.
মূল গল্পের মধ্যে প্রবেশের আগে অন্য একটি চরিত্রের কথা উল্লেখ করতে হয়।
এই ব্যক্তিটি হলেন ডা. সহদেব শুক।
ভদ্রলোক কবি এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। সেই সঙ্গে শখের গোয়েন্দা। এই গল্পে তাঁর প্রবেশ গোয়েন্দা হিসেবেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ডা. সহদেব শুক মশায়ের আসল নাম হল নকুল শুকুল। তিনি কেন নকুল শুকুল থেকে সহদেব শুক হলেন সেটা যাঁরা জানেন না তাদের অনুরোধ করি পটললালের পুরনো গল্পগুলি পড়ে দেখতে, এই ছোট গল্পে সেসব বিষয়ে পুরালোচনার সুযোগ বা অবকাশ নেই।
শুধু একটা কথা বলার আছে, যদিও একদা নিতান্ত পেশাগত কারণেই তার সঙ্গে পটললালের পরিচয় হয়েছিল, ডা. শুক এই ছন্নছাড়া, কাণ্ডজ্ঞানহীন লোকটিকে বহুবার রক্ষা করেছেন। ডা. সহদেব শুক পটললালের একমাত্র সহায়।
গল্পকথা
নিউ আলিপুরের এই অঞ্চলটা আজ দুপুরেই ঘুরে গেছেন পটললাল। এখন শেষরাত।
জীবনমুখী প্রোডাকশনসের ব্যানারে নতুন ছবি শরীর এক জ্বালা। শুটিং শুরু হয়ে গেছে।
সপ্তাহ দুয়েক আগে পটললালের গৃহিণী জুলেখা জানতে চেয়েছিলেন, ওগো, তোমাদের নতুন পালাটার নাম কী?
পটললাল সরলভাবে বলেছিলেন, দুর্দান্ত নাম হয়েছে, শরীর এক জ্বালা।
জুলেখা স্থূলাঙ্গিনী হলেও তার হাত-পা খুব ভাল চলে, মুহূর্তের মধ্যে বাঁ হাতে পটললালের গালে একটা চপেটাঘাত করে কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ফাজলামি করার জায়গা পাওনি।
আসলে জুলেখা ভেবেছেন, তিনি মোটা হয়ে তার শরীর যে মাটির জালার মতো হয়ে গেছে, তার স্বামী তাই নিয়ে তাঁকে পরিহাস করছেন।
সেদিন পটললালের মহা হয়রানি হয়েছিল এ কথা বোঝাতে যে এ জ্বালা সে জালা নয়, দুজনেরই ক-অক্ষর গোমাংস, তা না হলে এ জ্বালায় যে একটা ব-ফলা আছে সেটা বোঝাতে এবং বুঝতে পারলে ঝগড়া খুব একটা গড়াত না।
সে যা হোক এই শরীর এক জ্বালা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে আছে যে গল্পের নায়িকা পরমাণু বিজ্ঞানের বিখ্যাত গবেষিকা এবং কলকাতা হাইকোর্টের নামজাদা ব্যারিস্টারের স্ত্রী একদিন শেষরাতে ছবির নায়ক বাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে গৃহত্যাগ করবে। তখন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজবে,
যেতে দাও গেল যারা,
তুমি যেয়ো না,
তুমি যেয়ো না..
পটললালকে পরিচালক পাঠিয়েছেন এই দৃশ্যের লোকেশন যাচাই করতে।
আজ দিনের বেলায় পাড়াটা ঘুরে দেখে গেছেন পটললাল। চিত্রনাট্যে যেমন বলা আছে তেমনই সব বড়লোকের বাড়ি। অবশ্য শুটিংয়ের সময় স্টুডিয়োর মধ্যে নানারকম জোড়াতালি দিয়ে, কারসাজি করে, বাড়ির ভেতরটা তৈরি করা যাবে। তবে রাস্তায় শেষরাতে একদিন আউটডোর শুটিং করতে হবে।
সাজানো সংসার ফেলে সতীসাধ্বী পরমাণু গবেষিকার পালিয়ে যাওয়ার সময়ের দ্বিধা, সেই সঙ্গে এম. এ. পাশ (ট্রিপল এম. এ. গোল্ড মেডালিস্ট), কোনও কাজ না পেয়ে যে ড্রাইভার হয়েছে এমন নায়কের সবল বাহুবন্ধনে নিমজ্জিতা নায়িকার দ্বিধামুক্তি–এরই পটভূমিকা শেষরাতের উদাস নির্জন অভিজাত পল্লি, আন্দোলিত দেবদারুতরু, পিয়াল শাখার ফাঁকে আধফালি চাঁদ।
এই সবের উপযুক্ত পরিবেশের অনুসন্ধানে আজ শেষরাতে পটললাল এখানে এসেছেন। সন্ধ্যাবেলায় পরিচালকের বাড়ির বাইরের ঘরে সোফার ওপরে শুয়েছিলেন, রাত তিনটের সময় পরিচালকের গাড়ি এসে তাকে পুরনো আলিপুর আর নিউ আলিপুরের মধ্যবর্তী এই অভিজাত এলাকায় নামিয়ে দিয়ে গেছে।
তাকে নামিয়ে দিয়েই গাড়ি ফিরে গেছে। কারণ পরিচালকের বাবা বাবুঘাটে গঙ্গাস্নানে যাবেন।
এর মানে হল পটললালকে এখন নিজের খরচায় বাড়ি ফিরতে হবে। তার বাড়ি তিলজলা পেরিয়ে। ট্যাক্সিভাড়া তার কাছে নেই, বাস-ট্রামেই যেতে হবে। তবে তার জন্য সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অবশ্য এই সময়ে ট্যাক্সিও পাওয়া যেত না।
উদোর পিণ্ডি
এসব পাড়ার রাস্তায় হেঁটেও আরাম। ফুটপাত তেমন ভাঙাচোরা নয়, তিলজলার গলির মতো নোংরা, কাদাভরা নয়।
যদিও সময়টা বর্ষার মাঝামাঝি, এখন আকাশে কোনও মেঘ নেই, শেষরাতের তারা ঝলমল, চন্দ্রনীল আকাশ। ঝিরঝির করে বাতাস বইছে।
নিজের এলাকার পথঘাটের দুর্গতির কথা ভুলে অভিজাত পল্লির শূন্য রাস্তায় পটললাল। পদচারণা করতে লাগলেন।
রাত ভোর হয়ে এসেছে। আশেপাশের দুয়েকটা বাড়িতে ঘরে আলো জ্বলে উঠল। লোকেরা ঘুম থেকে ওঠা আরম্ভ করেছে। এ অঞ্চলের ধনবান গৃহকর্তারা অনেকেই একটু পরে মর্নিং ওয়াকে বেরোবেন। তারই প্রস্তুতি চলছে। নানা লোকের নানারকম তদ্বির থাকে এই সব বৃহৎ ব্যক্তিদের কাছে, তাই এঁরা অন্ধকার থাকতে থাকতেই হাঁটতে বেরিয়ে যান, রোদ উঠবার আগেই বাড়ি ফিরে। আসেন, যাতে ভ্রমণের সময় কেউ বিরক্ত না করে।
.
এমন সময় ঘটাং করে একটা শব্দ হল। সামনের বাড়ির সদরের লোহার গেটটা একজন নেপালি দারোয়ান খুলে দিল।
সব নেপালি দারোয়ানই ছোটবেলায় কাঞ্চা, বড় হলে সে বাহাদুর। এই দারোয়ানের বয়েস বেশি হয়নি। এখনও সে বাহাদুর হয়নি, কাঞ্চাই আছে। কাঞ্চা একটু ঘুমকাতুরে। সে সদর দরজাটা খুলে দিয়ে পাশেই আউট হাউসের ঘরের বারান্দায় চারপায়ার ওপর গিয়ে শুয়ে পড়ল।
সুন্দর এই দোতলাবাড়ি শিল্পবিদ উদয় চৌধুরীর, যিনি কলকাতার শিল্পজগতে ইউ সি নামে বিখ্যাত। তিনি প্রত্যহ সকালে এই সময়ে হাঁটতে বেরোন। তাকে যাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে না হয় সাহেবকে, সেইজন্যে সে একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে রাখে।
