আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, মানে? তুমি না বলেছিলে আমি আর লম্বা হব না।
বাসনা বলল, তারপরে যে কম্বলবাবার কাছে গিয়েছিলাম।
আমি সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলাম, কম্বলবাবার কাছে কেন? আমি না তোমাকে যেতে মানা করেছিলাম।
বাসনা বলল, আমি গিয়েছিলাম আমার ছেলের জন্যে। ছেলেটা মাথায় বাড়ছে না। গত বছর কম্বলবাবা একটা ফুঁ দিয়ে দিয়েছিলেন, এক ধাক্কায় আড়াই ইঞ্চি বেড়েছে এক বছরে।
সে তো কম্বলবাবার ফুয়ে তোমার ছেলে বেড়েছে, আমি লম্বা হলাম কী করে? আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে বাসনা বলল, কম্বলবাবাকে তোমার ব্যথার কথা বলাতে কম্বলবাবা মন্ত্র পড়ে তোমাকেও এক ইঞ্চি লম্বা করে দিল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কম্বলবাবা আমাকে লম্বা করতে গেল কেন?
লম্বা হলে তোমার হাড়ের জট খুলে যাবে, ব্যথা দূর হয়ে যাবে। একটু থেমে বাসনা বলল, লম্বা হয়ে গেছ, এবার ব্যথাও চলে যাবে। ব্যথা চলে গেলে একটা কম্বল কিনে দিয়ে কম্বলবাবাকে দিয়ে আসব।
সত্যি কথা স্বীকার করছি আমার ব্যথা কয়েকদিনের মধ্যেই দূর হয়েছে। এখন ভালই নড়া-চলা করতে পারি। কাল একটা কম্বল কিনব, বাসনার সঙ্গে গিয়ে কম্বলবাবাকে দিয়ে প্রণাম করে আসব।
পাপি সুইমিং স্কুল
আজ কয়েকদিন হল কাঞ্চনেরা একটা খুব বাড়িতে এসেছে। কাঞ্চনের বাবা যেখানে কাজ করেন, সেই কোম্পানিরই সাবেক আমলের কোয়ার্টার এটা। এত বড় যে, আজকাল কেউই তাতে থাকতে চায় না। চারদিকে বাগান, সেগুলো এখন জঙ্গল হয়ে গেছে। চওড়া বারান্দা ধুলোয় ছেয়ে আছে, দেয়ালে অতিকায় মাকড়শার জাল। পুরনো মরচে-ধরা লোহার গেট খুললে এক কিলোমিটার দূর থেকে তার আর্তনাদ শোনা যায়। শহর কলকাতার ঠিক মাঝখানে এরকম একটা বাড়ি, তেঁতুল ও বাদাম গাছের ছায়ার নীচে প্রাচীন একটা আধা-প্রাসাদ থাকতে পারে, সেটা সত্যিই ভাবা কঠিন।
তবু বাড়িটি আছে, এবং গত কয়েক মাস এখানে কেউ আসেনি। আগের বাসিন্দা যিনি ছিলেন, কাঞ্চনের বাবার উপরওলা, তিনি সাত মাস আগে রিটায়ার করার পর এই বাড়ি ফাঁকাই পড়ে ছিল। কাঞ্চনরা থাকত খুব ছোট একটা বাড়িতে। কাঞ্চনের বাবার অফিসের কর্তৃপক্ষ একদিন কার্তিকবাবুকে, মানে কাঞ্চনের বাবাকে বললেন, তুমি তো অনেকদিন বাড়ি বাড়ি করছ, এই কোয়ার্টারটায় যাও না। খুবই লম্বা-চওড়া, বেশ হাত-পা ছড়িয়ে থাকতে পারবে।
কার্তিকবাবু এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। এতদিন বড় অসুবিধার মধ্যে ছিলেন। যদিও প্রায় পোড়ো বাড়ি, তবু খোলামেলা আর খুবই বিশাল, একটু ভাঙাচোরা, তাতে কিছু আসে যায় না। তিন দিনের মধ্যে দুটো ট্রাক ভরতি করে মালপত্র নিয়ে, সঙ্গে ট্যাক্সিতে কাঞ্চনের মা, কাঞ্চনের কাকা কাঞ্চন আর কার্তিকবাবু নতুন কোয়ার্টারে চলে এলেন।
আসবার পরের দিনই কাঞ্চনের মা কার্তিকবাবুকে বললেন, দ্যাখো, তুমি আর ঠাকুরপো অফিস চলে গেলে এই শুনশান বাড়িতে ওইটুকু কাঞ্চনকে নিয়ে কেমন ভয় ভয় করে। একটা কুকুর এনে দাও, পুষি।
কার্তিকবাবু বললেন, কেন, এটা তো প্রায় অফিস-পাড়া। সামনের রাস্তায় সারা দুপুর হই-হই করে গাড়িঘোড়া যাচ্ছে।
কাঞ্চনের মা একটু রেগে গিয়ে বললেন, সে তো রাস্তায়, এত বড় নিঝুম পুরীর মধ্যে রাস্তার কোনও শব্দই আসে না। কেউ এসে আমাদের গলা টিপে মেরে গেলেও কেউ জানতে পারবে না।
এরপরে আর আলোচনায় না গিয়ে কার্তিকবাবু বললেন, ঠিক আছে, কুকুর এনে দিচ্ছি। কিন্তু বড় কুকুর তো আনা যাবে না, একটা কুকুরছানা নিয়ে আসছি, দুমাস ভাল করে পোষ, দেখবে বিরাট হয়ে যাবে।
কলকাতার গঙ্গার ধারে বিদেশি জাহাজ, শীতল বাতাস এবং মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্যে বিখ্যাত। কিন্তু এসবের চেয়েও অনেক জীবন্ত একটি চিত্র গঙ্গার ঘাটে প্রায়ই দেখা যায়। সে হল অজস্র কুকুরছানা, ছাগলের মতো দড়ি দিয়ে সেগুলি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা, তাদের কারও রং বাদামি, কেউ সাদা, কেউ কুচকুচে কালো, কিন্তু প্রত্যেকের লেজ ফোলা, ঝোলা কান, নরম ঠান্ডা কালো নাক আর ভোররাতের আকাশের মতো ফিকে নীল চোখ। তারা কেউ লাফাচ্ছে, কেউ আপন মনে খেলছে, কেউ বা পাশের সঙ্গীর সঙ্গে ছদ্ম লড়াই করছে। দু-একজন ঘুমোচ্ছে, একটু কুঁ কুঁ করে কঁদছে এক-আধ জন। এর বাইরে এপাশে ওপাশে একটি কি দুটি আছে যারা নরম কিশোর কণ্ঠে ঘেউ ঘেউ করে নিজেদের বীরত্ব জাহির করছে।
একদিন সকালবেলা গঙ্গার ঘাটে গিয়ে এই রকমই ঘেউঘেউকারী একটি বীর কুকুরছানাকে কার্তিকবাবু বেছে নিলেন। কালো রঙের কুকুরছানাটি, তার গলা ও পেটের নীচে ঝকঝকে সাদা, কার্তিকবাবু কাছে যেতেই সে পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে চিত হয়ে আম-আঁঠির ভিতরের কুষির মতো সাদা ও নরম জিব বার করে, জিবের ডগা দিয়ে বার বার জুতোর ফিতে ছুঁতে লাগল। কাঞ্চন সঙ্গে ছিল। সে বলল, বাবা, ও অমন করছে কেন?
কার্তিকবাবু বললেন, ও বলছে, আমাকে নিয়ে চলো, আমি তোমাদের।
এরা সবাই হল পাহাড়ি কুকুরের ছানা। একদল যাযাবর শ্রেণীর লোক বাচ্চাগুলো কলকাতায় নিয়ে আসে বেচার জন্যে। এই সাদাকালো কুকুরছানা, যার নাম ইতিমধ্যে কার্তিকবাবু মনে মনে রেখেছিলেন দাবা, তার মালিক একটু দূরেই একটা মেহগনি গাছের গুঁড়িতে মাথা রেখে অর্ধেক চোখ বুজে একটা বিরাট লম্বা বিড়ি খাচ্ছিল। সে হঠাৎ জোড়াসন হয়ে বসে বলল, বাবু, কুকুরটাকে নিয়ে যাও।
