ভাগ্যিস বহুকাল আগে একটা ভাল দেখে বিয়ে করেছিলাম, সতী-সাধ্বী সহধর্মিণী এসে কোমর জড়িয়ে ধরে (যেভাবে বলনাচের সময়ে মেম ললনারা তাদের নৃত্য সঙ্গীদের আকর্ষণ করে থাকেন) আমাকে বিছানা থেকে টেনে তুললেন। কিন্তু তাতে তো সমস্যার সমাধান হল না, বরং সমস্যা শুরু হল।
বাথরুমে গিয়ে টুথপেস্ট হাতে তুলতে গিয়ে মনে হল গন্ধমাদন পর্বত তুলছি। বাথরুমের দরজা বন্ধ করতে পারলাম না। ছিটকিনি পর্যন্ত হাত তুলতে গিয়ে অধপথে যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান হতে যাচ্ছিলাম।
ঘোরতর বিপদ হল। প্রাতঃকৃত্য সমূহ দুই হাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হাত যদি অপারগ হয়? এরকম ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন অতি বড় শত্রুকেও যেন না হতে হয়। এমনকী বাড়িওলা, ওপরওলা, পাহারাওলা–কেউ যেন এমন কষ্টে না পড়েন।
.
এই পর্যন্ত পাঠ করে কোনও পাঠক যদি তার স্ত্রী আমার প্রাণপ্রিয়া পাঠিকা ঠাকুরানিকে বলেন, তোমার ওই তারাপদবাবু ডাক্তার দেখান না কেন? এত আদিখ্যেতার কী আছে?
ডিয়ার মি. জিলাস (Dear Mr. Jealous), প্রিয় ঈর্ষাবাবু, আমি জানি, আপনারা ভাবছেন, তারাপদর হাত দুটো নুলো হয়ে যাক তা হলে তারাপদ আর লিখতে পারবে না, আমার বউ আর ওই বোকাসোকা, মোটাসোটা তারাপদ রায়ের লেখা পড়ে বিহ্বল হওয়ার সুযোগ পাবে না। ওই ডাক্তার না দেখানোর প্রশ্ন নিয়ে একজন পাঠিকা একদিন ঠিকানা খুঁজে খুঁজে আমার আবাসে এসে পৌঁছলেন। তিনি আমার নট-নড়নচড়ন-নট-ফট ঋজু মেরুদণ্ড এবং প্রসারিত বাহুদ্বয় দেখে কেমন বিহ্বল হয়ে গেলেন, আমার স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, সর্বনাশ! কোনও ডাক্তার দেখাননি?
ডাক্তার দেখাইনি?
ডাক্তার না দেখিয়ে ভবসিন্ধু অতিক্রম করা যায়? কেউ পার হয়েছে?
এসব ক্ষেত্রে যেমন হয়, প্রথমে পরোক্ষভাবে চিকিৎসকের সাহায্য গ্রহণ করি। পরোক্ষ চিকিৎসার ব্যাপারটা সবাই জানেন, যেকোনও অসুখের গোড়ার দিকে আমরা সবাই এটা করি। কায়দাটা সোজা। কোনও অসুখ হলেই সেটা প্রতিবেশী আত্মীয় বা বন্ধুদের জানালে একটা না একটা প্রেসক্রিপশন পাওয়া যাবেই। ইতিপূর্বে যাঁরা এইরকম বা অনুরূপ ব্যাধিতে ভুগেছেন তাদের ডাক্তারবাবু যা যা ওষুধ ও পথ্য দিয়েছিলেন তাই দিয়েই চিকিৎসা শুরু করা যায়।
আমার এক সহকর্মীর শ্যালিকা গত বছর সারা শীতকাল নাকি এই রকম ব্যথাবেদনায় শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে বেদনাহর ট্যাবলেটের নাম জানা গেল, তবে তাঁর মোটেই মনে নেই ওষুধের মাত্রা কী রকম ছিল, দৈনিক কয়টা ট্যাবলেট খেতে হবে এবং কখন, খাওয়ার আগে না খাওয়ার পরে, খালি পেটে না রাতে শোওয়ার সময়।
একটা চালাকি করলাম। একজন বড় ডাক্তারকে টেলিফোন করে বললাম, ডাক্তারবাবু, আপনি আমাকে হাতপিঠ ব্যথার জন্যে সকালবেলা পেইনফিনিশ বলে যে ট্যাবলেটটা দিয়েছিলেন, সেটার প্রেসক্রিপশনটা হারিয়ে ফেলেছি। ডোজটা যদি একটু বলেন।
ডাক্তারবাবু বললেন, কোথাও আপনার একটু কিছু ভুল হয়েছে। আমি পেইনফিনিশ রোগীদের দিই না, ওটা সাংঘাতিক ওষুধ এক ডোজেই যেমন তেমন রোগী ফিনিশ হয়ে যায়।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে দিলাম।
তবে সহকর্মীর শ্যালিকার কাছে অল্প কিছুটা ব্যবহৃত ব্যথা উপশমের অর্ধ টিউব মলম পাওয়া গিয়েছিল। টিউবের গায়ে ময়লা জমে ডেট অফ এক্সপায়ারিটা অর্থাৎ কার্যকারিতার সময়সীমা পড়া যাচ্ছিল না, সে যা তোক বিনি পয়সার মলমটা দুদিন ব্যবহার করলাম।
এরপর একটা নতুন উপসর্গ যোগ দিল। এত দিন স্নায়ু, মজ্জা, পেশিতে যন্ত্রণা হচ্ছিল এবার সেই সঙ্গে চামড়ার ওপরে জ্বালা শুরু হল।
শরীরের জ্বালা যন্ত্রণায় এবং মনের দুঃখে মলমের টিউবটা জানলা দিয়ে উঠোনে ফেলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে একটা কাক এসে সেটাকে মুখে তুলে নিয়ে বোধহয় বাসা বানাতে চলে গেল।
যথারীতি এরপরে এক হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। ডাক্তার ভদ্রলোককে দেখে বেশ শ্রদ্ধা হয়েছিল, তাকে বেশ দায়িত্বশীল মনে হয়েছিল। তিনি এক পুরিয়া ওষুধ দিয়ে পরের দিন ভোরবেলায় খালি পেটে খেয়ে নিতে বললেন।
ভদ্রলোকের বিরাট প্র্যাকটিস, গভীর রাতেও তার চেম্বার গমগম করছে রোগী ও রোগীর আত্মীয়স্বজনে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছিল, তার দেখা মিলল রাত পৌনে বারোটায়।
ডাক্তারবাবুর শুধু কান দেখে চিকিৎসা। তিনি আমাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজে উঠে দাঁড়িয়ে আমার চার পাশে ঘোরাফেরা করে দুটো কান পর্যায়ক্রমে হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করিয়ে আমার রোগ নির্ণয় করতে লাগলেন।
এর আগে বুঝিনি তিনি কানে হাত দিতেই বুঝতে পারলাম পেশি যন্ত্রণা কানেও সঞ্চারিত হয়েছে, নিরুপায় হয়ে উঃ আঃ করে যেতে লাগলাম।
এরপর ডাক্তারবাবু এক পুরিয়া ওষুধ দিয়ে বললেন, এই ওষুধটা অল্প জল দিয়ে কাল খুব সকালে খালি পেটে খেয়ে নেবেন। আর এরমধ্যে পান-দোক্তা, বিড়ি-সিগারেট, গাঁজা, ভাং, মদ, পেঁয়াজ, রসুন, বোয়াল মাছ, চিংড়ি মাছ–এসব খাবেন না।
আমি ডাক্তারবাবুর নির্দেশ শুনে বললাম, ডাক্তারবাবু এখন রাত প্রায় বারোটা বাজে। বাড়ি যেতে যেতে সাড়ে বারোটা-একটা হয়ে যাবে। আর আপনার ওষুধটা খেতে হবে কাল সকাল সাড়ে পাঁচটা-ছয়টার মধ্যে। আপনি নিষেধ না করলেও এই অল্প সময়ের মধ্যে, এই গভীর রাতে আপনার ওইসব নিষিদ্ধ ও মহার্ঘ জিনিস আমার পক্ষে সংগ্রহ করা মোটেও সম্ভব হত না।
