সে যা হোক, পল্টনের কুস্তি শেষ হলে ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরত। কেননা ততক্ষণে বেলা হয়ে গেছে। বিশেষ করে ওই সময়ে আমাদের পাড়ার মেয়েরা সকালবেলার কলেজে যায়, তার মধ্যে নাকি অনেকেই পল্টনের অনুরাগিণী ছিল, তাই ব্যায়ামের পোশাকে তাদের সম্মুখীন হতে পল্টনের দ্বিধা ছিল। কিন্তু তবুও ফেরার জন্যে একটা বাড়তি পোশাক, অন্তত একটা লুঙ্গি কেন পল্টন নিয়ে যেত না, সে বিষয়ে কোনওদিন কিছু জানা যায়নি পল্টনের কাছ থেকে। কিছু প্রশ্ন করলে স্বভাবসিদ্ধ মৃদু হেসেছে। পল্টন-চরিত্রের আরও বহু রহস্যের এই একটি।
ট্যাক্সিতে করে বাড়ি ফিরে, হাতে ধুতি আর গামছা নিয়ে হেঁটে বাবুঘাট গঙ্গাস্নান। শুনেছি, সেখানে নাকি মিনিট-পনেরো সন্ধ্যা-আহ্নিকও করত; তারপর আবার পায়ে হেঁটে বাড়ি। এবার নতুন অধ্যায়। বাড়িতে ফিরে আবার স্নান। চন্দন সাবান দিয়ে স্নান, মাথায় গন্ধ-তেল, বাক্স থেকে ধোপাবাড়ির কাঁচা তাঁতের ধুতি, সিলকের পাঞ্জাবি, সব পাট-পাট নিখুঁত। এক কাপ চা আর দুটো মুচমুচে বিস্কুট খেয়ে পল্টন যেত গানের ইস্কুলে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান, কমলমুকুলদল খুলিল আর পল্টনের খুব প্রিয় গান ছিল নানা রঙের দিনগুলি। মিহিগলায় ঝকঝকে পোশাকে গান শিখে, তারপর সকালবেলার আড্ডা দশটা নাগাদ। এই সময়ে প্রতিদিনই পল্টনের সঙ্গে আমার দেখা হত। আমরা দুজনে প্রতিবেশী এক সম্পাদকের বাড়িতে যেতাম। সেখানে গিয়ে সনেটের রূপ-বৈচিত্র্য এবং আধুনিক কবিতার ক্রমশ পতন বিষয়ে উষ্ণ আলোচনা হত।
সময়মতো বলে রাখি, পল্টন অনেক খবর রাখত। একদিন মৃদু মৃদু হাসছিল, বললাম, হাসছিস কেন?
বলল, জানিস বলরামবাবুর ডাকনাম গদাই! ওর মেজমামা ওকে গদাই বলে ডাকে।বলরামবাবু তখন এক বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। তার সম্বন্ধে পল্টন এত জানে, এই তথ্য আমাকে খুবই বিচলিত করেছিল।
আরেক দিন পল্টন বলেছিল, জানিস মহেন্দ্রবাবুর ভাইঝি ফেল করেছে! মহেন্দ্রবাবুও আরেকজন সম্পাদক। আমি এসব কিছুই জানতুম না, আর ভাবতুম আমার কিছুই হবে না।
সংগীত শিক্ষা এবং কবিতা আলোচনার পর্ব শেষ হলে পল্টন চলে যেত সায়েন্স কলেজে। ফলিত পদার্থবিদ্যায় কী একটা জটিল গবেষণা, যার উপরে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নাকি নির্ভরশীল ছিল, তারই দায়িত্ব ছিল পল্টনের। সেখান থেকে বেলা তিনটে নাগাদ সোজা রেডক্রশ, ফাস্ট-এড়ে খুব ভাল ট্রেনিং নিয়েছিল পল্টন। পরবর্তী জীবনে অবশ্য এই শিক্ষা তার খুব নিজের কাজে লেগেছে। বহুবার নিজেকে ফাস্ট-এড দিতে হয়েছে পল্টনের।
অবশ্য এর মধ্যে সময় পেলে একবার স্টুডিওপাড়া থেকে ঘুরে আসতে হত তাকে। কী একটা ফিল্মে কখনও সহকারী পরিচালক, কখনও টেকনিশিয়ান, কখনও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়–কী যেন করার কথা ছিল তার, সে নিজেও ভাল করে জানত না।
তারপর অপরাহ্নে প্রেম।
প্রেম করতে বড় ভালবাসত পল্টন। ষোলো বছর বয়স থেকে। মল্লিকমশায় বলতেন, সোলো (solo) পারফরমান্স। সেই শুরু, তারপর একযুগ অতিক্রান্ত, হাজরা মোড়ের বুড়ো ভিখারি মরে গেল, তার ছেলেরা এখন ভিক্ষা করছে, রাজেনবাবুর মাথা খারাপ হয়ে গেল, মল্লিকমশায় হাকিম হয়ে গেলেন, আমি মাইনে-করা হাস্যরসিক হয়ে গেলাম–আরও কত কী হল, এমনকী পল্টন পর্যন্ত। পাড়া ছেড়ে চলে গেল কিন্তু প্রেম তাকে ছাড়ল না।
জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার। পল্টন নামল, সাঁতার শিখল, সাড়ে তিনশো টাকা খরচ করে মিলান থেকে নীল ডোরাকাটা সুইমিং কম আনাল, দেড় মাস অনবরত চিড়িয়াখানায় গেল, ছয় মাস পার্ক স্ট্রিটে ফরাসি ভাষা অধ্যয়ন করল, একদিন হাজরা পার্কে বক্তৃতা করল, ভুখা-মিছিলের সামনে কালো ফ্ল্যাগ নিয়ে চৌদ্দ মাইল রাস্তা হেঁটে অজ্ঞান হয়ে গেল–কত কী করল পল্টন, সবই সেই মীনকেতনের অলক্ষ্য নির্দেশে।
ষোলো বছরের পল্টনের প্রথম প্রেমের অরুণরাগরঞ্জিতা দুলালীকে নিয়ে রসিকতা এককালে অনেক করেছি। এখন আর সাহস নেই। দুলালীর তৃতীয় মেয়েকে সেদিন দেখলাম, সবে কয়েকটা দুধ-ত উঠেছে, হঠাৎ অতর্কিতে আমার হাঁটু কামড়ে দিয়েছিল, তার ওপরে দুলালীর স্বামী রাইফেল ফ্যাকটরিতে কাজ করে–কোনও রসিকতা এখানে এখন আর চলবে না।
বরং মাধুরীকে নিয়ে চলতে পারে। পল্টনকে বড় কষ্ট দিয়েছিল মাধুরী।
শিখ সর্দারজিদের মতো পল্টন একদিন একটা পাগড়ি মাথায় দিয়ে চলে এল, বলল, আজ থেকে দাড়ি রাখছি।
কী ব্যাপার? আমাদের সকৌতূহল প্রশ্নের উত্তরে পল্টন জানাল, মাত্র পৌনে চার টাকা, জগুবাবুর বাজারে, ভীষণ চিপ!
মল্লিকমশায় বললেন, দাড়ি রাখতে পৌনে চার টাকা খরচ, কী সাংঘাতিক! এ দামে দাড়িসুদ্ধ ছাগল পোষা যায় মশায়।
পল্টন মল্লিকমশায়ের কথা শুনেই খেপে যায়, দাড়ির কথা কে বলেছে মশায়, পাগড়ির কথা বলছি।
মল্লিকমশায় কিন্তু থামলেন না, ও পাগড়ি–আপনি পুলিশে চাকরির চেষ্টা করছেন, বলেননি তো।
একটা হাতাহাতি হয়ে যেত, যদি আমরা না থাকতাম। তা ছাড়া পাগড়ির ব্যাপারটা কী তাও আমাদের জানা দরকার। জিজ্ঞেস করতে পল্টন মৃদু হাসল, আবার প্রশ্ন আবার মৃদু হাসি৷ কিঞ্চিৎ লাজনম্রতাও যেন জড়িত ছিল সে হাসির সঙ্গে! সন্দেহ হল ব্যাপারটা প্রেমঘটিত। মল্লিকমশায় টোপ ফেললেন, বাঙালি মেয়েদের আজকাল বড় পাগড়ি, তলোয়ার দাড়ি, এইসব সর্দারজিদের প্রতি খুব ঝোঁক হয়েছে।
