ইঁদুরের দংশনের অব্যর্থ উপশম
মাত্র তিন ডোজে উপকার
বিফলে মূল্য ফেরত
ডাঃ সহদেব শুক
কড়েয়া রোড, কলিকাতা
এই বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ডের দুপাশে দুটি হিংস্র ইঁদুরের ছবি আঁকা, সেগুলো প্রায় কুমিরের মতো বড় এবং খরদন্তী।
ইঁদুরের দংশনের চিকিৎসায় সহদেববাবুর বেশ হাতযশ হয়েছে।
আজকের দশজন রোগীকেই তিনি যত্ন করে দেখলেন ও ওষুধ দিলেন। কিন্তু শুধু ওষুধ দিলে তো কাজ হয় না, ওষুধ খাওয়ার সময় একটা গোপন মন্ত্রও মনে মনে বলতে হয়।
বলা বাহুল্য, সেই গোপন মন্ত্রটিও ডা. সহদেব শুকেরই রচনা। একটু গোলমেলে ছন্দের এই মন্ত্রটি হল,
শুক বলে,
ইঁদুর কী জিনিস
শুক বলে,
ইঁদুরের দাঁতে বিষ।
শুক বলে,
ভয় না পাবিস!
শুক বলে,
অহর্নিশ, অহর্নিশ,
অহর্নিশ!
অহর্নিশ মানে দিন ও রাত্রি, মানে চব্বিশ ঘণ্টা। এইটুকু বুঝলেই মন্ত্রের মর্মার্থ ধরা যায়।
ইঁদুরের বিষে ভয় নেই। ডাক্তার সহদেব শুক বলছেন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ভাল হয়ে যাবে।
তিন ডোজ ওষুধ আর তার সঙ্গে স্বরচিত এই মন্ত্র, বিনিময়ে রোগী প্রতি বত্রিশ টাকা। সকালবেলাতেই তিনশো বিশ টাকা আয় হয়ে গেল।
ইঁদুর দংশনের চিকিৎসা করে ভাগ্য ফিরে গেছে সহদেববাবুর। তা ছাড়া এই ইঁদুর দংশনের চিকিৎসার সূত্রেই তার শখের গোয়েন্দাগিরিতে প্রবেশ। পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের ডাকসাইটে উপপ্রধান সাহেবকে খোদ লালবাজারে দপ্তরের মধ্যে একটা ছুঁচো কামড়িয়ে দেয়। সেই চিকিৎসার সূত্রে ডাঃ সহদেব শুককে তলব করা হয়েছিল পুলিশ দপ্তরে। সেখানে দংশিত উপপ্রধান সাহেবের ক্ষতস্থান দেখে ডাক্তার সহদেব শুক বলেন, আসল ছুঁচো নয়, কোনও নকল প্লাস্টিকের ইঁদুরের মারাত্মক কেমিক্যাল লাগানো নকল বিষাতের কামড়।
সবাই সহদেববাবুর বিশ্লেষণ হৃদয়ঙ্গম করার আগে উপপ্রধান সাহেব বিষক্রিয়ায় অজ্ঞানের মতো হয়ে গেলেন, তাঁর নাক মুখ দিয়ে সাদা ফেনার মতো গাজলা বেরোতে লাগল। তাকে তখনই হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে তার প্রাণরক্ষা করা হয়।
এদিকে দপ্তরেরই একপাশে স্প্রিং লাগানো প্লাস্টিকের ইঁদুরটি বড় কাঠের আলমারির নীচে পাওয়া যায়। তখনই অনেকের খেয়াল হয় যে উপপ্রধান সাহেব আজ সকালবেলাতেই প্লাস্টিক কিং মোহন মেহতাকে বহুক্ষণ জেরা করেছেন কালো টাকার ব্যাপারে। সঙ্গে সঙ্গে মোহন মেহতার বাড়িতে ও অফিসে সার্চ করা হল, কয়েক হাজার বিষাক্ত প্লাস্টিকের ইঁদুর বেরোল এই দুই জায়গা থেকে এবং এর পর থেকে সবাই জেনে গেল যে কলকাতায় সব ইঁদুর কামড়ের কেসই আসল ইঁদুরের কামড় নয়, অনেকগুলিই প্লাস্টিকের নকল বিষাক্ত ইঁদুরের কাজ।
সে যা হোক এর পর থেকে গোয়েন্দা দপ্তর ছোটবড়, নানারকম গোলমেলে কেসে সহদেব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে লাগলেন। এবং সেই সূত্রেই মিস জুলেখা তাকে গতকাল যোগাযোগ করেন। পুলিশ দপ্তর স্বামী চুরির, বিশেষত মিস জুলেখার স্বামী চুরির, পটললাল পালের মতো স্বামী চুরির কেস সহজে হাতে নিতে চায়নি, তাঁরাই ডাক্তার সহদেব শুককে অনুরোধ করে কেসটা নিতে।
.
কেসটা গতকালই নিয়েছেন সহদেববাবু। বিকেলবেলাতেই থিয়েটার হলে যাওয়ার পথে মিস জুলেখা সহদেববাবুর চেম্বারে এসেছিলেন।
সহদেববাবু ধরে নিয়েছিলেন এটাও কোনও ইঁদুরের কামড়ের কেস। তাই সরাসরি মিস জুলেখাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোথায় কামড়েছে?
মিস জুলেখা বলেন, কামড়ায়-টামড়ায়নি। চুরি গেছে।
ঠিক এই সময়েই পুলিশের ফোন আসে। তারা কেসটির কথা উল্লেখ করে জানান যে মিস জুলেখাকে তারাই পাঠিয়েছেন।
তখন মিস জুলেখার হাতে মোটেই সময় ছিল না। নাটকের সময় হয়ে গেছে। তিনি ডাঃ সহদেব শুককে অনুরোধ করলেন তিনি যদি এই সন্ধ্যায় সরোজিনী মঞ্চে একবার আসেন, তাহলে সহদেববাবুর যৌবনের লীলা নাটকটি তৎসহ উপরি পাওনা মিস জুলেখার নাচও দেখা হয়, আর সেই সঙ্গে ইন্টারভ্যালের সময় পটললাল পালের চুরি যাওয়ার কাহিনিও শুনতে পারেন। থিয়েটারের গেটে গিয়ে তিনি যেন দারোয়ানকে মিস জুলেখার কথা বলেন, তা হলে দারোয়ান তাকে সরাসরি গ্রিনরুমে নিয়ে যাবে, সেখানেই উইংসের আড়ালে একটা চেয়ারে বসে নাটকটা দেখতে পারবেন।
তাই হল, মিস জুলেখা চলে যাওয়ার আধঘণ্টা পরে একটু সাজগোজ করে একটা ট্যাকসি ডেকে সহদেববাবু সরোজিনী মঞ্চে পৌঁছালেন, সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ান তাকে গ্রিনরুমে নিয়ে গেল।
সেখানে বেশ ভিড়। প্রযোজক-পরিচালক সমেত আরও বেশ কয়েকজন মিস জুলেখার মেক-আপ করা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং মেক-আপম্যান দিল মহম্মদকে নানা রকম নির্দেশ দিচ্ছেন। একটু পরেই মিস জুলেখার নাচের সিন।
শরীরে তরঙ্গ তুলে, চোখ নাচিয়ে মিস জুলেখা সহদেববাবুকে স্বাগত জানালেন। তারপর পরীর মতো হালকা নীল রঙের ওড়না উড়িয়ে এক লাফে গিয়ে পড়লেন স্টেজের ঠিক মাঝখানে এবং মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন সেই নীল ওড়না, তারপর সেকী তাথৈ তাথৈ নৃত্য, এই ভারী শরীরে এমন কসরত করা যে সম্ভব চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
দর্শকবৃন্দ চেয়ারের হাতলে চাটি মেরে আহা, আহা, মার হাব্বা, মার হাব্বা, মর গিয়া, জানলে লিয়া বলে চেঁচাতে লাগল। মঞ্চ জুড়ে সে কী দাপাদাপি মিস জুলেখার, দৌড়ে, লাফিয়ে, ঘুরপাক খেয়ে, চিত হয়ে শুয়ে, উপুড় হয়ে বসে নীল আলো, লাল আলো, বেগুনি আলোয় নাচ করতে লাগলেন মিস জুলেখা। শেষের দিকে একদম উদ্দাম হয়ে গেলেন, এতক্ষণ কোমরের দোলায় কদম ফুল দুটো বাত্যাতাড়িত বৃক্ষশাখায় ফলের মতো আন্দোলিত হচ্ছিল, এবার সে দুটো মঞ্চের ওপর। খসে পড়ে গেল।
