ভিজিট ও ওষুধের দাম মিটিয়ে বেরিয়ে আসার মুখে ডাক্তারবাবুকে বললাম, ডাক্তারবাবু, যন্ত্রণায় বড় কষ্ট পাচ্ছি, অসহ্য হয়ে উঠেছে। আপনার ওষুধে ব্যথা উপশম হবে তো?
ডাক্তারবাবু বললেন, বেশ চিন্তা করেই বললেন, যদি ব্যথা না কমে, চৌদ্দ দিন দেখবেন। তারপর আরেকবার আসবেন।
চেম্বারের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অনুভব করলাম যন্ত্রণাটা উত্তরোত্তর বাড়ছে। এখন শুধু হাত, ঘাড়, পিঠ নয়, কান দুটোও ভয়াবহ টনটন করছে।
এই যন্ত্রণা নিয়ে আরও চৌদ্দ দিন অপেক্ষা করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
এই গভীর রাতেও ডাক্তারবাবুর চেম্বারের সামনে ফুটপাতে একটা ভিখারি হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিল। সেই লোকটার হাত দুটো কোনও অলৌকিক যন্ত্রণায় থরথর করে কাপছিল। তার হাতে পুরিয়াটা গুঁজে দিয়ে বললাম, এই ওষুধটা কাল সকালে খালি পেটে খেয়ে নিয়ো। আর দেখো, আজ রাতে মদ খেয়ো না, চিংড়ি মাছ খেয়ো না।
পুরিয়াটা হাতে নিয়ে কৃতজ্ঞ ভিখারিটি আমার পিছনে পিছনে কিছু দূর এল। তারপর বলল, স্যার, আমি আজ সারাদিনই না খেয়ে আছি, সেই সকাল থেকে খালি পেটে রয়েছি, ওষুধ এখনই। খেয়ে নিই। এই বলে সামনের একটা টিউবওয়েলের দিকে এগিয়ে গেল।
এরপরে আর বিশদ বর্ণনায় যাচ্ছি না। বাংলা ভাষায় পরশুরামের পর আর নতুন করে চিকিৎসা সংকট লেখার মানে হয় না। তবে জানিয়ে রাখা ভাল যে সেই গল্পের নায়কের মতো ভুলক্রমে কোনও লেডি ডাক্তারের কাছে আমি যাইনি।
এখন আমি এই কাহিনির শেষ পর্যায়ে আসছি। নানা ঘাটের জল খেয়ে, নানা রকম টোটকা, মুষ্টিযোগ, চাল পড়া ইত্যাদি করার পর আমার অবস্থার একটুও উন্নতি হয়নি। তবে ব্যথা-বেদনা সহ্য করার একটা অভ্যাস জন্মে গেছে, সেই যে একটা প্রাচীন কথা আছে না শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবে তাই সয়, কথাটা খুবই সত্যি।
এখন ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সিঁড়ি দিয়ে নামি, পা ঘষটে ঘষটে হাঁটি, খুব প্রয়োজন না পড়লে হাত বা শরীর নাড়াচাড়া করি না। তবে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির এক মহুরিবাবুর কাছে কান নাচানো শিখিয়েছিলাম, ইচ্ছে করলেই ফটাফট কান নাড়াতে পারতাম, হাতি যেমন কান নাড়ায় সেই রকম আর কী। তা মাঝে মধ্যে কান নাড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখি কানে ব্যথা আছে নাকি, সঙ্গে সঙ্গে টের পাই আছে। সাংঘাতিকভাবে আছে।
সব ওষুধ, চিকিৎসা বাদ দিয়ে এখন আমি ব্যায়ামে এসে পৌঁছেছি। গাত্র ব্যথা কমানোর একমাত্র উপায় উপযুক্ত ব্যায়াম। অবশেষে সেটাই জেনেছি।
খোঁজ নিয়ে আরও জেনেছি যে এই কলকাতা শহরে অন্তত শখানেক বিশ্বশ্রী, যোগসম্রাট, আয়রন ম্যান ইত্যাদি আছেন। তাদেরই একজনের হাতে আমি নিজেকে সমর্পণ করেছি।
তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী বাসায় সকাল-বিকেল দুবেলা শারীরিক যন্ত্রণা যথাসাধ্য উপেক্ষা করে উঠ বোস করি, ঘুরপাক খাওয়ার চেষ্টা করি।
আমাদের অনেক দিনের পুরনো কাজের মেয়ে বাসনা সদা-সর্বদাই আমাদের নানাবিধ অযাচিত উপদেশ দিয়ে থাকে।
এই রকম প্রবল দেহকষ্টের মধ্যে আমার ব্যায়াম করা দেখে দ্বিতীয় দিনের মাথায় বাসনা বলল, তুমি যতই এক্সসাইজ করো তুমি আর লম্বা হবে না।
বাসনার এক্সসাইজ মানে এক্সসারইজ অর্থাৎ ব্যায়াম। তার বক্তব্য হল, আমি যতই ব্যায়াম করি না কেন আমার আর লম্বা হওয়া হবে না।
হায় কপাল!
আমার বয়েস তিনকাল পেরিয়ে এককালে পৌঁছতে চলেছে, এই বয়েসে আমি লম্বা হতে চেষ্টা করব কেন?
কিন্তু বাসনাকে এসব কথা বুঝিয়ে লাভ নেই। সে আমাকে মহাদেবপুরে কম্বল বাবার কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। যিনি এক ফুয়ে আমার এই ব্যথা উড়িয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা আমি যাইনি। সেই থেকে তার ধারণা হয়েছে আমার ব্যথাটা তেমন গুরুতর নয়।
সে যা হোক বাসনার কথায় কিন্তু আমার মনে একটু খটকা লাগল, একটু অন্যরকম খটকা।
গত চল্লিশ বছর আমি আমার উচ্চতা মাপিনি। কোনও সুস্থ মস্তিষ্কপ্রাপ্ত বয়স্ক লোকই নিজের উচ্চতা মাপতে যায় না। মাপার দরকার পড়ে না। একটা বয়েসের পরে মানুষ আর লম্বা হয় না, বরং বেশি বয়সে উচ্চতা একটু কমেই যায় বলে শুনেছি।
অফিসের সার্ভিস বুকে, পাসপোর্টে আমার উচ্চতা লেখা আছে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। এতকাল ধরে সেটাই চলে আসছে। এ নিয়ে আর কে মাথা ঘামায়?
বাসনার কথার পর একটা স্কেলকাঠি নিয়ে বাড়ির দরজায় দাগ একে মেপে দেখলাম আমার উচ্চতা এখন আর মোটেই পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি নয়, বরং দেখা যাচ্ছে তার থেকে একটু বেশি, পাঁচ সাড়ে চার।
এ ঘটনা বেশ কয়েকদিন আগের। এখনও নিয়মিত উঠ-বোস ইত্যাদি ব্যায়াম করে যাচ্ছি। আজ সকালে নিজেকে আবার মাপলাম, আজ দেখলাম পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি ছাড়িয়ে গেছি।
জানি না আরও লম্বা হওয়া কপালে আছে কি না। এরকম বিস্ময়কর ঘটনা আমার জীবনে ঘটবে এ কথা কখনও ভাবিনি। ভাবা যায় না।
আমার এই উন্নতির কথা আমার স্ত্রীকে, আমার ভাইকে বললাম। তারা বিশ্বাস করল না। বলল, চোখে দেখে আমরা কোনও তারতম্য বুঝছি না। আমি বললাম, স্কেলকাঠি দিয়ে মাপো। তারা রাজি হল না, অবিশ্বাসের হাসি হাসল।
অবশেষে বাসনাকে ধরলাম, তুমি না বলেছিলে, আমি আর লম্বা হব না। এদিকে দ্যাখো আমি এক ইঞ্চি বেড়ে গেছি।
এর উত্তরে বাসনা যা বলল, তা অতি চমৎকার। সে বলল, আমি জানতাম।
