ইতিমধ্যে পটললাল পুরো ব্যাপারটা মনে মনে ভেবে দেখেছেন। যেকোনও কারণেই হোক এখানে তাকে ধরে আনা হয়েছে। জায়গাটা সম্ভবত কোনও বন্ধ কয়লাখনির পরিত্যক্ত কুলিব্যারাক।
আসানসোল-ধানবাদ অঞ্চলের এরকম নানা জায়গায় যাত্রাপার্টির সঙ্গে মিস জুলেখার তলপিবাহক হিসেবে তাকে বহু ঘুরতে হয়েছে।
সে যা হোক পটললাল ভাবতে লাগলেন, হঠাৎ তাকে এভাবে ধরে এনে এতদূরে আটকে রাখার মানে কী?
অবশ্য বেশিক্ষণ ভাবতে হল না, একটু পরেই ক্রিম রংয়ের সাফারি সুট পরা সেলুলার ফোন হাতে এক ব্যক্তি এলেন, তাঁকে বললেন, গুড মর্নিং মি. চৌধুরী।
পটললাল বললেন, আমি চৌধুরী নই। আমার নাম পটললাল পাল।
সাফারি সুট বাঁকা হাসি হেসে বললেন, নিজের নাম অস্বীকার করে কোনও লাভ নেই মি. চৌধুরী। অনেক খোঁজখবর করেই আপনাকে ধরে আনা হয়েছে। এখন বেগড়বাই করবেন না, বিপদ হবে।
চকিতে পটললালের মনে পড়ল, যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি এদের হাতে বন্দি হয়েছেন সে বাড়ির গেটে লেখা ছিল, উদয় চৌধুরী। তার বুঝতে অসুবিধে হল না, উদয় চৌধুরী ভ্রমেই তাকে এখানে ধরে আনা হয়েছে।
এই সময়ে সাফারি সুট তার হাতের ফোনটা পটললালকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি বাসায় বলে দিন ভাল আছি। আর আজ বিকেলের মধ্যে নগদ পঁচিশ লক্ষ টাকা জোগাড় করে একটা সুটকেসের মধ্যে ভরে রাখতে বলে দিন। কোথা থেকে কীভাবে টাকাটা নেব সেটা পরে জানাচ্ছি।
এরপর ধমকের সুরে সেই সাফারি সুট তাঁর দেহাতি বাংলায় বললেন, কোনও চালাকি করতে যাবেন না। বাসায় বলে দিন পুলিশে যেন খবর না পায়, তাহলে এখানে আপনাকে জ্যান্ত পুঁতে রেখে দেব। কোনওদিন কেউ খোঁজ পাবে না। চারদিকে পাহারা রাখা আছে, পালাতেও পারবেন না।
সেলুলার ফোনটা হাতে নিতে নিতে পটললাল একবার ভাবলেন এদের বলি, আমি উদয় চৌধুরী নই। আমি পটললাল পাল। আমার স্ত্রীর পঁচিশ লাখ টাকা নেই, পঁচিশ টাকাও আছে কিনা সন্দেহ আর আমার নিজেরও পঁচিশ টাকা নেই। তা ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, আমার বাড়ির ফোন বিল দেওয়া হয়নি বলে গত মাসে কেটে দিয়েছে।
এরকম দুরূহ অবস্থায় পটললাল কখনও পড়েননি। একেবারে জীবনমৃত্যুর মুখোমুখি। কিন্তু পেটের দায়ে তাকে সারাজীবন বিস্তর ঝুট-ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং সেসব কেটে বেরিয়ে এসেছেন।
এবারেও বেরোতে হবে, তবে আমি উদয় চৌধুরী নই এ কথা এদের এখন বোঝানো যাবে না। পটললাল চিন্তা করতে লাগলেন, একটু খোঁজখবর করলেই এরা সেটা ধরতে পারবে। ততক্ষণ পর্যন্ত কোনওভাবে আত্মরক্ষা করতে হবে।
ফোন হাতে ধরে পটললাল নিশ্ৰুপ বসে আছেন দেখে সাফারি সুট এবার খেঁকিয়ে উঠল, কী হল, জলদি করুন।
পটললাল ধমক খেয়ে একটু থতমত হয়ে গেলেন, তারপর বললেন, দেখুন বাড়িতে ফোন করে লাভ নেই। আমার বাড়ি থেকে পঁচিশ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারবে না।
সাফরি সুট ভুরু কুঁচকিয়ে বললেন, তা হলে?
পটললাল বললেন, যদি অনুমতি করেন, আমি একটু আলাদাভাবে চেষ্টা করি।
সাফারি সুট একটু চিন্তা করলেন, তারপর বললেন, চেষ্টা করতে পারেন। এদিক ওদিক করতে যাবেন না। গোলমাল হলে বড়সাহেব আপনার-আমার দুজনারই হাইট ছয় ইঞ্চি ছোট করে দেবেন।
পটললাল অবাক হয়ে বললেন, ছয় ইঞ্চি ব্যাপারটা কী?
গলা কেটে ফেললে হাইট ছয় ইঞ্চি ছোট হয়ে যায়, জানেন না? সাফারি সুট অবাক হয়ে যায় পটললালের অজ্ঞতায়।
ডাক্তার শুক
আজ সকালে চেম্বারে রোগীর ভিড় একটু কম। ডাক্তার সহদেব শুক রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখছিলেন, একটু হালকা ধরনের কবিতা।
কনের পিসি বরের মাসি
সারা বছর সর্দি কাসি
বরের মাসি কনের পিসি
ওষুধ খায় শিশি-শিশি ॥
এমন সময় ফোনটা এল, ডাক্তারবাবু আমি পটললাল বলছি।
সহদেব ডাক্তার বললেন, আরে পটলবাবু কোথা থেকে বলছেন?
পটলবাবু বললেন, সেটাই জানি না।
সহদেব বললেন, কী ব্যাপার বলুন?
পটললাল বললেন, আমায় বন্দি করে রাখা হয়েছে, পঁচিশ লাখ টাকা মুক্তিপণ না দিলে এরা ছাড়বে না। তারপর একবার সাফারি সুটের দিকে তাকিয়ে বললেন, এরা অবশ্য এখনও পর্যন্ত আমার ওপর কোনও অত্যাচার করেনি।
ডাক্তার সহদেব অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পটললালের কাছে পুরো বৃত্তান্ত শুনলেন। হঠাৎ পটললাল বললেন, এখন ছেড়ে দিচ্ছি। ফোনটা কেটে গেল। দুটো জিনিস ডা. শুককে স্ট্রাইক করেছে।
প্রথমটি তার নিজের ব্যাপার। গোপনে তিনি একটা নতুন ওষুধ চালু করেছেন। হোমিওপ্যাথিক ক্লোরোফর্ম জাতীয় তরল ওষুধ। রুমালে ঢেলে একবার শুকলে ঘুম ঘুম ভাব আসবে, ঘুমের ট্যাবলেট খেলে কিংবা অল্প মদ খেলে যেমন হয়।
কবিস্বভাব এবং স্বভাবকবি সহদেব ওষুধটার নাম দিয়েছেন, সম্মুখে শান্তি পারাবার।
ওষুধের শিশির গায়ে লাল কালিতে ছাপার হরফে লেখা থাকে।
দুবার চারবার নয় মাত্র একবার।
তা না হলে একেবারে শান্তি পারাবার ॥
দ্বিতীয় যে ঘটনা সহদেববাবুকে ভাবাচ্ছে সেটা হল আজকের সকালবেলায় খবরের কাগজের দুটি সংবাদ।
প্রথম সংবাদটি: প্রথম পৃষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে
অজ্ঞাতপরিচয় প্রাতঃভ্রমণকারী অপহৃত।
সংবাদপত্রের ভাষায়
গতকাল ভোররাতে চিত্রতারকা রমলাদেবী যখন তার দেহরক্ষকের সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন, তিনি দূর থেকে দেখেন যে মর্নিং ওয়াকের পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তিকে জোর করে একটি মারুতি ভ্যানে তুলে নিচ্ছে। অপহৃত ব্যক্তিকে অত দূর থেকে তার কেমন চেনা চেনা মনে হয়, কিন্তু ঠিক চিনতে পারেননি।..
