পল্টন মৃদু হাসতে লাগল, তারপর মুখ খুলে একটা শব্দ উচ্চারণ করল, মাধুরী!
মজুমদারসাহেব তখন অবিবাহিত, শ্রীমতী মজুমদার তখনও নেপথ্যে, প্রেম-ট্রেম ব্যাপারে তখন আমরা তাকে অথরিটি বলে মান্যগণ্য করি। তিনি খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, কেসটা খুব ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। তারপর পল্টনকে কী একটা গোপন ইঙ্গিত করলেন, পল্টন আর মুখ খুলল না।
অনুমান করি, এর পরে পল্টনকে তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। পল্টন দিন-সাতেকের পরে একদিন এসে বলল, ট্যাক্সির ব্যবসা করব, আমার একটা ট্যাক্সির পারমিট চাই।
মল্লিকমশায় বললেন, ট্যাক্সির পারমিট পেতে খুব অসুবিধে। তার চেয়ে আপনি কিছুদিন বাস কন্ডাক্টরি করুন।
পল্টন আবার মারমুখী। অমিত মল্লিকমশায় বললেন, নিশ্চয় মজুমদারসাহেবের পরামর্শ। আপনি পুরোপুরি সর্দার হয়ে যেতে চাইছেন। প্রেমের জন্যে, ওই বোকা মাধুরীর জন্যে বাঙালিত্ব বিসর্জন দিতে আপনার দ্বিধা হচ্ছে না!
বোকা মাধুরী? এই রকম কী একটা প্রশ্নবোধক চিৎকার করে পল্টন এমন সময় লাফিয়ে উঠল যে মল্লিকমশায় না হয়ে অন্য কেউ হলে অজ্ঞান হয়ে যেত। কিন্তু ওই লাফের পরেই পল্টন ঘরের থেকে বেরিয়ে গেল। বোঝা গেল আর সহজে আসছে না। অন্তত মল্লিকমশায়ের সামনে তো নয়ই।
দিন যেতে লাগল। পল্টনের পাগড়ির রং ঘন ঘন পালটাতে লাগল। দাড়ি ঘন থেকে ঘনতর হল, হাতে লোহার বালা উঠল। আহাটু-লম্বিত কোর্তা আর সংক্ষিপ্ততম নিম্নাঙ্গের পোশাক। রাস্তায় দেখা হলে পল্টন আর আমাদের সঙ্গে কথা বলে না। আমরাও বাঁচোয়া। কে একজন এসে খবর দিল, পরেশনাথের মিছিলে সকলের আগে ঘোড়ায় চড়ে চলেছে পল্টন, শোনা গেল নিয়মিত গুরুদ্বারে যাচ্ছে। অথচ কোনও সূত্রেই এমন কিছু দেখা বা শোনা গেল না যাতে জানা যায় যে মাধুরী পল্টনের। নিকটবর্তিনী হয়েছে।
মাসখানেক পরে খবর পাওয়া গেল মজুমদারসাহেবের কাছে। মজুমদারসাহেব বললেন, আরে মশাই, মেয়েটা ভয়ংকর দুষ্টু। ওর বাপ টাকা ধার করেছে কোন এক কাবুলির কাছে। ওর ধারণা কাবুলিরা শিখদের ভয় পায়। আর তাই শিখ সাজিয়ে পল্টনকে বাড়ির চারপাশে ঘোরাচ্ছে, যাতে ওর বাবাকে ধার-টার শোধ করতে না হয়।
অবশেষে নিদারুণতম ঘটনাটি ঘটল। ধর্মের অঙ্গ হিসেবে আঠারো ইঞ্চি লম্বা ভোজালি কিনতে গিয়ে অস্ত্র-আইনে পল্টন পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। মাধুরী নাকি বলেছিল, ওটাও চাই।
মল্লিকমশায় থানায় গিয়ে জামিন হয়ে পল্টনকে ছাড়িয়ে আনলেন।
পল্টন কিন্তু মাধুরীকে ছাড়ল না।
উচিত শিক্ষা হয়েছিল মাধুরীর। মাথার উপরে ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বর আছেন, আর আমাদের হাজরার চৌমাথায় ছিল জনার্দন।
জর্নাদন আর নেই, জর্নাদন সাম্রাজ্যের কেউই প্রায় নেই আর আজ। এখন এতদিনে পল্টন-মাধুরী প্রণয়কাহিনির সুযোগে একটু জনার্দনলীলা বর্ণনা করা যেতে পারে। জনার্দন-স্মৃতিচারণ যেমন মধুর তেমনই রোমাঞ্চকর।
কলকাতার রাস্তায় সততসঞ্চারমান জনার্দন এবং তার সঙ্গীদের, ধর্মের ষাঁড়গুলিকে, আজ অনেকদিন লালবাবার আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিরীহ নাগরিকেরা হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বেঁচেছেন, কিন্তু আমরা যারা শক্তির পূজারী, আমাদের এতে বিশেষ মনোবেদনা হয়েছে।
দক্ষিণে মনোহরপুকুর, উত্তরে আশুতোষ কলেজ, পশ্চিমে কাটা গঙ্গা আর পুবে ল্যান্সডাউন এই ছিল জনার্দনের সাম্রাজ্যের স্বাভাবিক সীমা। অবশ্য একাধিকবার তাকে এই এলাকার বাইরেও দেখেছি। হিন্দি সিনেমার পোস্টার খেতে খুব ভালবাসত জনার্দন। একবার চেতলা হাটে সস্তায় গামছা কিনতে গিয়ে দেখেছিলুম, নিচু নিচু চালা দোকানঘরের বেড়া থেকে স্বল্পবসনা সুললিতা নায়িকার ছবি আপাদমস্তক চিবিয়ে খাচ্ছে। গড়িয়াহাট ফাড়ির কাছে এক সন্ধ্যায় অপর প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ করে দেড় ঘন্টা ট্রাফিক জ্যাম রাখবার কৃতিত্বের অংশীদারও জনার্দন। তবু একটা নির্দিষ্ট চৌহদ্দির মধ্যেই রাজত্ব করতে ভালবাসত সে।
জনার্দন নাম কে দিয়েছিল, বলতে পারব না। আমরা যতদিন কালীঘাট পাড়ায় আছি এই নামে এই ষাঁড়টিকে দেখে এসেছি। আমাদের পাড়ার সমস্ত সামাজিক ব্যাপারেই জনার্দনের কিঞ্চিৎ দায়িত্ব ছিল। ভজগোপালের ছোড়দির বিয়ে, বেপাড়ার বরযাত্রীরা ভীষণ হই-হুঁল্লোড় করছে, কেউ কিছু বলতেও পারছে না, হঠাৎ একটা পানের দোকানের সামনে থেকে তিনজন বরযাত্রীকে তাড়া করে সোজা আশুতোষ কলেজের দোতলায় উঠিয়ে দিয়ে সারারাত জনার্দন গেটে বসে রইল। অভুক্ত, বিনিদ্র সেই বরযাত্রীদের অপর সঙ্গীরা সেদিন রাত্রে পরে বড় চুপচাপ ছিল, কোনও হইচই নেই, রাস্তায় ছুঁচোবাজি নেই। ভোর চারটায় জনার্দন গেট ছেড়ে যখন মোড়ের দিকে এল তখনই শুধু সুযোগ পেয়ে সেই বরযাত্রীরা দোতলা থেকে নেমে, বিয়েবাড়ি নয়, সোজা ট্যাকসি করে কোথায় চলে গেল।
জনার্দনের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য ছিল, (হিন্দি সিনেমার পোস্টার বাদে অবশ্য) আতরমাখানো রুমাল আর কাটা ঘুড়ি।
আমাদের পাড়ায় রুমালে সেন্ট মাখা উঠেই গিয়েছিল জনার্দনের আমলে। কিন্তু অন্য পাড়ার লোকেরা জানবে কী করে? ট্রাম থেকে নামলেন শৌখিন ভদ্রলোক, পকেটের কোণায় বেরিয়ে রয়েছে সিল্কের রুমালের কোণকাটা ফুল। ইভনিং ইন প্যারির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আলস্যমন্থর গতিতে জনার্দন এগুল ভদ্রলোকের পাশে। কিছু বুঝবার আগে কিংবা বুঝতে বুঝতেই জনার্দন জিভ বাঁকিয়ে পকেট থেকে তুলে রুমালটা চিবোতে লাগল। দু-একবার দেখেছি রুমালের সঙ্গে মানিব্যাগও উঠে এসেছে, কিন্তু জনার্দন মানিব্যাগ খেতো না, একটু চিবিয়েই ফেলে দিত।
