কাঞ্চন অনেক ভাবল, অনেক রকম ভাবল। আস্তে আস্তে তার বুদ্ধি খুলতে লাগল। সে ঠিক করল সে একটা কুকুরছানাদের সাঁতারের ইস্কুল করবে। ওই বাইরের ঘরের বাথটবে তাদের সাঁতার শেখানো হবে, দাবা হবে এই সাঁতার-বিদ্যালয়ের ট্রেনার আর কাঞ্চন হবে সেক্রেটারি।
এই কলকাতা শহরে কত কুকুরছানা থাকে লেকের কাছে, পুকুরের কাছে, গঙ্গার কাছে। সাঁতার শেখা তাদের পক্ষে নিতান্ত প্রয়োজন। আর তা ছাড়া বর্ষার সময় কলকাতার প্রায় সব গলিই তো আজকাল নদী হয়ে ওঠে। সুতরাং কুকুরছানাদের জলে ডোবা থেকে বাঁচতে গেলে সাঁতার শিখতেই হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জলে নেমে সাঁতরানো শিখলে কুকুরছানারা পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন থাকবে গায়ে ঘা হবে না, পোকা-মাকড় হবে না।
কাঞ্চনের এই অকল্পনীয় প্রস্তাবে, মানে কুকুরছানাদের সাঁতারের স্কুল করার পরিকল্পনায় কাঞ্চন সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেল তার কাকার কাছ থেকে। কাঞ্চনের বাবা মুচকি হাসলেন, কিছু মন্তব্য করলেন না। শুধু কাঞ্চনের মা আধা প্রতিবাদ জানালেন, অত জল ঘাঁটলে কাঞ্চনের জ্বর হয়ে যাবে।
তিনদিনের মধ্যে কাঞ্চনের কাকা তার অফিসের কাছ থেকে একটা চমৎকার সাইনবোর্ড তৈরি করিয়ে নিয়ে এলেন। সাইনবোর্ডটা যে খুব বড় তা নয়, কিন্তু সুন্দর কালো বার্নিশ করা কাঠের ফ্রেম দিয়ে ঘেরা, তার মধ্যে সবুজ জমিতে উজ্জ্বল সাদা হরফে বেশ বড় বড় করে গোটা গোটা অক্ষরে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায় লেখা
PUPPY SWIMMING SCHOOL
কুকুরছানাদের সাঁতার শিক্ষালয়
এখানে কুকুরছানাদের বিনামূল্যে
টবের জলে সুশিক্ষিত সাঁতারু
কুকুরছানা দ্বারা নিয়মিত সাঁতার
শেখানো হইয়া থাকে।
অনুসন্ধান করুন।
পরের দিন সকালবেলা অফিস যাওয়ার আগে কাঞ্চনের কাকা বাড়ির সামনের লোহার গেটটায় সাইনবোর্ডটা টাঙিয়ে দিয়ে গেলেন। রাস্তা দিয়ে যারা যায়, তারাই এই আশ্চর্য সাইনবোর্ড দেখে থমকে দাঁড়ায়, একটু অবাকও হয়। দুপুরে টিফিনের সময়ে অফিসবাবুদের রীতিমতো ভিড় জমে গেল কাঞ্চনদের বাড়ির সামনে। কাঞ্চন তাই দেখে উত্তেজিত হয়ে মাকে ডেকে আনল, মা, দ্যাখো কত লোক আমাদের সাইনবোর্ড পড়ে যাচ্ছে। কাল নিশ্চয় ওরা ওদের কুকুরছানা নিয়ে আসবে আমাদের এখানে স্নান করানোর জন্যে। কাঞ্চনের মা কিছু বললেন না, শুধু একটু হাসলেন।
তারপর আরও সাতদিন চলে গেছে। মজার খবর চাপা থাকে না। লোকমুখে কুকুরছানার সাঁতার শেখার স্কুলের গল্প নানাদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। একটা বড় খবরের কাগজে এ বিষয়ে চমৎকার সংবাদ বেরিয়েছে, তাদের রিপোর্টার কাঞ্চনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন; দাবার ছবিও ছাপা হয়েছে অন্য একটি পত্রিকার শিশুদের পাতায়। ফলে অনতিবিলম্বে দাবা হয়তো সিমলিপালের খৈরির মতো কিংবা আলিপুর চিড়িয়াখানার হাতি বিজলীর মতো বিখ্যাত হয়ে পড়বে। প্রতিদিন সারাদুপুরে লোক উপচে পড়ছে বাড়ির দরজায়। কাঞ্চনের মা আর বড় বাড়িতে একা থাকার ভয়ে কম্পিত নন। বরং সদর দরজার ভিড় সামলাতেই তার সারাদুপুর কেটে যায়।
কাঞ্চনের কিন্তু মনে আনন্দ নেই। এখন পর্যন্ত একজন লোকও তার কুকুরছানা কাঞ্চনদের সাঁতার শিক্ষালয়ে স্নান করাতে নিয়ে আসেনি। দাবার তাতে ক্ৰক্ষেপ নেই। সে নেচে-কুঁদে, লাফিয়ে, লেজ নেড়ে, জলের টবে সাঁতার কেটে সাঁই-সাঁই করে বড় হয়ে যাচ্ছে। সদর দরজায় সাইনবোর্ডটার সামনে লোকের ভিড় বেশি হলে সে ঘেউঘেউ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। লম্বাও হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি, এরই মধ্যে সে নয় ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেছে।
কিন্তু দাবা তো মানুষ নয়। কাঞ্চন মানুষ, সে এত তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছে না। তার বড় হতে অনেক সময় লাগবে। সে এখন দেখছে, দিনের বেলার লোকজন সরে গেলে সন্ধ্যার দিকে এ পাড়ার কয়েকটা রাস্তার কুকুর তাদের সদর দরজার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কখনও কখনও তারা। গেটের মধ্যে দিয়ে তাকায়, কখনও কখনও তারা সাইনবোর্ডটার দিকেও তাকায়। কাঞ্চন জানে, এই পরের তাকানোটাই সত্যি। মানুষেরা যাই করুক, এই কুকুরেরা, যখন তাদের ছানাগুলি জন্মাবে, একটু বড় হলেই তাদের নিয়ে আসবে কাঞ্চনের কাছে সাঁতার শেখানোর জন্যে। পাপি সুইমিং স্কুল-এর বাথটব একদিন ভরে যাবে কুকুরছানায়, আর তাদের মায়েরা অপেক্ষা করবে কাঞ্চনদের বাড়ির উঠানে। কুকুরের মায়েরা কেউ যদি সাইনবোর্ডের ভাষা না বুঝতে পারে, তাই কাঞ্চন খুব যত্ন করে একটা বড় ছবি এঁকে সাইনবোর্ডের নীচে টাঙিয়ে দিল। ছবিটা আর কিছুই। নয়, একটা বাথটবের জলের মধ্যে অনেকগুলো কুকুরছানা প্রাণের আনন্দে জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটছে।
পুরনো পল্টন
পল্টনকে নিয়ে আমি এখনও কিছু লিখিনি। কিন্তু না লিখলেই নয়। যাদের নিয়ে ইতিমধ্যে লেখা হয়ে গেছে, তারা রীতিমতো গোলমাল শুরু করে দিয়েছে, কেন পল্টন থাকতে আমি তাদের হাস্যাস্পদ করছি।
পল্টনকে নিয়ে যে কিছু লিখিনি তার কারণ একমাত্র এই নয় যে পল্টন খুব শক্তিশালী, তার চেয়েও বড় কারণ পল্টনকে নিয়ে লেখা আরম্ভ করা আর আমার দিদিমার সঙ্গে কথা বলা এক ব্যাপার। বলে কিংবা লিখে শেষ করা যাবে না।
দশ বছর আগের পল্টনের রুটিন বলি৷ ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠল পল্টন। তারপর আদাগুড় দিয়ে দেড়পোয়া ছোলা খেল। খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে প্রায়ান্ধকার হাজরা রোড ধরে জগন্নাথ ব্যায়ামাগারে প্রবেশ, মিনিট-পনেরো বারবেল ভেঁজে ফাস্ট ট্রাম ধরে, ওই পোশাকেই, টালিগঞ্জ ট্রাম-ডিপোতে গমন। সেখানে ট্রামের লোকদের সঙ্গে–এই ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, চেকার এদের সঙ্গে গায়ে পোয়াখানেক তেল মেখে (প্রসঙ্গত ওই ভোরে বেরুনোর সময় পল্টন তেলের শিশি হাতে নিয়ে বেরুত) কুস্তি। এই ট্রাম-ডিপোতে কুস্তির ব্যাপারে পল্টনের আশ্চর্য একটা যুক্তি ছিল, এইভাবে ট্রামের লোকদের সঙ্গে বিশেষ বন্ধুত্ব হয়ে যায় আর ট্রামভাড়া লাগে না। শেষরাত্রে গায়ে তেলমাটি মেখে যার সঙ্গে কুস্তি করেছি, সে কি আর সারাদিন ট্রামভাড়া চাইতে পারে? তখন আমার উদ্দাম বেকার অবস্থা। স্বীকার করি, আমিও প্রলোভিত হয়েছিলাম। কিন্তু হর্বচন সিং নামে এক ভোজপুরি ড্রাইভার প্রথম দিনেই আমার পিঠে হাঁটু দিয়ে এমন ভীষণ আঁতা দিয়ে ধরেছিল যে, বিনা ভাড়ায় ট্রাম চড়ার লোভ পরিত্যাগ করতে হল, জীবনে আর কোনওদিন ইজিচেয়ারে শুয়ে সুখ পেলাম না, এমনকী বিছানায়ও চিত হয়ে শুলে সমস্ত শিরদাঁড়া প্রতিবাদ করে ওঠে, খচখচ করে শব্দ হয়।
