চেহারা, জামাকাপড় ইত্যাদি দেখে এবং পটললালের ওই তো, ওই তো শুনে সহদেববাবুর কী মনে হওয়াতে তিনি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি থিয়েটার রোডের মোড়ের ফ্ল্যাট বাড়িটার কেয়ারটেকার?
লোকটি খুবই ভিতু প্রকৃতির, সামনের একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে বলল, হ্যাঁ। আমার নাম নিতাই সামন্ত, আমি ওই বাড়ির কেয়ারটেকার, সতেরো তলার চিলেকোঠায় থাকি।
গোয়েন্দা উপপ্রধান বিস্মিত হয়ে ব্যাপার কী ঘটে লক্ষ করতে লাগলেন।
সহদেববাবু নিতাই সামন্তকে জিজ্ঞাসা করলেন, কাটারিটা আপনিই ওকে দিয়েছিলেন?
নিতাই বলল, হ্যাঁ।
সহদেববাবু বললেন, তা হলে পুলিশ যখন ওকে গ্রেপ্তার করল আপনি একটু এগিয়ে এসে সব কথা বললে এই লোকটির বিনা দোষে এতটা হেনস্থা হত না।
নিতাই বলল, আমি ছিলাম বাথরুমে। তা ছাড়া সতেরো তলায় যে নীচের কোনও শব্দ পৌঁছায়। না। তা ছাড়া লোডশেডিংয়ে লিফটও বন্ধ, ওঠানামা নেই। অনেক পরে যখন ঘটনাটা শুনলাম তখন পুলিশ ওকে নিয়ে চলে এসেছে।
সহদেববাবু বললেন, তখন পুলিশের কাছে চলে গেলেন না কেন?
নিতাই বলল, পুলিশকে বড় ভয় পাই। বিশেষ করে থানায় ঢুকতে বুক দুরদুর করে। পরে যখন শুনলাম এখানে নিয়ে এসেছে, বিবেকের দংশনে ভয়ে ভয়ে চলে এলাম। তাও ভেতরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছিলাম না।
সহদেববাবু বললেন, সে তো দেখলাম।
.
গোয়েন্দা উপপ্রধানকে সকালবেলার পুরো ঘটনাটা গুছিয়ে বলতেই তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। কাটারিটা বাজেয়াপ্ত করে পটললালকে তিনি ছেড়ে দিলেন।
পটললালকে নিয়ে আবার ট্যাকসি করে এবার সরাসরি মিস জুলেখার মৌলালির আস্তানায় রওনা হলেন সহদেববাবু।
ট্যাকসিতে যেতে যেতে পটললাল তার বিড়ম্বিত জীবনের কথা সহদেববাবুকে বললেন। সব কথা লিখে লাভ নেই, এই কাহিনিতে তার প্রয়োজনও নেই। গত পরশু দিন সন্ধ্যার পর থেকে ঘটনাবলি হলেই চলবে।
সেদিন মিস জুলেখা থিয়েটার হলে চলে যাওয়ার পর তিনজন শক্তিশালী অনুগ্রাহককে নিয়ে এসে রেশমকুমারী জুলেখার বাড়িতে হামলা চালায়। তখন বীণাপাণি একাই ছিল বাড়িতে। তাকে ভয় দেখিয়ে জেনে নেয় পটললাল কোথায়।
কিন্তু শুধু পটললালকে উদ্ধার করাই রেশমকুমারীর উদ্দেশ্য ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন মিস জুলেখাকেও শিক্ষা দিতে যাতে পটললালের ওপর স্বত্ব মিস জুলেখা ছেড়ে দেয়।
বীণাপাণি যাতে চেঁচামেচি করতে না পারে সেই জন্যে ঠিক হল তাকেও পটললালের ঘরে শিকল দিয়ে রাখা হবে। কিন্তু বীণাপাণি এতে কাদাকাটি করতে থাকে, বলতে থাকে, জামাইবাবুর সঙ্গে আমাকে একই ঘরে আটকিয়ে রেখো না। আমি তাহলে আর লোকজনকে মুখ দেখাতে পারব না।
বীণাপাণির বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট যুক্তি ছিল। তখন রেশমকুমারী সিদ্ধান্ত নিলেন বীণাপাণির সঙ্গে তিনিও ওই ঘরে পটললালের সঙ্গে থাকবেন। বাইরে থেকে শিকল তুলে দিলে আর বোঝা যাবে না ভেতরে পটললাল ছাড়াও অন্যেরা রয়েছে।
থিয়েটার থেকে ফিরে কোনওদিনই মিস জুলেখা বীণাপাণির খোঁজ করেন না। বাইরে থেকেই খেয়ে আসেন, বাড়ি ফিরে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়েন।
রেশমকুমারীর হিসেবমতো আজও ঠিক তাই হয়েছিল। তা ছাড়া মিস জুলেখা শুয়ে পড়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়েন।
কিন্তু গলদ হয়েছিল অন্য জায়গায়। যে লোকটিকে রেশমকুমারী মিস জুলেখা ঘুমিয়ে পড়লে বক্সরুমের শিকল খুলে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে নামকরা গুণ্ডা হলেও সাংঘাতিক ঘুমকাতুরে। মিস জুলেখা ঘুমিয়ে পড়ার আগেই সে নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে, ফলে দরজা খোলা হয় না।
তখন বাধ্য হয়ে রেশমকুমারীকে খুটখাট শব্দ করতে হয়, ওইটুকু বদ্ধ ঘরে, গরমে, গুমোটে তিনজনের দমবন্ধ হয়ে আসছিল।
এর পরের ঘটনা তো আগেই বলেছি।
পটললালের কাহিনি শুনতে শুনতে ট্যাকসি মিস জুলেখার বাড়িতে পৌঁছে গেল। শুধু আরেকটা প্রশ্ন ছিল সহদেববাবুর, ডাবওয়ালা হতে গেলেন কেন?
পটললাল বললেন, জুলেখার বাড়ি থেকে দৌড়ে পালানোর সময় আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, বললাম, জুলেখা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। এভাবে তাকে ফেলে যেতে পারব না। সঙ্গে সঙ্গে রেশম আমাকে লাথি মারে, আমি মুখ থুবড়ে পড়ে যাই। রেশমের লোকেরা আমাকে পাঁজাকোলা করে গাড়িতে তুলে রেশমের বাড়িতে নিয়ে আসে। পরদিন দুপুরে রেশম যখন রিহার্সাল দিতে যায় আমিও পালাই। তারপরে সেকরার দোকানে গিয়ে বলি, নাকছাবি লাগবে না, আমার অগ্রিম দুশো টাকা ফেরত দিন। লোকটা একটু গাঁইগুঁই করে শেষে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিল। সেই টাকা নিয়ে ভাবলাম নিজের পায়ে পঁড়াব, থিয়েটার রোডের মোড়ে ডাবের ব্যাপারির কারবারটা কিনে নিলাম। তার পরে তো আপনি জানেন।
মিস জুলেখা পটললালকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। শুধু একটাই প্রশ্ন, পটললাল আবার পালাবে না তো? সহদেব বললেন, পালালেও রেশমকুমারীর কাছে আর যাবে বলে মনে হয় না। এমনকী ওর নাকছাবির বায়নার টাকাও ফেরত নিয়ে এসেছে।
আপাতত এতেই সন্তুষ্ট মিস জুলেখা। পটললালকে নিয়ে তিনি নৈশভোজ করতে পার্ক স্ট্রিটের দিকে রওনা হলেন। ডাক্তার সহদেব শুককেও সঙ্গ দিতে বললেন। সহদেববাবু বাইরে খান না। স্বপাক খান। তাই গেলেন না।
এই মিলনান্ত কাহিনির অবশেষে একটা ছোট দুঃখের ব্যাপার আছে।
ডাক্তার সহদেব শুক ভেবেছিলেন মিস জুলেখা তাঁকে ফি দেবেন তার দু মাসের নাচের মজুরি, দশ হাজার টাকা। মিস জুলেখা তো স্পষ্টই বলেছিলেন, আমার দু মাসের নাচ।
