বহু খেটে তিনি একটা যাত্রাপালা লিখেছিলেন, মহাভারতের কাহিনি নিয়ে। সেই কাহিনির নাম ছিল, আমি কৌরব, আমিই পাণ্ডব আজকালকার দিনে ওইরকম একটা পালা লিখলে তিনি খ্যাতি ও অর্থ দুই-ই পেতেন, অনায়াসেই পেতেন।
গ্রাম্য যাত্রাকার জগন্নাথবাবুর সেরকম সৌভাগ্য অবশ্য হয়নি কিন্তু মহাভারত নিয়ে পালা লিখে মহাভারতের কাহিনিতে তার হৃদয় ও মন নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল।
ওই আমি কৌরব, আমিই পাণ্ডব নামক তার স্বরচিত পালায় তিনি পাণ্ডুরাজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। কেমন অভিনয় করতেন তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই কিন্তু আসল কথা হল তিনি নিজের বাস্তব জীবনেও পাণ্ডুরাজা বনে গেলেন।
পরপর চারটি পুত্রসন্তান জন্মেছিল জগন্নাথবাবুর স্ত্রীর গর্ভে। তাদের নামকরণ হল যথাক্রমে যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন এবং নকুল।
প্রথমে তিনটি সন্তান জন্মানো পর্যন্ত তিনি তাঁর স্ত্রীকে কুন্তী বলে ডাকতেন, চতুর্থ সন্তান নকুল জন্মানোর পর তিনি সেই স্ত্রীকে মাদ্রী বলে ডাকা শুরু করলেন। মধ্যে একবার জগন্নাথবাবুর মাথায় এমন বুদ্ধিও ঢুকে গিয়েছিল যে তিনি দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহণ করবেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম দেবেন মাদ্রী, এমন মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন সফল হয়নি। প্রথমা স্ত্রী, মানে সহদেববাবুর মাকে তিনি অসম্ভব ভয় পেতেন, অপরিসীম নির্যাতনের ভয়ে তিনি পরেরবার বিয়ে করতে এগোননি, এগোতে সাহস পাননি। ফলে বাধ্য হয়েই একই স্ত্রীকে প্রথমে কুন্তী এবং পরে মাদ্রী বলে সম্বোধন করতেন।
কিন্তু এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার ঘটল।
জগন্নাথবাবু পঞ্চম পুত্র জন্মানোর আগেই একদিন মধ্যরাতে আমি কৌরব, আমিই পাণ্ডব যাত্রাপালায় তৃতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্যে দেহরক্ষা করলেন। মাদ্রীর মৃত্যুর পরে তাঁর নিজের বুকে দুবার করাঘাত করার কথা ছিল, তিনি নিজেই এই নির্দেশ রচনা করেছিলেন তার পালায়।
কিন্তু সেদিন উত্তেজনাবশত তিনি ছাব্বিশবার বুকে করাঘাত করেছিলেন, এবং সেটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। ওই সময়ে তার স্ত্রীর সন্তান-সম্ভাবনা না থাকায় সহদেবের আর জন্মগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
পরিণত বয়সে নকুল শুকুল যখন যথাক্রমে ডাক্তারি ও গোয়েন্দাগিরি শুরু করলেন, তিনি ভেবে দেখলেন যে নাম বদলানো অবশ্যই জরুরি। এ কথাটা তার মাথায় এল যে তারা পাঁচ পাণ্ডব না হয়ে চার পাণ্ডব হয়েছেন, পঞ্চম পাণ্ডব যার হওয়ার কথা ছিল সে হল সহদেব, তার যমজ ভ্রাতা হয়ে যার জন্মানো উচিত ছিল। যমজ মানে একই লোক প্রায় বলা যায়, সুতরাং যে নকুল সেই সহদেব হতে পারে।
এইরকম জটিল চিন্তার পরিণতি দাঁড়াল যে নকুল ভাবতে লাগলেন আমার নামও তো সহদেব হতে পারত, আমি কেন সহদেব হব না। সহদেব নামটা ভালই, তা ছাড়া নকুল শুকুলের অন্ত্যমিল থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়।
এই সময়ে চারদিকে আদালতে এফিডেভিট করে নাম-পদবি বদলানোর ধূম চলছে। খবরের কাগজের পাতায় সারি সারি নাম পদবি বদলের বিজ্ঞপ্তি। ব্যারাকপুরের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে এফিডেভিট করে ভ্যাবল চোংদার শ্রীযুক্ত উত্তমকুমার হয়েছেন। আলিপুর আদালতে হলফনামা করা হয়েছে যে, আমি শ্যামশুল হক আজ হইতে নজরুল ইসলাম হইলাম।
কেউ কেউ নিজের নামই শুধু নয়, বাবার নাম পর্যন্ত পালটিয়ে দিয়েছে, দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, আমি খগারাম চট্টরাজ পিতা নগারাম চট্টরাজ সাকিন বাসুদেবপুর, ডাকঘর বাসুদেবপুর ব্যাঙ্কশাল কোর্টের এফিডেভিডবলে খগেন চট্টোপাধ্যায় পিতা নগেন চট্টোপাধ্যায় হইয়াছি।
বাবার নাম বদলানোর অবশ্য প্রয়োজন পড়েনি নকুল শুকুলের। তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে মাত্র পঁচিশ টাকা খরচ করে শেয়ালদা কোর্টে গিয়ে এফিডেভিট করে এলেন। ব্যাপারটা আদালতের আঙিনায় রীতিমতো জলভাতের মতো হয়ে গেছে। আগেই টাইপ করা আছে স্ট্যাম্প পেপারে, শুধু শূন্যস্থানে বর্তমান নাম এবং আকাঙিক্ষত নাম, সেইসঙ্গে ঠিকানা ইত্যাদি বসিয়ে দিলেই হল। তারপর হাকিমের সামনে একজন উকিল সনাক্ত করবে। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে কাজটা সারা হয়ে গেল। রাতারাতির চেয়েও তাড়াতাড়ি নকুল শুকুল সহদেব শুকুল হয়ে গেলেন।
কথায় বলে মানুষের লোভের শেষ নেই। সহদেব শুকুলে পরিণত হয়েও নকুলবাবুর মনে সুখ নেই। এবার নাম নয়, পদবি বদলের দিকে ঝোঁক পড়ল তার। পৈতৃক শুকুল পদবিটা বিসর্জন দিয়ে একটা নতুন পদবি নিতে হবে। অবশেষে তিনি নিজেই অনেক ভেবেচিন্তে স্থির করলেন শুকুল পদবিটা হেঁটে শুক করলেই বেশ মর্ডান হয়ে যাবে।
নকুল শুকুল থেকে সহদেব শুক হতে আরেকটা এফিডেভিট লাগল। প্রথমেই তার মাথায় ব্যাপারটা খেললে একটা এফিডেভিটেই ঝামেলা মিটত। আরেকবার শেয়ালদা আদালতে পঁচিশ টাকা এবং দুঘণ্টা সময় ব্যয় করে সহদেব শুকের আবির্ভাব হল।
.
গোয়েন্দাপ্রবর ডাক্তার সহদেব শুকের এই সংক্ষিপ্ত অথচ প্রয়োজনীয় পূর্ব বৃত্তান্তের পর এবার আজকের সকালের ঘটনায় ফেরা যাক।
ভিক্টোরিয়ার সামনে থেকে প্রাতভ্রমণ সেরে কড়েয়া রোডের দিকে ফিরছিলেন সহদেব। একটু অন্যমনস্কই ছিলেন তিনি। থাকারই কথা। মাথার মধ্যে ঘুরছে মিস জুলেখার স্বামী পটললাল পালের রহস্যময়ভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ, সেই সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় সরোজিনী মঞ্চে যৌবনের লীলা নাটকে মিস জুলেখার উদ্দাম, মোহময়ী নৃত্যের চমক-ঠমকগুলি, দৈহিক মোচড়গুলি ছেঁড়া ছেঁড়া ছবির মতো চোখের সামনে এখনও ভাসছে।
