সংবাদটি অবশ্য আরও বড় করে ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে লেখা। কিন্তু সংবাদের সারমর্মটি সহদেববাবুকে বেশ ভাবিত করল।
এ ছাড়াও ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় একেবারে নীচের দিকে একটি ক্ষুদ্র সংবাদ আছে।
আলিপুরে ছিঁচকে চোরের উৎপাত।
কে বা কাহারা বিখ্যাত শিল্পপতি উদয় চৌধুরীর বাসভবনে কাল রাতে প্রবেশ করে তার মূল্যবান স্পোর্ট শর্ট, ব্যাবিটো শার্ট এবং পাওয়ার জুতোজোড়া নিয়ে পালিয়েছে। চৌধুরী সাহেব এখন দিল্লিতে, তার বাড়িতে অন্য কারণে যোগাযোগ করা হলে তাঁর স্ত্রী এই খবরটি জানান।
.
পটললালের অপহরণের সঙ্গে এই ঘটনাগুলো জড়িয়ে দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে লাগলেন তীক্ষ্ণধী সহদেব ডাক্তার।
দুয়ে দুয়ে সব সময়ে যে চার হয় না, বহু সময়েই দুই হয়, শিবরাম চক্রবর্তীর এই উপপাদ্যটিও জানা আছে সহদেববাবুর।
এর মধ্যে আরেকটা ব্যাপার দাঁড়িয়েছে ঠিক পরশুদিন, তার এক পুরনো রোগী ঝরিয়ার আতঙ্ক গর্জনপ্রসাদ রাতে ঘুম হচ্ছে না বলে তার কাছ থেকে এক শিশি সম্মুখে শান্তি পারাবার নিয়ে গেছে। গর্জনপ্রসাদ হেঁচকির রোগী, সদাসর্বদা তার হেঁচকি ওঠে, রাতে হেঁচকির জন্যে ঘুম হয় না।
তিনটে ব্যাপার পটলবাবুর কাছ থেকে জানতে হবে, এইরকম ভাবছেন সহদেব ডাক্তার। এমন সময় আবার ফোন এল পটললালের।
সাফারি সুটের বড়সাহেব এসেছে। বড়সাহেবের পরনে খাদির আলিগড়ি পাজামা, হাঁটুঝুল পাঞ্জাবি, সুগন্ধী পান চিবোচ্ছেন আর হেঁচকি তুলছেন।
পটললালকে দেখে বড়সাহেবের একটু খটকা লাগল। এই ছিঁচকে চেহারার লোকটা বিখ্যাত শিল্পপতি উদয় চৌধুরী! এর হালচাল দেখে তো একে বিশাল শিল্পপতি বলে মনে হয় না।
রুপোর কৌটো থেকে আরেকটা পান বের করে মুখে পুরে বড়সাহেব হাতজোড় করে পটললালকে নমস্কার করলেন। তারপর বললেন, সুপ্রভাত চৌধুরীজি, আপকো বহোত তকলিফ হল। আর একটা কাম বাকি, এবার ফোন করে বলে দিন একটা রেশন ব্যাগের মধ্যে টাকাটা ভরে আজ সন্ধ্যা ছটার সময় রেডি রাখতে। কোথায় কাকে কীভাবে দিতে হবে সেটা পরে বলছি।
বাধ্য বালকের মতো পটললাল আবার ডাক্তার সহদেব শুককে ফোন করলেন, সঙ্গে সঙ্গেই সহদেববাবুকে পাওয়া গেল।
পটললাল তাকে বললেন, পুরো পঁচিশ লাখ টাকা আজ সন্ধ্যা ছয়টার সময় দিতে হবে।
সহদেব ডাক্তার বললেন, সে দেখা যাবে। তার আগে আপনি আমার তিনটি প্রশ্নের জবাব দিন। যদি তিনটি প্রশ্নের জবাবই হ্যাঁ হয়, তবে বেশি কথা না বলে শুধু একবার হ্যাঁ বলবেন।
পটল বললেন, প্রশ্ন তিনটে বলুন।
সহদেব ডাক্তার বললেন, এক নম্বর প্রশ্ন হল, এরা কি আপনাকে শেষরাতে আলিপুরের রাস্তা থেকে ধরেছে? প্রশ্ন নম্বর দুই হল, তখন কি আপনার পরনে শর্ট-শার্ট ইত্যাদি ভ্রমণকারীর পোশাক। ছিল এবং সে পোশাক কি আপনি আশেপাশের কোনও বাড়ি থেকে সংগ্রহ করেছিলেন? আমার তৃতীয় ও শেষ প্রশ্ন, আপনাকে গাড়িতে তুলে আপনার নাকে কি ঘিয়ের সঙ্গে ফিনাইল আর রসুনের। রস মেশালে যেরকম গন্ধ হতে পারে সেই রকম গন্ধ শুকিয়েছিল?
পটললাল বিস্মিত হয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।
সহদেব ডাক্তার বললেন, তিনবার হা না বলে একবার বললেই হত। সে যা হোক, আপনার সামনে কি কোনও লিডার চেহারার লোক জাপান খাচ্ছে আর হেঁচকি তুলছে? যদি তাই হয়, তাকে ফোনটা দিয়ে বলুন কড়েয়ার ডাক্তার শুক কথা বলবেন।
স্তম্ভিত পটললাল বড়সাহেবের হাতে ফোনটা তুলে দিয়ে বললেন, কড়েয়ার ডাক্তার সহদেব শুক কথা বলবেন।
বড়সাহেব সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনটা নিয়ে রাম রাম ডাক্তারজি বলে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললেন।
.
পটললাল বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছেন। বড়সাহেব লোক খারাপ নন। অকারণ হেনস্থা বাবদ তিনি পটললালকে পাঁচশো টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পর, ব্রিজের পাশ থেকে তিনশো টাকা দিয়ে দেড় কেজি ইলিশ মাছ নিয়ে বাড়ি এসেছেন, মিস জুলেখা এতই খুশি হয়েছেন, পটললাল দুদিন কোথায় ছিলেন তাও জানতে চাইলেন না।
পটললালকে যদি আপনারা কেউ চাক্ষুষ দেখতে চান, যেকোনও দিন সকালবেলা তিলজলা চলে যাবেন। তপসিয়ামুখী কর্দমাক্ত গলিপথে যে ব্যক্তিকে দামি শর্ট-শার্ট পরে পাওয়ার শু পায়ে মাতব্বরি চালে হাঁটতে দেখবেন, তিনিই পটললাল পাল।
পাঁচ-পাঁচ
এবছর বর্ষার শেষে একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে দেখি ডান হাতের কবজিটা কেমন ঝিনঝিন করছে। হাত ওঠাতে, নাড়াচাড়ায় বেশ কষ্ট হচ্ছে।
বেলা বাড়তে চলাফেরা করার সঙ্গে সঙ্গে বেদনাটা কমে মিলিয়ে গেল, বিকেলের দিকে খেয়ালই থাকল না যে সকালের দিকে ওই রকম কষ্ট হয়েছিল।
কিন্তু পরের দিন সকালে আবার সেই কষ্ট, এদিন আরও বেশি। যন্ত্রণাটা এদিন বিকেলের দিকেও কমল না। সেই সঙ্গে কবজি ছাড়িয়ে পুরো ডান হাতটায় ব্যথা ছড়িয়ে গেছে। ৪৬৬
দু-একদিনের মধ্যে ব্যথাটা ছড়িয়ে পড়ল ডান কাঁধে। তারপর বাঁ কাঁধে এল, অবশেষে তীব্রতর হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাঁ হাতে।
অসহ্য যন্ত্রণা। দু হাতের একটা হাতও ভাল করে তুলতে পারি না। ডান হাত, বাঁ হাত দু হাতই যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কখনও মনে হচ্ছে ডান হাতেই বেশি কষ্ট হচ্ছে, কখনও মনে হচ্ছে বাঁ হাতটা কেটে ফেললে আরাম হবে।
সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর বিছানা থেকে আর উঠতে পারি না। এবার পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে ব্যথাটা গলিত ধাতুর মতো জ্বালাতে জ্বালাতে পোড়াতে পোড়াতে নেমে আসছে।
