কার্তিকবাবু পাকা লোক। প্রথমে দামদর না করে কিছুতেই দুর্বলতা দেখাবেন না। ইতিমধ্যে কাঞ্চন কিন্তু কুকুরছানাকে কোলে তুলে নিয়েছে, তবুও কার্তিকবাবু যথাসাধ্য নির্লিপ্তমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, কত দাম দিতে হবে?
তারপর শুরু হল এক অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতা। কুকুরওলা বলল, আটশো। হাজার টাকাই দাম, তোমার জন্যে দুশো টাকা কমিয়ে দিচ্ছি। কুকুরটাও তোমাকে পছন্দ করেছে।
কার্তিকবাবুও একইরকম, তিনি বললেন, এই রকম জংলি কুকুরছানার দাম পঁচিশ টাকার বেশি হতেই পারে না।
ঠিক আছে, পাঁচশো টাকা দাও। কুকুরওলা বলল।
তিরিশের বেশি এক পয়সাও নয়। কার্তিকবাবু কাঞ্চনের হাত ধরে টানলেন।
তারপর আধঘণ্টা ধরে:
সাড়ে চারশো।
বত্রিশ।
তিনশো।
চল্লিশ।
দুশো।
পঞ্চাশ।
এইভাবে যখন সাড়ে সাতান্ন টাকায় রফা হল, তখন সদ্য দাবানামপ্রাপ্ত কুকুরছানাটি কাঞ্চনের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে।
কুকুরছানা বাসায় এল। কাঞ্চনের মা, কাঞ্চনের বাবা সবাই তাকে দেখে মুগ্ধ। প্রথম দু-একদিন একটু কাদাকাটি করেছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে দাবার আচার, আচরণ, বুদ্ধি ইত্যাদি দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গেল। বিশেষ করে নিজের লেজ নিজে ধরে নামে যে নতুন খেলাটি দাবার জন্যে কাঞ্চন আবিষ্কার করেছে, যে খেলায় দাবা নিজেরই চারদিকে চক্রাকারে মিনিটের পর মিনিট মুখ দিয়ে লেজ ধরার জন্যে ঘুরতে থাকে, সেরকম কাঞ্চনের বাড়ির লোকেরা কখনও কোথাও দেখেনি।
তবু কুকুর পোষার বিস্তর ঝামেলা। শিকল চাই, বকস চাই, ডগসোপ চাই, জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা অবশ্যই চাই। আর সবচেয়ে গোলমেলে ব্যাপার হল: যেখানে শিকল পাওয়া যায়। সেখানে শিকল ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। এক এক জিনিস এক এক জায়গায়। আর ইঞ্জেকশন দেওয়ানো, সে কি সোজা কথা। অনেক ঘুরে ঘুরে শিকল-বকলস, এমনকী কুকুরের সাবান, দুধ খাওয়ার বাটি, শোবার কম্বল সব কিনে আনলেন কাঞ্চনের বাবা, একটা কথা জানা গেল–ছমাস না হলে কুকুরছানার ইঞ্জেকশান লাগে না।
কাঞ্চনদের এই নতুন বাড়িটার সবচেয়ে মজা হল: প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গে একটা করে অতিকায় বাথরুম। আর সেই বাথরুমগুলিতে একটি করে চমৎকার পুরনো আমলের বাথটব। বাইরের ঘরের বাথরুমটা বিশেষ ব্যবহার করা হয় না। ঠিক হল দাবাকে ওখানেই স্নান করানো হবে। দাবা থাকবে শোবার ঘরের মধ্যে, হয়তো বিছানায়-টিছানায়ও উঠবে। সুতরাং কুকুরছানাকে যথেষ্ট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
কুকুরের ডাক্তারবাবুকে ফোন করে কাঞ্চনের বাবা জেনে নিয়েছিলেন, ছোট কুকুরছানাকে সপ্তাহে একদিনের বেশি স্নান করানো ঠিক হবে না। তাই স্থির করা হল প্রত্যেক রবিবার ছানাকে দুপুরবেলায় ডগ-সোপ মাখিয়ে খুব ভাল করে স্নান করানো হবে।
প্রথম রবিবারেই হইচই কাণ্ড। লোডশেডিংয়ের জন্যে কলে জল বেশি পাওয়া যায় না। তবু এরই মধ্যে অনেকটা জল ধরে বাইরের ঘরের বাথটবটা আধাআধি ভরে রেখেছে কাঞ্চন। তার মধ্যে দাবাকে নিয়ে কাঞ্চনের কাকা নামিয়ে দিলেন। দাবার এখন উচ্চতা ছয়সাত ইঞ্চি, আর বাথটবের জলের গভীরতা প্রায় এক ফুট। কাঞ্চন ভয় পেয়ে গেল। চেঁচাতে লাগল। কাকা, ডুবে যাবে, ডুবে যাবে! কাঞ্চনের চেঁচানি শুনেই হোক অথবা জল দেখে ভয়েই হোক, দাবাও কেঁউ কেঁউ করে কেঁদে উঠল। কাঞ্চনের কাকা কিন্তু কিছু না ভেবে নির্বিকারভাবে দাবাকে জলের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। দাবা একটু ডুবে গিয়েই ভেসে উঠল, তারপর জলের উপর মাথা উঁচু করে সারা টবময় ঘুরে ঘুরে সামনের দুটো খুদে পা দিয়ে জল কেটে কেটে সাঁতরাতে লাগল এবং তার মুখ দেখে বোঝা গেল সে জলের ব্যাপারটা খুব অপছন্দ করছে না।
দাবার সাঁতার কাটা দেখে হতভম্ব কাঞ্চন হাততালি দিয়ে উঠল। সে নিজেও একটা সাঁতারের স্কুলে যাচ্ছে আজ দেড় মাস হল, কিন্তু বিশেষ কিছুই শিখতে পারেনি, আর দাবা প্রথমদিনেই সাঁতার কাটছে।
অবাক কাঞ্চন কিছুক্ষণ গোল গোল চোখে এই দৃশ্য দেখে তারপর দাবাকে জল থেকে তুলে একটা পুরনো তোয়ালে দিয়ে তাকে মোছাতে মোছাতে কাকাকে জিজ্ঞাসা করল, কাকু, ও সাঁতার শিখল কোথায়?
কাকা বললেন, কুকুরছানারা আবার সাঁতার শিখবে কী! ওটা ওরা একা একাই পারে।
ব্যাপারটা কিন্তু কাঞ্চনের মাথার মধ্যে ঢুকে গেল। একটি সাদা ঝকঝকে পোর্সেলিনের টবের জলে একটা সাদা কালো কুকুরছানা টুকটুক করে সাঁতার কাটছে। চোখ বুজলে চোখ খুললে কাঞ্চন শুধু এই ছবিটাই দেখতে পাচ্ছে। কত লোককে যে কাঞ্চন তার সাঁতারু কুকুরছানার কথা বলেছে। তার ইয়ত্তা নেই। তারা সবাই যে ব্যাপারটাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে তা নয়। অনেকে শুধু তাই নাকি, তাই নাকি করেছে; সেটা যে নিতান্তই মন ভোলানো কথা, সেটা বুঝতে কাঞ্চনের অসুবিধা হয়নি। কিন্তু তাতে সে একেবারেই দমে যায়নি।
তার অবশ্য একটা বিশেষ কারণ আছে। কাঞ্চনের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা দেখা দিয়েছে যে, শুধু দাবার মতো প্রতিভাবান কুকুরছানার পক্ষে সম্ভব একা একা সাঁতারের মতো অতি কঠিন বিষয়। আয়ত্ত করা এবং জীবনে প্রথম দিনই জলে নেমে মাত্র একবার ডুবে সাঁতার কাটা। কাঞ্চন তার নিজের সাঁতারের স্কুলের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে জানে, সাঁতার ব্যাপারটা অত সোজা নয়, ছেলের হাতের মোয়া নয়। আর একটা কুকুরছানাকে ওইভাবে টবের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবেই মরে যাবে, এ বিষয়ে কাঞ্চনের মনে কোনও সন্দেহ নেই।
