কিন্তু তার মানে যে নগদ টাকা নয়, মিস জুলেখা তাঁকে দু মাস উইংস থেকে তার নাচ উপভোগ করতে দেবেন সেটা সহদেব ডাক্তার ভাবেননি। সহদেব ডাক্তারের যে খুব ক্ষতি হয়েছে তা কিন্তু মনে হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত একটি শো-ও তিনি বাদ দেননি। প্রতি সন্ধ্যায় জুলেখার মোহময়ী নৃত্যে তিনি মশগুল।
.
পুনশ্চ:
এই রসরহস্য কাহিনির নায়িকা মিস জুলেখা ওরফে শ্রীমতী লেখা ভট্টাচার্যের (তিন) ছেলেমেয়ে। কিন্তু কাহিনিটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে রচিত বলে ওই তিন বালক-বালিকাকে কাহিনির বাইরে রেখেছি।
পটললাল, চলচ্চিত্র ও লেখক
০১. প্রস্তাবনা
বৎসরান্তে লেখক অন্তত একবার শ্রীযুক্ত পটললালের খোঁজখবর করেন। এমনিতে পটললালের সঙ্গে লেখকের যে খুব একটা সাক্ষাৎ পরিচয় আছে, তা নয়।
তবে পটললাল করিৎকর্মা লোক। অনেক রকম ব্যাপারের মধ্য দিয়ে তার যাতায়াত। নতুন কোনও বিচিত্র ঘটনা থাকলে, এর-ওর কাছ থেকে শুনে পটললালকে নিয়ে একটি গল্প পুজোর সময় লেখককে লিখতে হয়। এটা এখন বাঁধা ব্যাপার হয়ে গেছে।
কোনও কোনও বছর গল্প সংগ্রহ করতে বেশ কষ্ট করতে হয়। এ বছর কিন্তু খুব একটা চেষ্টা বা পরিশ্রম করতে হল না পটললাল কাহিনি সংগ্রহ করতে। গল্পটা লেখকের কাছে পায়ে হেঁটে চলে এসেছে। আসলে হয়েছে কী পটললালের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে লেখকের।
এতে ভাল হয়েছে কি খারাপ হয়েছে, এরপর পটললালের গল্পগুলো আর জমবে কি না বলা কঠিন। সত্য ঘটনা অবলম্বনে, আর যাই হোক, গল্প হয় না। ঘটনার সঙ্গে কল্পনার মিশেল না দিলে গল্প দাঁড়ায় না।
দেখি কী হয়?
০২. পূর্বকথা
বহুকাল আগে, সে প্রায় পঞ্চাশ বছর, উনিশশো একান্ন সাল সেটা, লেখক পূর্ববঙ্গ অধুনা বাংলাদেশের এক ছোট শহরের হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় আসেন।
এই স্কুলে লেখকের সহপাঠী ছিলেন ব্রজদুলাল সাহা। পাটের আড়তদার এবং বিখ্যাত গুড় ব্যবসায়ী নবদুলাল সাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্রজ।
ব্রজ আর লেখক একই সঙ্গে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন, দুঃখের বিষয় লেখক কষ্টেসৃষ্টে, কোনওমতে পাশ করলেও ব্রজ পাশ করতে পারেনি। এরপরেও আরও দু-তিনবার পরীক্ষায় বসে। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রজদুলাল পাশ করতে পেরেছিল কি না সেটা লেখকের মনে পড়ছে না।
ব্রজ পূর্ব পাকিস্তানেই ব্যবসাপাতি নিয়ে থেকে যায়। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়ও ব্রজ মাটি আঁকড়িয়ে পড়ে থাকে, সহস্র বিপদের ঝুঁকি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে নিতান্ত প্রাণরক্ষার তাগিদে ব্রজগোপালকে ধর্মান্তরিত হতে হয়। তখন তার নতুন নাম হয় বেজু মিঞা।
ব্রজগোপাল সাহা ওরফে বেজু মিঞা স্বাধীনতার স্বাদ অবশ্য বেশিদিন উপভোগ করতে পারেননি। যুদ্ধকালীন প্রচণ্ড উত্তেজনা এবং দুর্ভাবনা তাঁর প্রাণশক্তি ফুরিয়ে দিয়েছিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকমাস পরেই তিনি মারা যান।
মৃত্যুর সময়ে ব্রজগোপালের বয়েস হয়েছিল বড়জোর চল্লিশ। মৃত্যুকালে ব্রজগোপাল স্ত্রী ও দুটি ছেলে রেখে যান। একটি মেয়েও ছিল, একাত্তর সালের আগেই সতেরো বছর বয়েসি মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়েকে আর পিত্রালয়ে থাকতে দেওয়া হয়নি, কারণ তার বাপ ধর্মান্তরিত হয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর সময়ে ব্রজগোপালের জ্যেষ্ঠ পুত্র মণিগোপালের বয়স কুড়ি বছর। সামাজিক প্রথা মেনে ওই বয়েসেই তারও বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তা, মণিগোপালও বাংলাদেশে থেকে গিয়েছিল। তবে বাবার মৃত্যুর পরে সে খুব বেশিদিন পারিবারিক ব্যবসা করেনি। পাটের ব্যবসায় এমনিতেই মন্দ যাচ্ছিল, গুড়ের আড়ত মোটামুটি চলছিল। সে দুটোকেই তুলে দেয়, ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করে এবং সেখানেই নতুন ব্যবসা আরম্ভ করে।
খুবই গোলমেলে ব্যবসা।
বাইরে একটা লোকদেখানো পাইকারি ব্যবসার গদি থাকলেও মণিগোপালের মূল ব্যবসা হুন্ডি হাওলা এবং চোরাচালানের। ক্রমশ মণিগোপাল প্রচুর অর্থ উপার্জন করে এবং সিনেমার লাইনে চলে যায়।
সিনেমার লাইন মানে মণিগোপাল চলচ্চিত্র ব্যবসায় টাকা ঢালতে থাকে এবং সে একাধারে প্রযোজক এবং পরিচালক হিসেবে কাজ করতে থাকে। অচিরে ঢাকার সিনেমা মহলে সে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রের কাজ করার সময় তাকে অনবরত কলকাতায় যাতায়াত করতে হয়। অবশ্য তাতে তার কোনও অসুবিধে হয়নি। যেকোনও সফল দু নম্বরি ব্যবসায়ীর মতো তার দুটি পাসপোর্ট, একটি মণি সাহা নামে অন্যটি মণি শেখ নামে।
কলকাতায় এলে শ্রীমান মণিগোপাল পিতৃবন্ধু হিসেবে আমার সঙ্গে দেখা করত। খালি হাতে আসত না, কখনও ঢাকার কালাচাঁদের সন্দেশ, কখনও পোড়াবাড়ির চমচম, কখনও একজোড়া ইলিশ মাছ, সে আমার জন্যে নিয়ে আসত।
মণিগোপাল কলকাতায় এখন-আর-তেমন-যুবতী-নন এরকম এক চিত্রতারকার পাল্লায় পড়েছিল। পরস্পর শুনেছি, ঢাকা শহরেও অনুরূপ দোষের জন্য তার খ্যাতি আছে।
সে যাই হোক, বন্ধুপুত্রের এসব ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা গলানোর লোক আমি নই। তা ছাড়া ইতিমধ্যে মণিগোপাল সাহা একজন বিখ্যাত মানুষ হয়ে গেছে।
মণিগোপাল পরিচালিত দুটি চলচ্চিত্র বাংলাদেশি সিনেমায় টিকিট বিক্রির সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
