কাঞ্চা অবশ্য জানে না যে আজ ইউ সি বেড়াতে বেরোবেন না। কাল গভীর রাত পর্যন্ত ক্লাবে হই-হুঁল্লোড় হয়েছে। তারপরে আটটার সময়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে দিল্লি যাওয়ার জন্যে। আজ ইউ সি একেবারে সেই সাতটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে সরাসরি এয়ারপোর্ট চলে যাবেন। আজ হাঁটা নেই।
এদিকে পটললাল সামনে গেট খোলা পেয়ে এবং কোনও বাধা না পেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। বাড়িতে ঢোকার সময় গেটের পাশে নেমপ্লেটে দেখে নিয়েছেন লেখা আছে, ইংরেজিতে ও বাংলায়।
U. C. Chaudhuri
উদয়চাঁদ চৌধুরী
আউটহাউসের বারান্দায় কাঞ্চা অকাতরে ঘুমোচ্ছে। পটললাল সন্তর্পণে বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
কলকাতা শহরের তুলনায় এমনকী নিউ আলিপুরের তুলনায়ও বাড়িটা বড়। সামনে একফালি ফুলের বাগান। বাড়ির পিছনদিকে একটা লন। সেখান দিয়ে ভিতরবাড়ির ছোট সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির নীচেই একটা ঘরের দরজা খোলা, আলো জ্বলছে।
আলোটা একটু আগে বাইরের গেট খোলার সময় কাঞ্চাই ঘরের দরজা খুলে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে।
সিঁড়ির নীচে এই ছোট ঘরটা হল ইউ সি-র ড্রেসিং রুম। শেষরাতে বাড়ির কাউকে বিরক্ত না করে রাত-পোশাক এখানে ছেড়ে হাফ প্যান্ট, স্পোর্টস গেঞ্জি এবং পাওয়ার শু পায়ে দিয়ে প্রত্যহ ইউ সি হাঁটতে বেরিয়ে যান। আবার হেঁটে ফিরে এসে এখানেই জামাপ্যান্ট ছেড়ে ওপরে উঠে যান।
আজ অবশ্য সেসব ঘটছে না। কিন্তু কোথাও কোনও বাধা না পেয়ে পটললাল সিঁড়ির নীচে এই ঘরে প্রবেশ করেছেন।
প্রথমে পটললাল ভেবেছিলেন বাড়িটা একটু ঘুরেফিরে দেখে নেবেন, সিনেমার সেট তৈরির সময় সুবিধে হবে। কিন্তু পটললালের নীতিবোধ খুব প্রখর নয়, আর তা ছাড়া যারা পটললালের কোনও গল্প আগে পড়েছেন তারা জানেন, পটললালের একটু হাতটানের অভ্যেস আছে।
আজ একতলার খালিঘরে ঢুকে মূল্যবান শর্ট, শার্ট এবং জুতো দেখে পটললাল লোভ সম্বরণ করতে পারলেন না। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ইউ সি-র প্রাতঃভ্রমণের পোশাক তিনি পরে নিলেন। এই হতদরিদ্র টাউট এবং সফল শিল্পপতির শরীরের গড়নে খুব ফারাক নেই। পোশাক-আশাক ভালই ফিট করেছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের পুরনো জামাকাপড় ছেঁড়া হাওয়াই চটি লনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পটললাল সদর গেট দিয়ে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হলেন।
ঘুমঘোরে কাঞ্চা ভাবল সাহেব বুঝি বেরিয়ে গেলেন, সে উঠে গিয়ে সদর দরজায় আবার তালা দিয়ে দিল।
পটললাল মনের আনন্দে তার নবযৌবনের হিন্দি সিনেমার গানের কলি হাম তুম এক কামরামে অস্ফুট স্বরে গাইতে গাইতে মোড়ের দিকে এগোতে লাগলেন। এরকম একজোড়া শর্ট-শার্ট, পাওয়ার জুতো তার বহুকালের স্বপ্ন।
পটললাল মোড়ের কাছে পৌঁছে দেখলেন, একটি মারুতি ভ্যান খারাপ হয়ে গেছে, চারজন লোক বনেট তুলে গাড়িটা সারানোর চেষ্টা করছে।
পটললাল গাড়ির কাছে পৌঁছতেই একটা কাণ্ড ঘটল। যারা গাড়ি সারাচ্ছিল তাদের মধ্যে তিনজন হঠাৎ লাফ দিয়ে এসে পটললালকে জাপটিয়ে ধরল।
পটললাল ঘটনার আকস্মিকতায় খুবই হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। চেঁচাতে যাচ্ছিলেন। বিপদে পড়লে চেঁচানোয় এবং সম্ভব হলে, দৌড়ে পালানোয় পটললালের অসীম দক্ষতা।
কিন্তু আজ কোনওটাই কাজে লাগল না। দুজন তাঁকে জাপটে ধরেছে আর তৃতীয় জন তার মুখে এমনভাবে হাতচাপা দিয়েছে যে চেঁচানো অসম্ভব। আর নির্জন রাতের শূন্য রাস্তায় চেঁচিয়েই বা কী লাভ হত।
ইতিমধ্যে চতুর্থ ব্যক্তি গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে গিয়ে বসেছে। অন্য তিনজন পাঁজাকোলা করে পটললালকে মারুতি ভ্যানের সিটের পিছনের জায়গাটায় নিয়ে তুলেছে।
ধস্তাধস্তি করার চেষ্টা নিষ্ফল জেনে পটললাল চুপচাপ থাকলেন। তিনি কীসে কী হল কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। হঠাৎ একজন তার নাকের কাছে হাসপাতালগন্ধী কী একটা আরকসিক্ত তুলো চেপে ধরতে পটললাল জ্ঞান হারালেন।
জ্ঞানোদয়
পটললালের জ্ঞান হল আঠারো ঘণ্টা পরে সেদিন রাত দশটায়।
একটা প্রায়ান্ধকার ঘরে একপাশে খুব টিমটিম করে একটা কেরোসিনের কুপি জ্বলছে, অন্যপাশে একটা ভাঙাচোরা অর্ধ-অসমতল খাটের একপাশে সমতল দিকটায় তিনি ভেঁড়া গদির ওপরে বালিশবিহীন শুয়ে আছেন।
পটললাল প্রথমে ভেবেছিলেন এটা কোনও সিনেমার সেট। কিন্তু কিছু চিন্তা করার বা বুঝে ওঠার আগে তিনি আবার চেতনাহীন হয়ে গেলেন।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। এরই মধ্যে তার মনে পড়ছে কারা যেন দু গেলাস দুধ খাইয়েছিল কাল রাতে ঘুমের মধ্যে।
এখনও ঝিমুনির ভাব আছে। তবু কোনও রকমে বিছানা থেকে নেমে উঠে দাঁড়ালেন পটললাল। দেয়াল ধরে ধরে এগিয়ে ঘরের বন্ধ দরজার দিকে এগোনোর চেষ্টা করলেন। দরজার ধারে পৌঁছানোর আগেই লাল লুঙ্গিপরা একজন ষণ্ডা মতন খালিগায়ে লোক বাইরে থেকে দরজা খুলে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটি তাকে দেখে একটা নিমের দাঁতন আর গামছা তার হাতে দিয়ে, তাঁকে সঙ্গে করে উঠোনে নামল। উঠোনের একপাশে একটা বাথরুমের মতো ঘেরাও দিয়ে রাখা জায়গা। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে পটললাল সেখানে ঢুকে গেলেন।
স্নান ইত্যাদি সেরে আবার নজরদারের সঙ্গে তার ঘরে ফিরলেন। কয়েকটা ঠান্ডা পুরি আর হালুয়া, সেই সঙ্গে দেহাতি লাল জিলিপি বড় বড় আকারের একটা শালপাতার ঠোঙায় নজরদার এগিয়ে দিতে পটললাল গোগ্রাসে গিলতে লাগলেন।
