অনিদ্রা, গরম, রহস্য ও উত্তেজনা চারে মিলে একটু ঘোরের মধ্যে আছেন সহদেববাবু। অনেক নেশা করলে কোনও কোনও সময়ে পরেরদিন সকালেও এরকম ঘোর থাকে। তবে ময়দানে খোলা হাওয়ায় হেঁটে এখন একটু ভাল লাগছে।
থিয়েটার রোড আর চৌরঙ্গির মোড়ে এক ডাবওয়ালা বসে। এই সাতসকালেই তার ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। ময়দান ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রত্যাগত ভ্রমণকারীরা কেউ কেউ এখানটায় দাঁড়িয়ে। সুনির্মল কচি নারিকেলবারি পান করেন।
ডাবওয়ালাকে চেনেন সহদেববাবু। মাঝেমধ্যে একটা ডাব এর কাছ থেকে কিনে খান। আজকেও একটা খেলে ভাল হত, ডাবওয়ালার কাছে গিয়ে সহদেববাবু দাঁড়ালেন। লোকটাও তখন ডাবের কাঁদি গুছিয়ে সাজাচ্ছে।
সহদেববাবু দেখলেন, এ লোকটা পুরনো ডাবওয়ালা নয়। সে লোকটা লুঙ্গি পরত, সঙ্গে রঙিন ফতুয়া। বোধহয় দেশে গেছে। তার অবর্তমানে নতুন লোকটা এখন হয়তো কিছুদিন ব্যবসাটা চালাবে।
এই নতুন লোকটা মোটেই ডাবওয়ালা টাইপের ষণ্ডা চেহারার নয়। রোগা, পরনে কালো ফুলপ্যান্ট, লাল স্পোর্টস গেঞ্জি। হাতে ঘড়িও রয়েছে। তা ছাড়া দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো ক্ষীণ
স্টাইলিস গোঁফ, ব্যাকব্রাশ চুল। দেখে রাস্তার ফেরিওয়ালা বলে ভাবা কঠিন।
লোকটির কাছে গিয়ে একটা ডাব চাইলেন সহদেববাবু। ডাবের কাদির পাশে রাখা একটা চটের থলের মধ্যে লোকটা হাত ঢুকিয়ে কী খুঁজল, তারপর বলল, ডাবকাটার কাটারি দেখছি নেই।
সহদেববাবু পুরনো লোক, সমস্যাটা জানেন। ডাব বিক্রি হয়ে গেলে বিকেলে ফেরার সময় আগের লোকটা ওপাশের ষোলোতলা বাড়িটার কেয়ারটেকারের কাছে দা জমা রেখে যেত। পরেরদিন সকালে সতেরোতলায় চিলেকোঠায় যেখানে ওই কেয়ারটেকার থাকে সেখানে গিয়ে দা-টা ফেরত নিয়ে আসত। এর বিনিময়ে কেয়ারটেকারবাবু দৈনিক একটা ডাব বিনামূল্যে পান করতেন।
সহদেববাবু এই ব্যাপারটা নতুন লোকটিকে বললেন। লোকটি বলল, ও তাই বলুন। ডাবওয়ালা তো এ কথা আমাকে কিছু বলেনি।তারপর, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে কাটারিটা নিয়ে আসছি, এই বলে লোকটা ষোলোতলা বাড়ির দিকে দ্রুত পা চালিয়ে চলে গেল।
লোকটা চলে যাওয়ার পর সহদেববাবুর খেয়াল হল পুরনো ডাবওয়ালাটা দেহাতি হিন্দিতে কথা বলত, আর এই লোকটা পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছে।
এক হিসেবে খুশিই হলেন সহদেববাবু, তা হলে বাঙালি যুবকেরা এখন রাস্তায় ডাবের ব্যাপারির ব্যবসাও করছে। কিছু না করার চেয়ে, চুরি জোচ্চুরি করার চেয়ে এ কাজ ঢের ঢের ভাল। হাজার হলেও স্বাধীন ব্যবসা তো।
লোকটিকে মনে মনে প্রশংসা করলেন সহদেববাবু। কিন্তু লোকটি যে কাটারি আনতে গেল, সেই যে গেল আর তো ফেরে না।
এদিকে রাস্তায় ওই বহুতল বাড়িটার সামনে কীসের যেন রীতিমতো সোরগোল শুরু হয়েছে। চিৎকার হই-হল্লা ক্রমশই বাড়ছে।
ডাবের লোকটি নিশ্চয় ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়েছে। সহদেববাবু এবার একটু বিরক্ত হলেন, এই জন্যেই বাঙালির ব্যবসা হয় না। ডাব বেচা বন্ধ করে রাস্তায় হট্টগোল লিপ্ত হলে কচু ব্যবসা হবে।
রাগ করে, ডাব না খেয়েই সহদেববাবু বাড়ির পথ ধরলেন।
পথে যেতে যেতেই শুনলেন একটা ডাকাত মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে ওই ষোলোতলা ফ্ল্যাট বাড়িটায় ঢুকেছিল, লিফটে করে ওপরে উঠে যাচ্ছিল। আজকাল খুব সকালের দিকে এ ধরনের ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে এরকম রাহাজানি প্রায়ই হচ্ছে।
সুখের কথা, লিফটটা ছাড়তে না ছাড়তেই লোডশেডিং হয়ে ডাকাতটা লিফটের মধ্যে আটকিয়ে যায়।
রাস্তা থেকেই ডাকাতটাকে দেখা যাচ্ছে। একতলার, মানে গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটু উঁচুতে লিফটের মধ্যে কোলাপসিবল গেটের ফাঁকে লোকটার গলা অবধি দেখা যাচ্ছে। পরনে কালো প্যান্ট, লাল গেঞ্জি, হাতে কাটারি।
জানা গেল, পুলিশে ফোন করা হয়েছে, এখনই পুলিশ আসছে।
কিন্তু সহদেববাবুর কেমন মনে হল, এ তো সেই রাস্তায় ডাবওয়ালাটা। লাল স্পোর্টস গেঞ্জি, কালো ফুলপ্যান্ট, হাতে কাটারি। নিশ্চয়ই লোকটা কাটারি নিয়ে নেমে আসছিল সেই সময় আটকিয়ে গেছে। ওঠার সময় আটকায়নি, তখন কাটারি কোথায় পাবে।
এখনই পুলিশ এসে যাবে। লোকটাকে ধরে নিয়ে যাবে। সারাদিন ধরে ফুটপাথে ডাবের কাঁদি পড়ে থাকবে। লোকটা কবে ছাড়া পাবে কে জানে। এক এই বাড়ির কেয়ারটেকার ওকে রক্ষা করতে পারে।
বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে সহদেববাবুর মনে হল এ ব্যাপারে তারও একটু দায়িত্ব আছে। তার জন্যেই লোকটি কাটারি আনতে গিয়েছিল। গোয়েন্দা দপ্তরের সঙ্গে সহদেববাবুর ভালই সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সাধারণ পুলিশেরা শখের গোয়েন্দাদের মোটেই পছন্দ করে না। দুয়েকবার সহদেববাবু সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন।
আজকে গোলমালের মধ্যে মাথা গলালে পুলিশ হয়তো তাকেও জড়াবে। তার যে গোয়েন্দা দপ্তরে সরাসরি যোগাযোগ আছে, সেখানে যে তার বেশ খাতির, তার পক্ষে সব পুলিশকে সেটা জানানো সম্ভব নয়। তা ছাড়া পটললাল পালের অন্তর্ধান রহস্যের অবিলম্বে সমাধান করতে হবে। সেই সূত্রে মিস জুলেখার সঙ্গে আজ বিকালবেলাতেই আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। সুতরাং আপাতত পুলিশ এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। ঝুট ঝামেলায় জড়িয়ে লাভ নেই।
০২. মিস জুলেখা ওরফে শ্রীমতী লেখা ভট্টাচার্য
মিস জুলেখার নাম শুনে যদি কেউ ধরে নেন যে তিনি কোনও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান তরুণী তবে তিনি খুব ভুল করবেন।
