তবে আসল অসুবিধে হয়েছিল মিস জুলেখার কোমরের মাদুলি নিয়ে।
প্রথম বিয়ের মতোই পটললাল পালের সঙ্গে এই সর্বশেষ বিয়েও কালীবাড়িতে মালাবদল করে হয়েছিল। তবে এবারে কালীঘাটে, দক্ষিণেশ্বরে নয়।
বারবার বিয়ে করার ব্যাপারটা মিস জুলেখার আর ভাল লাগছিল না। কালীবাড়ির দরজাতেই এক ত্রিকালসিদ্ধ সাধুবাবার আবির্ভাব হয়েছে। দীর্ঘ এক হাজার আট বছর হিমালয়ের গুহায় কাটিয়ে আজ কয়েকদিন হল কালীঘাটে ফিরে এসেছেন। সাধুবাবাকে ঘিরে বেশ ভিড়।
কালীমন্দিরে মালাবদল করে বিয়েতে জুলেখা বেশ অভিজ্ঞা, তিনি তাড়াতাড়ি পটললালের সঙ্গে বিয়েটা সাঙ্গ করে সাধুবাবার কাছে ফিরে এলেন।
মহিলা বলে ভিড় ঠেলে এগোতে কোনও অসুবিধা হল না মিস জুলেখার। তা ছাড়া বড়দিন বা ইংরেজি নববর্ষে এর চেয়ে অনেক বেশি গাদাগাদি মাতালের ভিড়ে পানশালায় তাঁকে নাচতে হয়, ভিড় ঠেলতে তিনি ভালই জানেন।
সাধুবাবার পাশেই তার এক চেলা দাঁড়িয়ে, মধ্যবয়সি, সাধারণ চেহারা, সাধারণ ধুতি পাঞ্জাবি পরা। সাধুবাবার মতো তারও কপালে একটা বিরাট সিঁদুরের ফোঁটা জ্বলজ্বল করছে। তবে সাধুবাবার মতো তার চেলার মাথাভর্তি জটা নেই কিংবা গলায় বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা নেই, বিশাল দাড়িগোঁফও নেই।
সে যা হোক এই চেলাঠাকুরকেই মিস জুলেখা জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, সাধুবাবা কি সত্যিসত্যিই এক হাজার আট বছর হিমালয়ের গুহায় ছিলেন?
চেলাঠাকুর বললেন, সে আমি বলতে পারব না। আমার দুই ছেলে পলাশির যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলার পক্ষে যুদ্ধ করে ক্লাইভের তোপের মুখে প্রাণ দেয়। সেই থেকে আমি বিবাগী হয়ে হিমালয়ের পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই। সেখানেই সাধুবাবার সঙ্গে দেখা। কিন্তু সে তো মাত্র দুশো বছর আগের কথা। হাজার বছরের কথা তো বলতে পারব না।
হাজার বছর না হোক, দুশো বছর শুনেই সাধুবাবা সম্পর্কে জুলেখার মনে ভারি শ্রদ্ধার ভাব এল। সাধুবাবার রক্তাভ চোখসহ মুখটাও কেমন মায়াবি, যেন গতজন্মের চেনা।
মিস জুলেখা একেবারে সামনে গিয়ে সাধুবাবার দুই পা জড়িয়ে ধরে উচ্ছাস ভরে ডুকরিয়ে উঠলেন, বাবা, আমি আর পারছি না, আমি আর বিয়ে করতে পারছি না।
সাধুবাবা এতক্ষণ চোখ বুজে ছিলেন। মিস জুলেখার কণ্ঠস্বর শুনে চমকিয়ে চোখ খুলে একবার মিস জুলেখার মুখের দিকে তাকিয়ে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওগো, বাবা নয়। বাবা নয়। আমি তোমার বাবা নই। এই বলে চেঁচা দৌড় লাগালেন কালীঘাট রোডের দিকে, সমবেত ভক্তদের তোয়াক্কা না করে ভিড়ের মধ্যে সে এক সাংঘাতিক দৌড়।
আগেই মুখটা চেনা চেনা মনে হচ্ছিল, তারপরে কণ্ঠস্বর, অবশেষে এই পলায়নী দৌড় এসবই মিস জুলেখা, না ঠিক মিস জুলেখা নয়, সেই প্রাক্তনী শ্রীমতী লেখা ভট্টাচার্য (ত্রিবেদী) মহোদয়ার খুবই চেনা।
মুহূর্তে মিস জুলেখা চিনতে পারলেন, এ তার সেই প্রথম স্বামী শ্রীযুক্ত নারায়ণ ত্রিবেদী।
সেই নারায়ণ ত্রিবেদী যে আগেও যখন কোনও রকম বিপদে পড়ত এই রকম লাফ দিয়ে দৌড়ে পালাত।
তা পালাক, পালিয়ে যাক। তাতে এখন আর মিস জুলেখার দুঃখ বা আফসোস নেই। নারায়ণ ত্রিবেদীর প্রতি আর সামান্য কোনও টানও নেই জুলেখার মনে, শুধু একটু স্মৃতি বেদনা আছে। আর তা ছাড়া এখন নারায়ণ যদি জানতে পারে যে লেখা নৃত্যগীত নিপুণা হয়েছে, ভাল আয় করছে, স্বচ্ছল হয়েছে, সে যেরকম চরিত্রের লোক হয়তো এসে এই এতদিন পরে ভাগ চাইবে।
কিন্তু, হায়রে অদৃষ্টের পরিহাস।
জীবনের একাদশতম বিয়ে করতে এসে সেই প্রথম স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, যার সঙ্গে এখনও বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি।
.
সাধুবাবার এই আকস্মিক পলায়নে চেলাঠাকুরও কেমন বিচলিত হয়ে গিয়েছিলেন, এখন একটু সামলিয়ে নিয়ে বললেন, সাধুবাবার এরকম প্রায়ই হয়। ভগবান ডাকলে আর বসে থাকতে পারেন না। এভাবে দৌড়ে তার কাছে চলে যান। এই বলে চেলাঠাকুর সাধুবাবার পলায়ন পথের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন।
তারপর পুরনো কথার খেই ধরে তিনি মিস জুলেখাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি বলছিলেন। যেন, বিয়ে করতে পারছি না। আর বিয়ে করতে পারছি না। ব্যাপারটা কী?
এতদিন পরে নারায়ণ ত্রিবেদীকে, তার প্রথম ভালবাসা, প্রথম স্বামীকে দেখে মিস জুলেখার মনের সাগরের তটে একের পর এক তিক্ত-মধুর স্মৃতির ঢেউ এসে আছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি একটু ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। নারায়ণ ত্রিবেদী লোকটা সুবিধের নয়, কিন্তু সে তো তার তিন সন্তানের জনক। চেলাঠাকুরের প্রশ্নে মিস জুলেখার সম্বিৎ ফিরে এল, তিনি চেলাঠাকুরকে বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, ঠিকই বলেছিলাম, অনেকবার বিয়ে করা হয়ে গেল আমার। আর বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না।
চেলাঠাকুর বুদ্ধিমান লোক, পলাশির যুদ্ধে দুই ছেলেকে হারিয়ে তার ক্ষণিক বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছিল, কিন্তু সেটা অনেকদিন কেটে গেছে। এতদিন পরে এখন তার রীতিমতো চনমনে বুদ্ধি।
আজ সাধুবাবা পালিয়েছেন। রোজগারের আশা কম। চেলাঠাকুর মিস জুলেখার কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলেন, এই একজন মক্কেল পাওয়া গেছে, এর কাছে কিছু আশা করা যেতে পারে। দু-চার গণ্ডা যা হয়, তাই লাভ। না হলে আজ উপোস দিতে হবে।
তাই তাড়াতাড়ি চেলাঠাকুর মিস জুলেখাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কতবার বিয়ে করেছেন?
