দর্শকরা অনেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ পয়সা ছুঁড়তে লাগল, শিস দিতে লাগল। কদম ফুল দুটি মঞ্চের ওপর থেকে মিস জুলেখা পদাঘাতে হলের দিকে বল কিক করার মতো করে পাঠিয়ে দিলেন। সেই কদম ফুল কুড়িয়ে নেওয়ার জন্যে হলের ভেতরে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। ড্রপসিন নেমে এল সেই মুহূর্তে।
বদন মণ্ডলে, সুডৌল বাহুতে এবং শরীরে সর্বত্র স্বেদবিন্দু, উত্তেজনায় ও পরিশ্রমে ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে, নাক ফুলে ফুলে উঠছে, মিস জুলেখা উইংস দিয়ে বেরোনোর পথে সহদেববাবুর বাহু আকর্ষণ করে পাশের একটা ছোট ঘরে প্রবেশ করলেন।
সহদেববাবুর বুকের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগল, তিনি জীবনে এমন অবস্থার সম্মুখীন এর আগে কখনও হননি।
কিন্তু তেমন গুরুতর কিছু ঘটল না। মিস জুলেখা একটু দম নিয়ে তারপর চোখেমুখে একটা মোহময়ী ভাব এনে মদির দৃষ্টি মেলে সহদেববাবুকে বললেন, নাচ কেমন দেখলেন?
তারপর সহদেববাবুর থতমত খাওয়ার অবস্থা দেখে বললেন, আসলে জানেন এই নাটকের স্টোরিটা খুব প্যাথেটিক, নাচটা হল একটা কলেজে পড়া ভদ্রঘরের মেয়ের, সে এম এ পরীক্ষার ফি দিতে পারছে না, সেই টাকা জোগাড় করার জন্যে হোটেলে নাচছে।
ইতিমধ্যে মিস জুলেখার নির্দেশানুসারে দুটো কোল্ড ড্রিঙ্ক এসেছে, সত্যিই কোল্ড, বেশ ঠান্ডা।
সেই ঠান্ডা পানীয় ঔ দিয়ে ঢকঢক করে খেতে খেতে মিস জুলেখা বললেন, আমার পরের নাচ আধঘণ্টা পরে। সে নাচটাও খুব দুঃখের। মেয়েটা পরীক্ষা ভালই দিয়েছে, কিন্তু পরীক্ষার খাতা যে লোকটা দেখছে সে লোকটা শালা এক নম্বরের লম্পট। সে বলেছে আমাকে ড্যান্স দেখাতে হবে না হলে আমি তোমাকে পাশ করাব না। বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে মেয়েটা ড্যান্স করছে।
এতক্ষণ সহদেববাবু কোনও কথা বলেননি। এবার বললেন, তাই নাকি?
মিস জুলেখা বললেন, যাক এসব কথা। এবার পটলের ব্যাপারটা বলি।
মিস জুলেখার কাছ থেকে যতটুকু জানা গেল তা হল এই রকম।
পটল অর্থাৎ পটললাল পালকে মিস জুলেখা অনেকদিন ধরেই চেনেন। তাঁর পূর্বতন স্বামী আগরওয়ালার সঙ্গে পরিচয় ও ধর্মান্তরিত করে বিয়ে দেওয়া দুটোতেই পটললালের মুখ্য ভূমিকা ছিল, সে ছিল আগরওয়ালার গোপন কাজের সহায়ক।
যদিও পটললাল বয়েসে অনেক ছোট, আগরওয়ালার মৃত্যুর পর পটলকেই বিয়ে করেন মিস জুলেখা। কিন্তু তখন তিনি জানতেন না যে পটললাল কপর্দকশূন্য।
তা হোক, পটললালকে তিনি ছাড়তে চান না। বিয়ে করে করে তিনি হদ্দ হয়ে গেছেন। পটললালের খরচ খরচা সবই তিনি চালাবেন। কালীঘাটের মা কালীর কাছে প্রার্থনা করে মাদুলি নিয়ে এসেছেন যাতে তাকে এরপরে আর বিয়ে করতে না হয়।
এই পর্যন্ত বলে মিস জুলেখা কোমরের মাদুলিটা হাত দিয়ে দেখালেন, সহদেববাবু বললেন, থাক, থাক।
এবার মিস জুলেখা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, পটল, আমার পটললাল চুরি হয়ে গেল।
সহদেববাবু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, চুরি হয়ে গেল? চুরি হয়ে গেল মানে কী? একটা সদ্য মানুষ, আস্ত মানুষ চুরি হয়ে যায় কী করে?
চোখের জল, স্টেজ থেকে কুড়িয়ে আনা সেই নীল ওড়নাটা দিয়ে মুছে মিস জুলেখা বললেন, তাই তো হল, শয়তানি রেশমকুমারীর কাজ ওটা।
ব্যাপারটা প্রথমে না বুঝলেও ধীরে ধীরে সহদেববাবু মিস জুলেখার কাছ থেকে জানতে পারলেন রেশমকুমারী হল যাত্রার নায়িকা। মিস জুলেখা যেমন মোটেই মিস নন, তেমনিই শ্রীমতী রেশমকুমারী কুমারী নন, তিনি পটললালের প্রথমা স্ত্রী।
একেবারে সেই পরশুরামের ভূষণ্ডির মাঠের কাহিনি। যখন পটললাল ও রেশমকুমারী একত্রে থাকতেন, দৈনিক অলস, অকর্মণ্য পটললালকে রেশমকুমারী জুতো পেটা করতেন। পটললালের বুকে, পিঠে হাই হিলের লাঞ্ছনা চিহ্ন মিস জুলেখা অনেক দেখেছেন। পটললাল যখন এসে কেঁদে পড়তেন, অনেক নারকেল তেল, মলম সেসব ক্ষতস্থানে মিস জুলেখা লাগিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু আজ দু-আড়াই বছর পটললাল-রেশমকুমারীর ছাড়াছাড়ি। রেশমকুমারীর সোনার নাকছাবি চুরি করে সেই যে পটললাল পালিয়েছিলেন তারপর রেশমকুমারী তাঁর আর খোঁজখবর নেননি।
এখন এতদিন পরে মিস জুলেখা পটললালকে মালা বদল করে কালী সাক্ষী রেখে জীবনসঙ্গী করার পর আবার পটললালের ওপরে রেশমকুমারীর দৃষ্টি পড়েছে।
কিন্তু মিস জুলেখাই বা তার দাবি ছাড়বেন কেন? রীতিমতো সোয়া একান্ন টাকার ধর্মবিয়ে। পটললালের ওপর তার অধিকারই বা কম কী?
এই নিয়ে রেশমকুমারীর সঙ্গে মিস জুলেখার অনেক বচসা, চিৎকার-চেঁচামেচি, হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে পটললালের মনোভাব এতদিন কিছুই বুঝতে পারেননি মিস জুলেখা।
০৪. পটললাল পাল
পটললাল পালের চরিত্র বর্ণনার খুব বেশি প্রয়োজন নেই।
গতদিনের মিস জুলেখার ঘটনাটা বললেন বেশ কিছুটা বোঝা যাবে।
সাধারণত নাচের পর মঞ্চ থেকে দর্শকদের ছুঁড়ে দেওয়া খুচরো টাকাপয়সা মিস জুলেখা কুড়োন না। বৃদ্ধ প্রম্পটার ড্রপসিন পড়ার পর সেগুলো কুড়িয়ে কিছু নিয়ে নেয়, কিছু মিস জুলেখাকে দেয়।
কিন্তু দুদিন আগের সন্ধ্যায় এক মাতাল দর্শক নাচের দৃশ্যে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সে চেয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে প্রথমে খুচরো পয়সা, তারপরে দু-টাকা নোট, তারপরে আরও বড় নোট এবং অবশেষে দুটো একশো টাকার নোট মঞ্চে ছুঁড়ে দেয়।
