দুই ভাই এসে অনেকক্ষণ ধরে মিস জুলেখার চারপাশে ঘুরে ঘুরে মাদুলিটা দেখলেন। তারপর মিস জুলেখা আপত্তি করছেন না দেখে সাহস সঞ্চয় করে হাত দিয়ে মাদুলিটা যাচাই করতে লাগলেন।
ওঁদের মুখচোখ এবং নৈতিক চরিত্রের মানের কথা ভেবে মিস জুলেখা শঙ্কিত বোধ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন এই প্রস্তাবে যে ওই লালফিতের সঙ্গে দুটো শোলার কদম ফুল ঝুলিয়ে মাদুলিটা ঢেকে দেওয়া হবে।
তদবধি কোমরের লালফিতেয় নাভির ঠিক নীচে দুটো শোলার কদম ফুল নৃত্য দৃশ্যে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে কদমদুটো লাগানোর সময় বৃদ্ধ মেকআপম্যান দিল মহম্মদ বড় বেশি সময় নেয়। কোনও কোনও দিন প্রযোজক ও পরিচালক কদমফুল লাগানোর সময় ফুল দুটো দিল মহম্মদ ঠিকমতো লাগাচ্ছে কি না তা দেখার জন্যে উপস্থিত থাকেন। সঙ্গে অনেক সময় তাদের সাঙ্গপাঙ্গও থাকে। মিস জুলেখার নাচের চেয়ে তার সাজগোজ করার, শোলার কদম ফুল ঝোলানোর ব্যাপারটা ঘনিষ্ঠ মহলে এখন অনেক বেশি জনপ্রিয়।
০৩. আবার ডাঃ শুক
আবার এসেছে গন্ধমাদন
চারদিক মাতে সৌরভে।
কৌ-কৌ-কৌ কাক ও কুকুর
বাড়ি ভরে যায় কৌরবে ॥
শুধু গোয়েন্দাগিরি বা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারই নয়। শ্রীযুক্ত নকুল শুকুল ওরফে সহদেব শুক একজন শৌখিন সংগীতকার।
অদ্যাবধি তিনি সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন। তার মধ্যে যেগুলি তার নিজের পছন্দ হয়েছে সেগুলিতে নিজেই সুর দিয়ে নিজেই গেয়েছেন।
এই গানগুলি কেমন সে বিষয়ে আমার মতো সংগীত-মূর্খ ব্যক্তির কোনও অভিমত না দেয়াই ভাল। তবে বেলেঘাটার দি নিউ ডেমোক্রেটিক মিউজিক ক্যাসেট কোম্পানি এই পুজোতেই তার একটা গানের সংকলন প্রকাশ করবে, তার জন্যে সহদেববাবুর নগদ সাত হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
তবে তাতে দুঃখ নেই। মিস জুলেখার স্বামীকে খুঁজে বার করতে পারলে কিছু আসান হবে।
মিস জুলেখাকে সহদেববাবু কেসটা হাতে নেয়ার পরে প্রশ্ন করেছিলেন, আমার কী প্রাপ্য?
মিস জুলেখা ভ্রূভঙ্গিসহ শরীর নাচিয়ে বলেছিলেন, আমার দু মাসের নাচ।
তা, সহদেববাবু খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, মিস জুলেখার প্রতি মাসের নাচের আয় পাঁচ হাজার টাকা। সুতরাং দুমাসে দশ হাজার টাকা, সে কিছু কম নয়। গানের ক্যাসেটের পয়সা জুগিয়েও হাতে কিছু থাকবে।
কিন্তু সহদেববাবুর কলমে এবার গান মোটেই আসছে না।
সেদিন কর্পোরেশনের একটা ময়লা ভরতি লরি চাকা খুলে কড়েয়া রোডের মোড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিল। বীভৎস গন্ধে সারা পাড়া বাহাত্তর ঘণ্টা আচ্ছন্ন ছিল। অবশেষে ময়লাগুলো একা একাই কী করে ঝোড়ো হাওয়ায়, বৃষ্টির জলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে গন্ধ কমতে লাগল, তবে লরিটা এখনও হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। পতনের দিন সন্ধ্যা হতে না হতেই লোডশেডিং যেই হল, কারা যেন কোথা থেকে এসে ভাঙা এবং ভাল চাকাগুলো সব ঝটাঝট খুলে নিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে লরিটা কচ্ছপের মতো পড়ে আছে।
সেই লরিটাকেই স্মরণ করে হয়তো এই আবার এসেছে গন্ধমাদন গানটির সূচনা তবে এই গানটিতে কৌরব শব্দটি যুগ্ম ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রথম কৌরব মানে হল কাকের কৌ কৌ, কুকুরের কৌ কৌ এই সব রব, ময়লা ফেলার লরি ভেঙে পড়ায় কাক ও কুকুরের আনন্দ ধ্বনি।
আর দ্বিতীয় কৌরব হল; পাণ্ডব কৌরবের কৌরব। মহাভারত বিশারদ পিতার যোগ্য পুত্র হিসেবে পাণ্ডব কৌরবের ব্যাপারটা সহদেববাবুর মজ্জাগত।
সহদেববাবু জানেন তিনি একাই দুই পাণ্ডব, নকুল এবং সহদেব এবং কৌরবেরা তাঁর পরম শত্ৰু, যাকে বলে জ্ঞাতি শত্রু।
বাড়ি ভরে যায় কৌরবে, এই পংক্তিটা লেখার পর থেকেই কেমন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন সহদেব। কৌরবে মানে শত্রুতে যদি বাড়ি ভরে যায়, তাহলে তো সর্বনাশ।
কিন্তু এই মুহূর্তে এসব শৌখিন চিন্তার অবকাশ নেই সহদেব ডাক্তারের। বাইরের চেম্বারে অন্তত দশজন রোগী অপেক্ষা করছে। দশজনই ইঁদুরের কামড়ের রোগী।
সম্প্রতি কলকাতায় ইঁদুর খুব বেড়ে গেছে, শহরতলিতে আরও। বিভিন্ন ইঁদুর মারার ওষুধে তাদের কোনও ক্ষতি হচ্ছে না, বরং বৃদ্ধি হচ্ছে, ইঁদুর মারার ওষুধ খেয়ে খেয়ে তারা ক্রমশ বেশি দুর্দান্ত, বেশি হিংস্র হয়ে উঠছে। মানুষদের তারা আর আজকাল একেবারেই ভয় পায় না।
কলকাতায় ডাক্তারি করতে এসে বুদ্ধিমান সহদেববাবু একথা অনুধাবন করেছিলেন যে এখানে সব বিষয়ের ডাক্তার হয়ে ব্যবসা বা পসার জমাতে দেরি হবে, একেবারে নাও হতে পারে। তার চেয়ে কোনও একটা জরুরি বিষয়ের ডাক্তার হলে তাড়াতাড়ি পসার জমবে, খ্যাতি ও অর্থ হবে।
যে সময় সহদেববাবু এই সব ভাবছিলেন সেই সময়ে একদিন সন্ধ্যাবেলা পরপর দুটি ইঁদুর, একটি নেংটি ইঁদুর এবং একটি ছুঁচো যথাক্রমে তার বাঁ পায়ের কড়ে আঙুল এবং ডান পায়ের পায়ের বুড়ো আঙুল কামড়িয়ে দেয়।
বাধ্য হয়ে তিনি পরদিন সকালে বাড়ির কাছেই ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে যান। সেখানে। ইমারজেন্সি আউটডোরে দেখেন প্রায় সবাই ইঁদুরের কামড়ের রোগী।
এরপর বাড়ি ফিরে এসে ইঁদুর ও ইঁদুরের কামড়, ইঁদুরের কামড়ে বিষ আছে কিনা, তার প্রতিক্রিয়া কী হয়, প্রতিষেধকই বা কী, এই সব বিষয়ে বিভিন্ন চিকিৎসাগ্রন্থ সংগ্রহ করে গভীর পড়াশোনা করেন।
তারপর দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন, বাড়ির সামনেও সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন, তাতে বড় বড় হরফে লেখা,
