মিস জুলেখা সলজ্জ কণ্ঠে জানালেন, তা প্রায় দশ-এগারোবার হবে।
চেলাঠাকুর তাই শুনে বললেন, মাত্র দশ-এগারো বার! এ তো কলিতীর্থ কালীঘাট, এখানে যারা আসেন তাদের মধ্যে অনেকে পনেরো বিশবার করে বিয়ে করেছে। হামেশাই লোকে, মেয়েলোকে বছরে দু-তিনবার করে বিয়ে করে। এমনকী একই মাসে একই মেয়েছেলেকে দুবার বিয়ে করতে দেখেছি।
ভূমিকা শেষ করে চেলাঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে জুলেখাকে জানালেন, একটা অব্যর্থ বিবাহনিবারণী মাদুলি আমার কাছে আছে। এক মেমসাহেব নেবেন বলে কাশী থেকে আনিয়েছিলাম। তা সেই মেমসাহেব তো এলেন না। আপনি যদি নেন তো আপনার জন্যে নিয়ে আসি। সোয়া একান্ন টাকা, মানে একান্ন টাকা পঁচিশ পয়সা দাম পড়বে।
মিস জুলেখা ভাবলেন যে কত পয়সাই তো নয়ছয় হয়, না হয় আরও সোয়া একান্ন টাকা গেল। দেখাই যাক না বিয়ে ভাঙাটা বন্ধ হয় কি না। তা ছাড়া পটললালকে তার খুবই পছন্দ।
মিস জুলেখার সম্মতি পেয়ে চেলাঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের দক্ষিণ দিকে একটা বেলোয়ারি দোকানে গিয়ে পেতলের রং করা একটা টিনের মাদুলি পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে আর দু মিটার লাল ফিতে একটাকা দিয়ে কিনে ফেললেন। তারপর মন্দিরের উঠোন থেকে একটা পরিত্যক্ত শালপাতার ঠোঙা তুলে তার থেকে একটু পাতা ছিঁড়ে মাদুলির মধ্যে ঢুকিয়ে মিস জুলেখার কাছে ফিরে গেলেন। মিস জুলেখা তার হ্যান্ডব্যাগ খুলে পঞ্চাশ টাকার নোট, একটা এক টাকার নোট আর একটা আধুলি খুঁজে বার করলেন।
সোয়া একান্ন টাকা থেকে পঁচিশ পয়সা বেশিই হয়ে গেল, এতে মাদুলির প্রভাবের কোনও হেরফের হবে কিনা জুলেখার এই প্রশ্নে চেলাঠাকুর বললেন, সাংঘাতিক ধ্বক এই মাদুলির, পঁচিশ পয়সার তারতম্যে এর কী হবে?
এ কথা শুনে জুলেখা চেলাঠাকুরের হাতে সাড়ে একান্ন টাকাই ধরে দিলেন। চেলাঠাকুরও খুশি হলেন, তার মোট দেড় টাকা খরচ হয়েছিল, এতে পঞ্চাশ টাকা পুরো লাভ হল। বিয়ের পুরুতের সঙ্গে বিয়ের খরচ-খরচা নিয়ে বেশ একটা বচসা লেগেছিল পটললালের। মন্দিরের বারান্দাতেই আটকিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এতক্ষণে গম্ভীরমুখে ফিরে এসে বললেন, পুরুতব্যাটা বলছে, ধর্মান্তরিতার পুনর্বিবাহ দশ-পনেরো টাকায় হবে না। একান্ন টাকা পঁচিশ পয়সার কমে এ বিয়ে সিদ্ধ হবে না। তা সিদ্ধ হোক অসিদ্ধ হোক আমি সোয়া একান্ন টাকা দিচ্ছি না।
পটললাল অতিশয় ছিঁচকে ব্যক্তি। তাঁর স্বভাবের এই দিকটা মিস জুলেখা জানেন। তিনি দেখলেন আবার সোয়া একান্নর ধাক্কায় পড়েছেন। কী আর করা যাবে, খুচরো টাকা আর ছিল না, পটললালকে একটা একশো টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে বললেন, বিয়ে নিয়ে কিপটেমি কোরো না। যাও পুরুত ঠাকুরকে সোয়া একান্ন টাকা দিয়ে এসো।
জুলেখা জানেন ফেরত আটচল্লিশ টাকা পঁচাত্তর পয়সা পটললাল তাকে কখনওই দেবেন না। তা হোক, পটললালের তো হাতখরচা লাগে। আগরওয়ালা মরে যাওয়ার পর এখন সে আর পয়সা পাবে কোথায়?
পটললালকে দেখে চেলাঠাকুর একটু গুম মেরে গিয়েছিলেন। লোকটা সুবিধের বলে মনে হচ্ছে।। বিয়ের সোয়া একান্ন টাকার ওপরে আবার যদি মাদুলির সোয়া একান্ন টাকা টের পেত, তাহলে হয়তো এ টাকাটা কেড়েই নিত।
এখন পটললাল মন্দিরের বারান্দার দিকে চলে যেতে হাতের মুঠো খুলে লাল ফিতে সমেত মাদুলিটা বের করে জুলেখার হাতে দিয়ে চেলাঠাকুর বললেন, মাদুলিটা অতি জাগ্রত। কখনও কাছছাড়া করবেন না। এই লাল ফিতেটা দিয়ে বেঁধে কোমরে ধারণ করবেন।
ইতিমধ্যে পটললাল ফিরে এসেছেন, তাঁকে দেখেই চেলাঠাকুর হাওয়া হয়ে গেলেন।
মিস জুলেখা এবং পটললাল মন্দিরের বাইরে রাস্তায় এসে একটা ট্যাকসি ধরে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটা চেনা ঠেকে চলে গেলেন বিবাহ উৎসব উদ্যাপন করতে।
সেখানে পৌঁছেই বাথরুমে গিয়ে জুলেখা কোমরে লাল ফিতে লাগানো সেই মাদুলিটা বেঁধে ফেললেন। পটললালের মতিগতিতে তার বিশ্বাস নেই, এই ঠেকে পটললালের চেনা অনেক মেয়ে আসে। তাদের কারও সঙ্গে ঝুলে পড়লেই বিপদ।
বয়েসের দোষে মিস জুলেখার শরীরে একটু বেশি চর্বি জমেছে। নর্তকীদের শরীরের কোনও কোনও অংশে মাংসচর্বি একটু বেশি থাকলে দর্শকেরা পছন্দই করে।
কিন্তু মিস জুলেখার একটা ছোট নেয়াপাতি ভুড়িও হয়েছে। ফলে ঠিক সরাসরি কোমরের ওপরে লাল ফিতেয় বাঁধা মাদুলিটা রইল না। নাইয়ের একটু নীচে নেমে গেল, ফুল্ল কোমরবতী রমণীরা নাইয়ের নীচে যেখানে শাড়ি নামিয়ে পরেন সেই জায়গায় মাদুলিসহ ফিতেটার অবস্থান হল।
আগেই বলেছি সোনালি উইগ পরে সিঁদুরসহ মাথার চুল ঢেকে এবং হাতে শাঁখা রেখেও মিস জুলেখার তথাকথিত ক্যাবারে নৃত্যের কোনও অসুবিধে হয়নি, কিন্তু কোমরে মাদুলিটা বাধার সৃষ্টি করল। এতক্ষণে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা বিশদ করে বলা উচিত।
কোমরে মাদুলি বাঁধার পর প্রথম সন্ধ্যায় মঞ্চে আবির্ভূত হবার আগে মেকআপম্যান ওই মাদুলিটি দেখতে পায় এবং আপত্তি জানায় যে মাদুলিটা রাখা যাবে না। খুলে ফেলতে হবে।
বলা বাহুল্য এতে সতীসাধ্বী মিস জুলেখা খুবই আপত্তি জানান। বস্ত্র উন্মোচনে তাঁর মোটেই আপত্তি নেই, কিন্তু মাদুলিটি রাখতে হবে।
খবর পেয়ে পরিচালক ও প্রযোজক আসেন। এঁরা দুজনে যমজ ভাই। পারিবারিক পুরনো রেড়ির তেলের ব্যবসা এঁদের। আজকাল রেড়ির তেলের চাহিদা নেই, ব্যবসা পড়ে গেছে। তাই এঁরা অবশেষে থিয়েটারের ব্যবসায় এসেছেন।
