প্রথম ছবিটির নাম, শয়তান খানখান। বাংলাদেশ যুদ্ধের পটভূমিকায় খান সেনাদের বিরুদ্ধে এক সামান্য গ্রাম্যবধূর মৃত্যুঞ্জয় সংগ্রামের অবাস্তব কাহিনি সাধারণ মানুষকে খুব আলোড়িত করেছে।
কলকাতার কাগজপত্রেও এ নিয়ে ঢের আলোচনা হয়েছে।
মণিগোপালের দ্বিতীয় ছবি, গাবলুর ছেলে গুণ্ডা নামেই এর পরিচয়। এই বইও প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
০৩. পটললাল ও মণিগোপাল
অবশ্য শ্রীমান মণিগোপাল আমার কাছে তার সিনেমা-টিনেমার ব্যাপার নিয়ে কখনও কোনও কথা বলেনি, তবে আমি যে অল্পবিস্তর খোঁজখবর রাখি সেটা সে বুঝত।
তা হঠাৎ একদিন সকালে মণিগোপাল ফোন করল ঢাকা থেকে, সন্ধ্যাবেলা বাসায় আছেন?
আমি বললাম, তা আছি। তুমি কোথা থেকে ফোন করছ।
মণি বলল, ঢাকা থেকে। তবে দুপুরের ফ্লাইটেই কলকাতা পৌঁছাচ্ছি। আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে।
কী দরকার, কিছুই শুনলাম না, তবু বললাম, ঠিক আছে এসো। তবে বেশি দেরি করো না।
দেরি অবশ্য করেনি। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ মণি এল, সঙ্গে আরও দুইজন। এর মধ্যে একজন খুবই পরিচিত মুখ, প্রায় গতযৌবনা বাংলা চলচ্চিত্রের অস্তাচলগামী তারকা শ্রীমতী মানসী দত্ত। ইনিই কিছুদিন হল মণির কাঁধে চেপেছেন। মণিকে দেখে মনে হচ্ছে মণি সানন্দেই এ ভার বহন করছে।
কোনও কোনও রমণীকে দেখলে, লাস্য শব্দটির অর্থ বোধগম্য হয়। বয়েস হলেও, এই মহিলাকে দেখে আবার বহুদিন পরে লাস্য শব্দটির অর্থ অনুধাবন করলাম।
সঙ্গের তৃতীয় ব্যক্তিটি একটি নড়বড়ে চেহারার মাঝবয়েসি লোক। আমার কেমন চেনা চেনা মনে হল।
অবশ্যই তিনি নিজেই আগবাড়িয়ে নমস্কার করে পরিচয় দিলেন, স্যার, চিনতে পারছেন? আমি আপনার পটললাল।
পটললালকে দেখে আমি শুধু একটু অবাক হলাম বটে তবে অনুমান করতে পারলাম যে নিশ্চয় সিনেমার কোনও ব্যাপার, তাই মণিগোপাল পটললালকে সংগ্রহ করেছে।
পটললালকে যারা জানেন তাদের কাছে পটলবাবু বিষয়ে কিছু বলতে যাওয়া অবান্তর হবে। পটললাল একজন গুণী ব্যক্তি, যাত্রা-থিয়েটার-সিনেমা লাইনে এমন অভিজ্ঞ লোক খুব বেশি পাওয়া যায় না।
সুতরাং মণিগোপাল যে পটললালকে তার কাজের জন্য নিয়েছে সেটা ভাল বুঝেই করেছে। আর, এই চিত্রতারকা মানসী দত্ত, তিনিও হয়তো মণির কাজে লাগছেন। পটললাল এবং চিত্রতারকার সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষ হওয়ার পরে মণিলাল বলল, আমি তো সিনেমা করি সে তো আপনি জানেন। ঢাকায় আমার ব্যবসা ভালই চলছে। এখন ভাবছি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে একটা বই করব।
আমি বললাম, কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কী করার থাকতে পারে?
মণি কিছু বলার আগেই পটললাল বলল, আপনি স্যার শাহেনশা আদমি; আপনি সব কিছু করতে পারেন।
মণি বলল, পটলবাবুকে আমার সহকারী হিসেবে আমি নিয়েছি। এরপর একটু চুপ করে থেকে বলল, বাবার মৃত্যুর পর এখানে তো আমার কোনও অভিভাবক নেই, কলকাতায় এলে আপনিই আমার অভিভাবক। তাই অনেক ভরসা করেই আপনার কাছে এসেছি।
কীসের ভরসা, কী ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারলাম না। ইতিমধ্যে শ্রীমতী দত্ত, যিনি আমার সোফার একপাশে বসেছিলেন, তিনি ঘেঁষতে ঘেঁষতে একেবারে আমার ঘাড়ে এসে পড়েছেন। তাঁর সালোয়ার কামিজের দোপাট্টা কণ্ঠচ্যুত এবং বক্ষভ্রষ্ট হয়ে তাঁর কোলের ওপরে এসে পড়েছে। মনে হল তিনি যথেষ্ট মদ্যপান করে এসেছেন। এই রকম বিব্রত অবস্থায় আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মণিগোপালের দিকে তাকালে সে পটললালকে ইশারা করল। পটললাল মহিলাকে রীতিমতো টেনে সোফার অন্যপ্রান্তে যতটা সম্ভব সরিয়ে তারপর একবার গলাখাঁকারি দিয়ে ক্রিকেটার আজ্জর মতো। শার্টের কলারটা একটু ওপর দিকে তুলে দিয়ে তিনি বললেন, মনুভাইয়ের জগু সরাইওয়ালার সঙ্গে মণিবাবুর নতুন বই হচ্ছে। অর্ধেক কাজ হবে বাংলাদেশে, বাকি অর্ধেক কলকাতায়।
আমি বললাম, সরাইওয়ালা নামটা আমার তেমন ভাল লাগছে না। পটললাল এ কথায় কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, তাকে থামিয়ে দিয়ে মণিগোপাল বলল, এ নিয়ে আপনি ভাবতে যাবেন না, তা ছাড়া সরাইওয়ালা ঢাকায় ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা করে, ওর টুঁটি আমার কাছে বাঁধা।
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু তোমাদের এই ছবির ব্যাপারে আমাকে কী করতে হবে? এসব ব্যাপারে আমার তো কোনও অভিজ্ঞতা নেই।
উত্তর পেলাম পটললালের কাছ থেকে, সিনেমার লাইনে কোনও অভিজ্ঞতা লাগে না। তা ছাড়া আপনি হলেন প্রধান উপদেষ্টা, আপনার অভিজ্ঞতার কী দরকার? নামটাই যথেষ্ট।
আমাকে আর কথা বলতে না দিয়ে পটলবাবু বললেন, আমাদের বইয়ের নাম শুনলেই বুঝতে পারবেন কীরকম নামের বই।
নামের কথায় আমি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, নাম? নামে কী সুবিধে? কী নাম?
এবার এই মদালসা চিত্রতারকা জড়ানো গলায় বললেন, চারশো, চারশো বিশ।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এ নিয়ে তো পুরনো আমলের রাজকাপুরের বই আছে, চারশো বিশ। মণি সঙ্গিনীর কথায় একটু বিরক্ত হয়েছিল, সে বুঝিয়ে বলল, রাজকাপুরের আর কে ফিল্মসের বইটার নাম চারশো বিশ নয়, নাম ছিল শ্রীচারশো বিশ, শ্রী ফোর টোয়েন্টি।
আমি আশ্বস্ত হলাম, তবু মনে আরেকটা খটকা ছিল সেটা বললাম, চারশো বিশ হল ফৌজদারি আইনের একটা ধারা, পটলবাবু তো জানেন চিটিং কেসের ধারা, বাংলাদেশে এ ধারা চালু আছে তো?
