প্রথমেই সেই ভ্রান্তি নিরসন করা দরকার। ডাক্তার সহদেব শুকের মতো মিস জুলেখারও একটি পূর্বনাম আছে। অবশ্য তিনি আদালতে এফিডেভিট করে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে নাম বদল করেননি। নাম বদলিয়েছেন নেহাতই। পেশার দায়ে।
মিস জুলেখার আগের নাম ছিল শ্রীমতী লেখা ভট্টাচার্য।
রীতিমতো ভটচাজ বামুন বংশের মেয়ে, গঙ্গাতীরের প্রসিদ্ধ পরিবারের। তিনি কিশোরী বা তরুণী এমনকী যুবতীও প্রায় নন। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর বয়েস হয়েছে তাঁর, তিন পুত্রকন্যার জননী।
ক্লাস টেনে পড়ার সময় টেস্ট পরীক্ষার ঠিক দুদিন আগে গলির মোড়ের শ্রীহনুমান ব্যায়ামাগারের বালিকা শাখার ব্যায়াম শিক্ষক নারায়ণ ত্রিবেদীর সঙ্গে কুমারী লেখা ভট্টাচার্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে দক্ষিণেশ্বরে মা কালীর সামনে মালাবদল করেন এবং সিঁথিতে সিঁদুর আরোপ করে শ্রীমতী লেখা ত্রিবেদীতে পরিণত হন।
এরপর চার-পাঁচ বছরের মধ্যে তিনটি পুত্রকন্যা তার জন্মায়। কিন্তু ব্যায়ামবীর নারায়ণ ত্রিবেদী এর মধ্যেই সংসারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে একদিন শেষরাতে লোটাকম্বল সম্বল করে একটা খবরের কাগজের ঠোঙায় রান্নাঘরের পেছনের ছাইগাদা থেকে কয়েক মুঠো ছাই নিয়ে পথে বেরিয়ে সেগুলো সারা শরীরে মেখে নিমতলা শ্মশানঘাটের কিঞ্চিৎ উত্তরে গঙ্গার ধার ঘেঁষে রেলের লাইন বাঁচিয়ে আস্তানা গাড়েন। যেকোনও কারণেই হোক, সংসার ত্যাগের পর তিনি প্রায় এক বছর মৌনী অবস্থায় থাকেন। সেখানে তার পরিচয় হয় মৌনীবাবা বলে।
অনেক খোঁজখবর করে শ্রীমতী লেখা তিন ছেলেমেয়ের হাত ধরে নিমতলায় মৌনীবাবার কাছে। পৌঁছেছিলেন। কিন্তু মৌনীবাবা তখন কথা বলেন না, তদুপরি লেখাদেবীর রাগারাগি, কান্নাকাটি, শাপশাপান্ত সব কিছু উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছোট কলকেতে গাঁজা সেবন করে যান।
এদিকে, লেখাদেবীকে বেওয়ারিশ ভেবে মৌনীবাবার শিষ্যদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ চঞ্চল হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন তাকে খাদ্য ও বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়।
লেখাদেবীর গত্যন্তর ছিল না।
আর সেই থেকেই তার পতন কিংবা অভ্যুত্থানের শুরু। ক্রমশ চিৎপুরের যাত্রাদলে সাইড পার্ট, নায়িকার সখীর ভূমিকায় নৃত্যগীতাদি ও ছলাকলা–লেখাদেবী ধীরে ধীরে, ইচ্ছায় অনিচ্ছায়, সুখে-দুঃখে প্রমোদ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলেন।
এর পরে অবশ্য লেখা থেকে জুলেখা হতে বহু বছর লেগেছে। পার্ক স্ট্রিটের বার হয়ে উত্তর কলকাতার প্রগতিশীল সামাজিক নাটকের মঞ্চে প্রায় উদোম হয়ে পৌঁছুতে বেশ পরিশ্রম হয়েছে।
তা ছাড়া এর মধ্যে বহুবার স্বামীবদল করতে হয়েছে তাঁকে নিজের পেশারই স্বার্থে। তবে পুত্রকন্যা আর জন্মায়নি।
কিন্তু একটা কথা বলতেই হবে, শ্রীমতী লেখা ওরফে মিস জুলেখা যখনই যে স্বামীর ঘর করেছেন, খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন, সতীত্বের সঙ্গে করেছেন।
ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণের বাড়ির মেয়ে, আসলে সতীসাধ্বী হওয়া তার রক্তে রয়েছে।
পটললাল পালের সঙ্গে তাঁর শেষ বিবাহ। এই মাত্র কয়েকমাস আগে। পূর্ববর্তী পতিদেবতা হরিলাল আগরওয়ালা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এর কিছুদিন আগেই। হরিলাল আগরওয়ালার প্রায় আশি বছর বয়েস হয়েছিল, তার নিজের ঘর সংসার জমজমাট ছিল, শুধু মোহের বশে ধর্মান্তরিত হয়ে মিস জুলেখার পাণিগ্রহণ করেন।
তবে সে অন্য কথা।
প্রসঙ্গটা উঠল এই কারণে যে পটললাল পাল ছিলেন আগরওয়ালা সাহেবের টাউট। তিনিই আগরওয়ালা সাহেবকে জুলেখার কাছে নিয়ে আসেন এবং তার বিবাহের সবরকম বন্দোবস্ত করেন।
পটললালের বয়স যদিও মিস জুলেখার থেকে অন্তত আট-দশ বছর কম হবে তবু আগরওয়ালার মৃত্যুর পর জুলেখা স্থির করলেন, আর বুড়োহাবরা নয়, কখন দুম করে মরে যায়। কিছু ঠিক নেই, তার চেয়ে পটললাল পালের মতো চনমনে যুবকই স্বামী হিসেবে ভাল।
পটললালের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরে পুনর্বার হিন্দু হয়ে মিস জুলেখার মনে সম্প্রতি খুব ধর্মভাব দেখা দিয়েছে। এতকাল যা করেননি, এই বিয়ের পর থেকে তিনি শাঁখা সিঁদুর পরতে লাগলেন। মঙ্গলবারে জয়মঙ্গল ব্রত পালন করে সারাদিন উপোস করতে লাগলেন, তাতে অবশ্য ভালই হল, কিছুটা অতিরিক্ত মেদ ঝরল, এ বয়েসে সেটা দরকার।
শুধু শাঁখা-সিঁদুর বা উপোস দেয়া নয়, প্রতি লক্ষ্মীবারে অর্থাৎ বৃহস্পতিবারে মিস জুলেখা লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ করে লক্ষ্মীর আরাধনা করতে লাগলেন। ফুল, চন্দন, প্রসাদ সব কিছু দিয়ে লক্ষ্মী ঠাকরুনের পুজো হতে লাগল। খাটের পিছনে এক চিলতে জায়গায় একটা বার্নিশ করা কাঠের সিংহাসনে লক্ষ্মীর ফটো বসিয়ে প্রতিদিন সকালে ধূপধুনো, শঙ্খ রবে বন্দনা শুরু হল। সন্ধ্যারতিটা অবশ্য সম্ভব হত না, পেশার তাগিদে তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হত, মঞ্চে বা বারে।
শাঁখা নিয়ে একটু অসুবিধে হয়েছিল। হাতে শাঁখা পরে ক্যাবারে নাচ একটু বেমানান। কিন্তু দেখা গেল উত্তর কলকাতার এ জাতীয় নাটকের দর্শকেরা এসব নিয়ে মোটেই মাথা ঘামান না, তারা শাখা দেখতে আসেননি, তারা নাটকও দেখতে আসেননি, তারা মিস জুলেখাকে, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখতে এসেছেন দাম দিয়ে টিকিট কেটে। শাখা নিয়ে তারা মোটেই বিচলিত নন, একেবারে মাথা ঘামালেন না।
সিথির সিঁদুর নিয়ে অবশ্য কোনও অসুবিধা হয়নি। কারণ মিস জুলেখা একটা সোনালি রঙের পরচুলা পরে নাচেন, তাতেই সিঁদুর সমেত মাথার চুল ঢাকা পড়ে যায়।
