বাইরের ঘরে পাখার নীচে বসে একটা আলগা তন্দ্রায় চোখ জড়িয়ে এসেছিল ডাক্তার সহদেব শুকের, সেই তন্দ্রার ঘোরে আবছায়া স্বপ্নে দেখলেন কালকের মঞ্চের সেই নীল ওড়নাটা একটা ফুলের মালার মতো গলায় জড়িয়ে মিস জুলেখা তার কাছে এসে তার গলায় সেই নীল ওড়নার মালাটা পরিয়ে দিয়ে বলছেন, তুমিই আমার পটললাল।
তাড়াতাড়ি সুখস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠে সহদেববাবু ভাবলেন, দেরি হয়ে গেল। কিন্তু দেয়ালঘড়িতে তাকিয়ে দেখলেন তখনও ছটা বাজতে পাঁচ সাত মিনিট বাকি। বাথরুমে গিয়ে মুখে চোখে জল দিয়ে বাইরের ঘরে ফিরে এসে আবার বসলেন তিনি। একটু আগের স্বপ্নের আমেজটা তখনও তাকে জড়িয়ে রয়েছে। নীল ওড়না কী করে ফুলের মালা হয়ে গেল সেই কথা ভাবতে লাগলেন সহদেববাবু।
অথচ তার এখন ভাবার কথা পটললালের অন্তর্ধান নিয়ে, রহস্যজনকভাবে পটললালের গায়েব অথবা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া নিয়ে।
দুঃখের বিষয় পটললাল বিষয়ে কিছুই ভাবতে পারছেন না গোয়েন্দাপ্রবর সহদেব শুক। পটললালের কথা ভাবার আগেই মিস জুলেখার লাস্যময়ী নৃত্যদৃশ্য ফিরে আসছে তার অক্ষিপটে। তার সব ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে নীল ওড়নার ছায়ায়।
কিন্তু পটললালের ব্যাপারটা নিয়েই তো ভাবতে হবে। মিস জুলেখা সহদেববাবু গেলে পরেই জানতে চাইবেন, কতদূর কী করলেন? আমার পটললাল, প্রাণের পটললাল কোথায়?
যা হোক, কোনওভাবে সোয়া ছটা বাজল। বাইরে রোদ মিলিয়ে এসেছে। সুসজ্জিত সহদেব শুক বাড়ি থেকে বেরোলেন। মোড়ে গিয়ে ট্রামে উঠে মৌলালিতে নামলেই মিস জুলেখার ঠিকানায় পৌঁছে যাবেন।
কিন্তু সহদেববাবু আর দেরি করতে পারছেন না। তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েই সামনে একটা ট্যাকসি পেয়ে সেটাতেই উঠে বসলেন।
ট্যাকসিটা মল্লিকবাজার আর পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে ট্রাফিক পয়েন্টে অনেকক্ষণ আটকিয়ে গেল। মোড়ের মুখে একটি অল্পবয়েসি ছেলে দৈনিক পত্রিকার সান্ধ্য বিক্রি করছিল। মাত্র পঞ্চাশ পয়সা দাম। আর এই সান্ধ্য সংস্করণে অনেক রকম রোমাঞ্চকর খবর থাকে যা সকালের কাগজে সাধারণত পাওয়া যায় না।
এক কপি কাগজ ট্যাকসির জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সহদেববাবু কিনলেন।
এবং তারপরেই সহদেববাবুর চমকিত হওয়ার পালা।
একেবারে প্রথম পাতায় কাটারি হাতে সকালবেলার ডাবওয়ালার ছবি ছাপা হয়েছে এবং তার পাশে সংবাদ, সেই সংবাদের হেডলাইন হল, ডাকাতির দায়ে ক্যাবারে নর্তকীর স্বামী গ্রেপ্তার। সংবাদের মধ্যে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ছাপা হয়েছে।…জেরার মুখে পুলিশের কাছে আসামি কবুল করেছে যে তার নাম হল পটললাল, সে বিখ্যাত ক্যাবারে নাচিয়ে মিস জুলেখার বর্তমান স্বামী।
…আজ সকালে একটি বহুতল বাড়ির লিফটের মধ্যে মারাত্মক কাটারি হাতে একটি নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্যে পুলিশ প্রচণ্ড তৎপরতার সঙ্গে তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় থানা থেকে। দুপুরবেলা তাকে গোয়েন্দা দপ্তরে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে গোয়েন্দা দপ্তরের উপপ্রধান স্বয়ং তাকে জেরা করছেন।
..দুপুরবেলাতেই আসামিকে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পটললালের হয়ে কেউ জামিনের আবেদন করেনি। বিচারক তাকে সাতদিন পুলিশি হাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
…আবার গোয়েন্দা দপ্তরে নিয়ে এসে তার জেরা চলছে। কিন্তু পটললাল এখনও স্বীকার করেনি যে সে ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে ওই বহুতল বাড়িতে প্রবেশ করেছিল। তার হাতে কাটারি কেন ছিল সেই প্রশ্নের উত্তরে পটললাল প্রতিবারই বলছে যে ওই কাটারি ডাকাতির জন্যে নয়, ডাবকাটার জন্যে সে আনছিল। পুলিশ অবশ্য এই আজগুবি কথা বিশ্বাস করেনি।
এই সংবাদ পাঠ করতে সহদেববাবুর এক মিনিটও লাগেনি।
ততক্ষণে ট্রাফিক খুলে গেছে, ট্যাকসি লোয়ার সার্কুলার রোড ধরে মল্লিকবাজার পেরিয়ে গেছে।
সংবাদটি পাঠ করে রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন সহদেববাবু। কীসে কী হয়, কীসে কী মিলে যায়।
আশ্চর্য, পটললালকে এত সহজে পেয়ে যাবেন সেটা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি সহদেব গোয়েন্দা।
কিন্তু এখন নিরীহ পটললালকে উদ্ধার করতে হবে। বলতে গেলে পটললালের বর্তমান হেনস্থার জন্যে সহদেববাবু নিজেও অনেকটা দায়ী। তিনি কাটারির অনুসন্ধান না দিলে পটললাল কাটারির অস্তিত্ব জানতেই পারত না, এইরকম গোলমালেও পড়ত না।
তাড়াতাড়ি ট্যাকসি ঘুরিয়ে সহদেববাবু গোয়েন্দা দপ্তরে চলে গেলেন। সেখানে পুলিশের গোয়েন্দা উপপ্রধান তখনও পটললালের জেরা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পটললালকে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পারলেন সহদেববাবু। সেই কালো ফুলপ্যান্ট, লাল স্পোর্টস গেঞ্জি, সকালের সেই চৌরঙ্গি মোড়ের ডাবওয়ালা।
সহদেববাবুকে দেখে গোয়েন্দা উপপ্রধান জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? মিস জুলেখার স্বামী রত্নটিকে দেখছেন? আপনি উদ্ধার করার আগেই আমরা ওকে গ্রেপ্তার করেছি। একেবারে সাক্ষাৎ ডাকাত।
এবার সহদেববাবু বললেন, এ লোকটা কিন্তু ডাকাত নয়। পুরো ব্যাপারটার আমি সাক্ষী।
সহদেববাবুর কথায় মনে জোর পেয়ে হঠাৎ বারান্দার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে পটললাল বললেন, ওই তো। ওই তো।
দেখা গেল বারান্দায় একটি বেঁটে মতন লোক, মাথায় টাক, পরনে পাজামা, ফুলশার্ট, হাওয়াই চপ্পল ঘুরঘুর করছে। তাকে ভেতরে ডেকে আনা হল।
