পটলবাবু বললেন, অবশ্য। অবশ্য। একই আইন, একই ধারা। দু জায়গাতেই চিটিং কেস।
মণি আবার বলল, আমাদের বইয়ের নাম কিন্তু শুধু চারশো বিশ নয়, আরেকটু বড়।
বড় নামটা বোধহয় মিসেস দত্ত বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ঠোঁট দিয়ে অস্ফুট মা-মা এই রকম শব্দ করে সোফায় গড়িয়ে পড়লেন।
পটললাল তাকে তুলে নিয়ে সোফার পিঠে হেলিয়ে দিলেন এবং ব্যাপারটার গুরুত্ব লাঘব করার জন্য, যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন। তার থেকেই জানা গেল, বইয়ের নাম মা কেন চারশো বিশ?
প্রশ্নবোধক এবং অর্থবোধক এরকম একটি নামকরণ দেখে আমি যথেষ্ট চমৎকৃত হলাম এবং আরও অবাক হলাম এই জেনে যে মণিগোপালের এই আগামী বইয়ের নামকরণ শ্রীমতী দত্তই করেছেন।
পটললাল বললেন, দত্তবউদির অনেক গুণ। যেমন পার্ট করতেন, তেমন নাচতেন। পুরনো বাংলা পৌরাণিক সিনেমায় উর্বশী পার্ট ছিল ওঁর বাঁধা। এক ঘের সাদা সিফনের শাড়ি পরে সেই নাচ দেখলে মুনি-ঋষিদের ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যেত, দর্শকেরা পয়সা ছুড়ত।
আমি মন দিয়ে শুনছিলাম। বেহুশ শ্ৰীমতী দত্ত সোফার ওপর কাত হয়ে পড়ে আছেন। পটললালের কথা শুনে একটু দেহচাঞ্চল্য দেখা দিল তার নাচের ভঙ্গিতে দুলতে লাগলেন। আমার ভয় হল, পৈতৃক আমলের পুরনো সোফা মহিলার ভারী শরীরের দোলনে ভেঙে না যায়।
ইতিমধ্যে পটললালের কাছে জানা গেল, শ্রীমতী দত্ত আজকাল গল্প, কবিতা, সিনেমার গান এই সব লিখছেন। মা কেন চারশো বিশ বইয়ের জন্যেও একটা গান লিখেছেন:
কত লম্পট দেয় চম্পট
মাতালেরা ছাড়ে মাল
এম এল এ সাহেব করেন গায়েব
কুমির ভরতি খাল।…
এই হল প্রথম চার লাইন। গানটি বেশ বড়। অনুরূপ আরও কয়েকটি গান শ্রীমতী দত্ত ওই বইয়ের জন্য লিখবেন। একটিতে হাত দিয়েছেন, শ্যামাসংগীতের ঢংয়ে লেখা,
(ওরে) তুই কেন মা, মা করিস
তোর মা যে চারশো বিশ…
শ্ৰীমতী দত্তের বহুগুণাবলির পরিচয় পেয়ে ক্রমশ তাজ্জব বনছিলাম। কিন্তু পটলবাবুর বক্তব্য শেষ হয়ে এল।
এইবার মণিগোপাল আসল কথায় এল।
আসল কথা খুবই জটিল। এই গল্পের জন্য খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়, তবু পাঠকের কৌতূহল নিবারণের জন্যে সংক্ষেপে বলি।
০৪. সারকথা
বাংলাদেশে মণিগোপালের দ্বৈত চরিত্র, মণি সাহা এবং মণি শেখ। কয়েকদিন আগে মণি সাহার নামে চোরাচালানের অপরাধে ঢাকার আদালত জামিন-অযোগ্য ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে।
এ অবস্থায় মণিগোপাল আপাতত মণি শেখ নামে নিজেকে রক্ষা করছে। সে এবার ঢাকা থেকে মণি শেখ নামের পাসপোর্ট নিয়ে এসেছে।
বিশেষ বৈষয়িক প্রয়োজনে মণিকে অবিলম্বে ঢাকায় ফিরতেই হবে, তা ছাড়া চোরাচালানি মামলাটির আপিল আছে, তদ্বির-তদারক আছে। কবে আবার কলকাতায় আসতে পারবে তা ঠিক নেই। কিন্তু এদিকে তার সহযোগী সরাইওয়ালা আর দেরি করতে রাজি নয়।
সরাইওয়ালার বিদ্যাবুদ্ধির ওপর মণিগোপালের খুব আস্থা নেই। অথচ সরাইওয়ালা সামনের শনিবার বিকেলেই মা কেন চারশো বিশ ছবিটার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চান।
যেহেতু মণির পক্ষে সামনের শনিবার পর্যন্ত থাকা সম্ভব নয় তাই সে আমার কাছে এসেছে, আমি যদি তার হয়ে শনিবারের প্রাথমিক আলোচনাটা উতরিয়ে দিই। যা করার শ্রীমতী দত্ত আর পটললালই করবেন, কিন্তু সরাইওয়ালা খুব ঘোড়েল লোক। আমাকে সেদিন অধিকতর ঘোড়েল লোকের ভূমিকায় প্রায় মূকাভিনয় করতে হবে। যথাসাধ্য চুপচাপ থাকলেই হবে। সেদিন রাতে মণি ফোন করবে ঢাকা থেকে তখন তাকে সব জানালেই হবে।
শুধু বিষয় বৈচিত্র্যের জন্যে নয়, লাস্যময়ী শ্রীমতী দত্তের একবেলার সাহচর্যের লোভে আমি মণির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। ঠিক হল, সামনের শনিবার বিকেল চারটের সময় পটললাল এসে আমাকে কেয়াতলায় শ্রীমতী দত্তের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবেন। সেখানেই সরাইওয়ালা এবং সিনেমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কেউ কেউ আসবেন এবং তখনই বইয়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
পরের শনিবার পটললালের সঙ্গে যথাসময়ে কেয়াতলায় পৌঁছে দেখি জমজমাট ব্যাপার। শ্ৰীমতী দত্তের ছোট ফ্ল্যাটের বাইরের ঘরে প্রায় আট-দশ জন লোক, তাদের মধ্যে সিনেমা লাইনের দাগি এবং গোলমেলে দুয়েকটিকে আমিও চিনি।
শ্ৰীমতী দত্ত আজ খুব সেজেছেন, চুলে ফুলের মালা, ভুরু লম্বা করে টানা, দেহে সুবাস। কিঞ্চিৎ নেশাও করেছেন মনে হল। তবে সেদিনের মতো বিহুলা নন। মি. সরাইওয়ালার সঙ্গে পরিচয় হল, তিনি তার নিজের ভাষায় হামি ফিফটি-ফিফটি বাঙালি আছে।
পানভোজনের যথেষ্ট আয়োজন হয়েছে। কড়া পানীয় আমার সহ্য হয় না। শ্রীমতী দত্ত নিজের হাতে আমাকে এক পেয়ালা চা করে দিলেন, সঙ্গে মাংসের বড়াও খেলাম।
ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। দেখা গেল, বইয়ের নায়ক-নায়িকা পাত্র-পাত্রী আগেই ঠিক হয়েছে, বইয়ের নাম তো স্থির হয়েই আছে। এবার স্থির হল বইটি হবে সোয়া দুঘণ্টার রিলের ফিল্মের দৈর্ঘ্য চারহাজার মিটারের মধ্যে না হলে খরচ বেশি হবে, আজকাল দর্শকরাও বিরক্ত বোধ করেন সিনেমা দীর্ঘ হলে।
লালরঙের একটা খেরোর খাতা নিয়ে পটললাল বসেছেন, তার ললাটে শ্ৰীমতী দত্ত সিঁদুর-চন্দনের মাঙ্গলিক ফোঁটা দিয়ে দিয়েছেন। পটললাল একে একে লিখে যাচ্ছেন, যখন যেমন আলোচনা হচ্ছে সব কিছু।
