একশো টাকার নোট দুটো ফেলে আসেননি মিস জুলেখা। ড্রপসিন পড়ার পর ওই নোটদুটো নিজেই কুড়িয়ে আনেন এবং তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে রাখেন।
রাতে আর খেয়াল ছিল না। শোয়ার ঘরের টেবিলের ওপরে ভ্যানিটি ব্যাগটা ফেলে রেখে ক্লান্ত দেহে শুয়ে পড়েছিলেন। বিছানার অন্য প্রান্তে পটললাল আগে থেকেই নিদ্রামগ্ন ছিলেন।
অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে মিস জুলেখা দেখলেন পটললাল বাড়িতে নেই। বীণাপাণি নামে তাঁর কাজের লোককে জিজ্ঞাসা করতে সে বলল, জামাইবাবু একটু আগে বেরিয়েছে।
পটললালের যে কিঞ্চিৎ হাতটানের স্বভাব আছে সেটা বহুকাল ধরেই মিস জুলেখার বিলক্ষণ জানা। চট করে তার মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের সেই দুটো একশো টাকার নোটের কথা।
যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। একশো টাকার নোট দুটো ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে উধাও, সেই সঙ্গে পটললালও উধাও হয়েছেন।
সাধারণত, এরকম ক্ষেত্রে দুয়েকদিন বাদে পটললাল ফিরে আসেন। কিন্তু এদিন বিকেলেই পটললাল ফিরলেন। সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল পটললালের পাঞ্জাবির কলার চেপে বলশালিনী মিস জুলেখা তার সবকয়টি পকেট সার্চ করলেন।
বুক পকেট থেকে বেরোল সেকরার দোকানের একটা রসিদ, শ্রীলক্ষ্মী জুয়েলারি ওয়ার্কস, প্রোঃ হারাধন রায়। রসিদটা পটললাল পালেরই নামে, লেখা আছে লাল পাথর বসানো নাকছাবি বাবদ অগ্রিম দুশো টাকা।
রসিদটা দেখামাত্র মিস জুলেখার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। নাকছাবির অগ্রিম রসিদ দেখেই বুঝতে পারলেন এটা সেই শয়তানি রেশমকুমারীর জন্যে বায়না দেওয়া হয়েছে। একদা রেশমকুমারীর নাকছাবি চুরি করে পটললাল পালিয়েছিলেন। এখন সেই নাকছাবি উপহার দিয়েই আবার ঘনিষ্ঠতা শুরু হচ্ছে।
রেশমকুমারীর মতো কথায় কথায় জুতো চলে না মিস জুলেখার। তবে হাত ভালই চলে। গোটা কয়েক থাবড়া মেরে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে শোবার ঘরের পাশে বক্সরুমে পটললালকে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিলেন। থাকুক এই গরমে একটা রাত এই অন্ধকূপে বন্দি। এতে যদি বিশ্বাসঘাতকের কিছু শিক্ষা হয়।
.
পটললালকে বক্সরুমে আটকিয়ে রেখে মিস জুলেখা নাচতে চলে গেলেন।
ফিরে এলেন রাত দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ। পটললালের অধঃপতনে মর্মাহত হয়ে আজ বহুদিন পরে তিনি এক বোতল দিশি মদ টেনেছেন। আজ দিল মহম্মদ বা অন্য কাউকে তার কোমরের মাদুলি নিয়ে গোছগাছ করতে বাধা দেননি।
মিস জুলেখা বাড়ি ফিরলেন রীতিমতো স্খলিত চরণে। প্রায় টলতে টলতে। তখনও বক্সরুমের বাইরের শেকলটা আটকানো।
ক্লান্ত দেহে বিছানায় শুয়ে মিস জুলেখা অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে বক্সরুমের মধ্যে নানারকম খুটখাট শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি বুঝলেন পটললাল বন্ধ ঘরের মধ্যে চলাফেরা করছে। জানলাহীন বন্ধ ঘরে এই গুমোটে হয়তো পটললালের দম আটকিয়ে আসছে।
পটললালের ওপর এতক্ষণে একটু মায়া হল মিস জুলেখার। তিনি উঠে গিয়ে অন্ধকারে হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে বক্সরুমের দরজাটার শিকলটা খুলে দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে একটা অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল। ঘরের মধ্যে থেকে চকিতে যিনি বেরিয়ে এলেন তিনি কিন্তু মোটেই পটললাল নন। সালোয়ার কামিজ পরিহিতা এক দশাসই মহিলা বেরলেন ঘর থেকে। কিঞ্চিৎ মত্ত হলেও শ্রীমতী জুলেখার জ্ঞান বেশ টনটনে থাকে, তিনি তাড়াতাড়ি দরজার পাশে দেয়ালে আলোর সুইচটা জ্বালিয়ে দিলেন।
আলো জ্বলতে মিস জুলেখা দেখতে পেলেন যে মহিলাটি আর কেউ নন যাত্ৰাসুন্দরী রেশমকুমারী। মুহূর্তের মধ্যে একটি সবল বাহুর চড়ে মেঝের ওপরে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন মিস জুলেখা। পড়ার মুহূর্তে দেখলেন রেশমকুমারীর পিছু পিছু প্রথমে পটললাল এবং তার পিছে কাজের মেয়ে বীণাপাণি বেরোল।
মনে হল বাইরে বারান্দায় আরও দুয়েকজন লোক রয়েছে। রেশমকুমারী পটললালের হাত ধরে দৌড়ে গেলেন। সিঁড়িতে বেশ কয়েক জোড়া ছুটে যাওয়া পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন মিস জুলেখা। তার মুখেচোখে জল দিয়ে জ্ঞান ফেরাতে বীণাপাণির পনেরো মিনিট লাগল। জ্ঞান ফিরে এলে বীণাপাণির মুখে শুনলেন যে রাত আটটা নাগাদ কয়েকজন ষণ্ডামার্কা লোক নিয়ে রেশমকুমারী এসে বীণাপাণিকে ভয় দেখিয়ে জেনে নেন পটললাল কোথায়। তারপর বীণাপাণিকে নিয়ে তিনি ওই বন্ধ ঘরে ঢুকে যান এবং পটললালকে বলেন, আজ জুলেখাকে শিক্ষা দেব আর বীণাপাণিকে বলেন, একদম চুপ করে থাক।
.
মিস জুলেখা থাকেন মৌলালির কাছে একটা পুরনো গলিতে। জায়গাটা কড়েয়া রোড থেকে তেমন দূরে নয়। এক ট্রামেই যাওয়া যায়।
আজ মিস জুলেখার শো নেই। আজ তাঁর নাটকের অফ ডে। এসব দিনে অনেক সময় তিনি সন্ধ্যার দিকে কোন বারে গিয়ে এক্সট্রা নাচিয়ে হিসেবে কিছু উপরি উপার্জন করেন। কিন্তু স্বামী পটললালের শোকে তিনি ক্রমশ উথালপাতাল হয়ে উঠেছেন। উপরি রোজগারে তার রুচি নেই। তিনি প্রায় শয্যাশায়িনী হয়ে রয়েছেন।
মিস জুলেখার ওখানে সন্ধ্যার দিকে যাওয়ার কথা ডাক্তার সহদেব শুকের। কিন্তু তার আর তর সইছে না। গরমের দিনের দীর্ঘ বিকেল, দিনের আর অন্ত নেই। সাতটার আগে সন্ধ্যা হবে না।
বহুদিন ধুতি পাঞ্জাবি পরেননি সহদেববাবু। আজ বিকেল পাঁচটা থেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরে বসে আছেন আর গরমে গলগল করে ঘামছেন।
