত।
পল্টন যখন দাড়ি রাখল, পাগড়ি চাপাল তখন একদিন পল্টনের দিকেও তেড়ে গিয়েছিল জনার্দন, কিন্তু বিশেষ কিছু বলেনি। তবে চোখে একটা ওয়ার্নিং ছিল, যাকে বলা যেতে পারে অনুক্ত সাবধানবাণী। জনার্দনের সেই রোষ কষায়িত লোচন যে দেখেনি সে জানে না ব্যাপারটা কী। কিন্তু সামান্য একটা ষাঁড়ের চোখরাঙানিতে প্রেমে ইস্তফা দেবে পল্টনের গোঁয়ার্তুমি এত কম ছিল না।
ইতিমধ্যে জনার্দন খুব দুর্দান্ত হয়ে উঠেছিল, একটু বেপরোয়াই বলা যেতে পারে। একটা ঠেলাগাড়িওয়ালা পথ আটকিয়ে রাখার জন্যে তাকে কী সব কটুক্তি করেছিল, জনার্দন ঠেলাওয়ালাকে কিছু বলল না, তাড়া করে তাকে অন্য ফুটপাথে তুলে দিয়ে ফিরে এসে নৃশংসভাবে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে ঠেলাটাকে একেবারে চুরমার করে ফেলল। সেইদিন রাত্রেই জনাপাঁচেক ঠেলাওলা একত্র হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জনার্দনকে খুব মোটা দড়ি দিয়ে জড়িয়ে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে বেঁধে ওর শিং দুটো একেবারে নিমূল করে কেটে দিল। এর পরে দিন কয়েক জনার্দনকে বড় নির্জীব, অসহায় বলে মনে হল আমাদের। কোনওদিন তেল মাখানো হয়নি, কিন্তু ওরকম তৈলমসৃণ শৃঙ্গ বিশেষ দেখা যায় না। শিং কাটার পর জনার্দনকে মুকুটহীন সম্রাটের মতো মনে হত।
পল্টন-মাধুরী পর্ব তখন প্রায় জমে এসেছে। মজুমদারসাহেব সাড়ে বারো গজ কাপড় দিয়ে বিশাল ঘের দেয়া এক পাজামা করিয়ে দিয়েছে হাওড়া হাটের পাশের এক খাঁটি পাঞ্জাবি দরজির দোকান থেকে পল্টনকে। সেই পাজামা, গোলাপি কোর্তা, দাড়ি, জরির ঝিলিক-লাগানো পাগড়ি পল্টনকে আমরা বেশ এড়িয়ে চলতুম। কিন্তু মাধুরী বেশ ঘন হয়ে এল।
মধ্যে মধ্যে মাধুরীকে দেখা যেতে লাগল পল্টনের সঙ্গে। সেই সময়ের একদিনের ঘটনা।
.
আমরা মোড়ের মাথায় রেলিংয়ের উপর বসে সিগারেট খাচ্ছি, আর মাঝে মধ্যে এদিক-ওদিক তাকিয়ে উদাস মন্তব্য করছি। এমন সময় মজুমদারসাহেব বললেন, ওই যে পল্টন!
তাকিয়ে দেখে আমি বললুম, আসুন চ্যাঁচাই।
মজুমদারসাহেব আপত্তি জানালেন, না, দেখছেন না সঙ্গে মেয়েটি রয়েছে।
সত্যিই মাধুরী রয়েছে, গদগদভাবে কীসব বলছে, আর পল্টন খুব গর্বিতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। চ্যাঁচাতে হলে এই তো সময়।
আমি বললুম, চ্যাঁচানোর সুবর্ণ সময়।
মজুমদারসাহেব উত্তেজিত, আপনার কোনও সেন্স অফ এটিকেট নেই মাথায়। একটি মেয়ের প্রেমকে মর্যাদা দিতে শিখুন।
মর্যাদা দিতে বাধ্য হলাম। কিন্তু এই বিচিত্র নাটকীয় প্রেমের মর্যাদা কিন্তু জনার্দন দিল না। হঠাৎ পল্টনের গলার স্বর বেশ ভীত এবং উত্তেজিত, এই মাধুরী, চট করে এই দোকানটার ভিতরে চলে এসো।
