এখন থেকে মধুবালা তার হ্যান্ডব্যাগে সহদেব ডাক্তারের ওষুধ এক শিশি রেখে দেয়। রিহার্সালের আগে এক ডোজ খেয়ে নেয়। তারপর অনায়াসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেসে যায়। হাসতে হাসতে লাট হয়ে যায়।
মধুবালার ইচ্ছে ছিল যে একদিন তার রিহার্সাল দেখতে সহদেব ডাক্তারকে ডাকে। কিন্তু তিনু কর্তার ভয়ে সেটা সাহস পায়নি।
পটললাল মধ্যে একদিন এসেছিলেন। তিনি কটক চলে যাচ্ছেন নিতাইবাবুর খোঁজে, সেখানে ওড়িয়া যাত্রায় ভাগ্যান্বেষণ করবেন। বলে গেলেন, মধুবালা রইল। আপদে বিপদে পড়লে দেখবেন।
মধুবালা অবশ্য আর আসেনি। কিন্তু তাতে জিতেন্দ্রিয় ডাক্তার সহদেব শুকের কিছু আসে যায় না। তিনি আবার কেবল টিভিতে আসল মধুবালার পুরনো ছবি দেখছেন আর গান রচনা করছেন। এই তো কাল রাতেই লিখেছেন,
নিজের মনে নিজে নিজেই
করছি আমি জেরা,
পুরনো মধু নতুন মধু
কোন মধুটি সেরা?
পটললাল ও মিস জুলেখা
ভূমিকা
বহুবিবাহ এখন আর রীতিসম্মত নয়। সমাজে এমন অনেক পুরুষ, এমনকী মহিলাও আছেন যাঁরা জীবনে বেশ কয়েকবার বিয়ে করেছেন। কিন্তু একসঙ্গে একাধিক স্বামী বা স্ত্রী থাকা আইনসিদ্ধ নয়। এখন বিয়ের পরে প্রতিটি বিয়ের আগেই পূর্ববর্তী বিয়ের আইনত বিচ্ছেদ না করে নতুন বিয়ে আইনের চোখে অসিদ্ধ।
তবে হলিউডের এক অভিনেত্রীর কথা শোনা যায়, তার এতবার বিয়ে হয়েছে ও বিয়ে ভেঙেছে যে তার হিসেব মিলছে না, দেখা যাচ্ছে যে তিনি যতবার বিয়ে করেছেন তার চেয়ে একবার বেশি ডিভোর্স করে বসে আছেন।
পটলাল ও মিস জুলেখার এই রহস্য কাহিনিও বহুবিবাহ জড়িত। তবে কোনও পরিচিত বা অপরিচিত স্ত্রী বা পুরুষ কাউকেই আহত করা এই কাল্পনিক গল্পের উদ্দেশ্য নয়। কয়েকটি চরিত্র বেছে নিয়েছি। নেহাতই রচনার প্রয়োজনে, বাস্তব জীবনের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। কোনও চরিত্রই কোনও জীবিত বা মৃত ব্যক্তির ছায়াবলম্বনে গঠিত নয়।
০১. নকুল শুকুল ওরফে ডা. সহদেব শুক
আজ কয়েকদিন হল ভয়াবহ গরম পড়েছে। কলকাতায় এত গরম বহুকাল পড়েনি। বৈশাখের শেষদিকে অল্প বৃষ্টি হয়েছিল। পুরো জ্যৈষ্ঠ মাসটা খা-খা গনগন করে জ্বলছে। আবহাওয়া দপ্তর বলছে বৃষ্টি নামতে এবার আষাঢ় মাস এসে যাবে।
এই গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে মর্মান্তিক লোডশেডিং। তবে লোডশেডিংয়ে ডাক্তার সহদেব শুকের খুব অসুবিধে হয় না। তার নিজের ভাল ইনভারটার আছে। রাতে ঘুমের মধ্যে যদি লোডশেডিং হয়ে যায় পাখা ঠিক মতোই ঘুরতে থাকে, সহদেব টেরও পান না।
কিন্তু পাখা ঘুরলেই তো হল না, পাখার বাতাসে এই গরমে আর সেই স্বস্তি নেই। শেষরাতের দিকে পাখার বাতাস পর্যন্ত গরম হয়ে যায়।
সারা শরীর ঘামে ভেজা। বিছানায় চাদর প্যাঁচ প্যাঁচ করছে। ঘুম থেকে উঠে পাখাটা বন্ধ করে দিয়ে একটু জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ান সহদেব। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় একটু আরাম লাগে। তারপর বাথরুম-টাথরুম সাঙ্গ করে শর্টস আর রঙিন গেঞ্জি পরে তিনি ময়দানের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন।
কড়েয়া রোডের এই বাড়িতে সহদেব একাই থাকেন, বাড়ির লোকেরা মেদিনীপুরের ভবগ্রামে দেশের বাড়িতে। এতে সুবিধেই হয়। ডাক্তার সহদেব শুক একজন প্রতিষ্ঠিত হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারই শুধু নন, কৃতবিদ্য গোয়েন্দা। তবে খুন, ডাকাতি, মারামারির গোয়েন্দাগিরি মোটেই পছন্দ নয় সহদেববাবুর। রক্ত দেখলে তার মাথা ঝিমঝিম করে। তিনি জাল-জোচ্চুরি, অপহরণ, কিডন্যাপিং ইত্যাদির তদন্তে পারদর্শী।
কড়েয়া রোড থেকে ময়দান কাছে নয়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পর্যন্ত যাতায়াতে প্রায় চার মাইল হয়ে যায়। বেকবাগান দিয়ে বেরিয়ে জগদীশচন্দ্র বসু রোড ধরে থিয়েটার রোড বরাবর হেঁটে যান সহদেব। এটাই তার সারাদিনের ব্যায়াম, মর্নিং ওয়াক।
আজ একটু আগেই উঠে পড়েছেন সহদেববাবু। সারারাত তার ভাল করে ঘুম হয়নি। গতকাল বিকেলেই একটা নতুন কেস এসেছে তাতে, খুবই জটিল আর রহস্যময় কেস, বাংলা থিয়েটারের উদীয়মানা ক্যাবারে নর্তকী মিস জুলেখার স্বামী পটললাল পালকে কে বা কারা পরশুদিন রাতে চুরি করে নিয়ে গেছে। তবে পটললালকে সত্যিই অপরহণ করা হয়েছে না তিনি নিজেই পালিয়েছেন, সে বিষয়ে ডাক্তার সহদেবের মনে বেশ খটকা আছে।
এই খটকাই এই অন্তর্ধান কাহিনির চারপাশে একটা রহস্যের বেড়াজাল ছড়িয়েছে। আর তাই ভাবতে ভাবতে রাতের ঘুম চটে গিয়েছিল সহদেববাবুর।
.
ডাক্তার সহদেব শুকের পূর্বনাম নকুল শুকুল।
নকুল নামটি তেমন অপ্রচলিত কিছু নয়। আমাদের আশপাশে নকুল নামের লোক অনেক সময়েই দেখা যায়। ভবানীপুরের পাড়ায় একসময় একই রাস্তায় দুই নকুল ছিল, যার জন্যে একজনকে বলা হত অহিনকুল আর অন্যজনকে বলা হত মহীনকুল।
সেইরকম শুকুল পদবিটিও তেমন অচেনা কিছু নয়। শুকুল পদবিধারী লোকের সংখ্যা কিছু কম নয়।
কিন্তু দুইয়ে মিলে একটু অসুবিধে হচ্ছিল। নকুল শুকুল নামটি হয়তো অনুপ্রাসের জন্যেই হাস্যকর মনে হয়।
ব্যাপারটা সহদেববাবু টের পেয়েছিলেন কলকাতায় ডাক্তারি করতে এসে। তারপরে যখন শখের গোয়েন্দাগিরি আরম্ভ করলেন, স্পষ্টই অনুভব করলেন এই নকুল শুকুল নামে চলবে না।
এই প্রসঙ্গে দুয়েকটা প্রাচীন কথা বলতে হয়। সহদেববাবুর বাবা জগন্নাথ শুকুল তাদের ভবগ্রামের শখের যাত্রাদলের সভাপতি ছিলেন। নিজে পালাকার ছিলেন, অর্থাৎ যাত্রার নাটক লিখতেন, তা ছাড়া নিজে অভিনয়ও করতেন। পরিষ্কারভাবে বলা উচিত জগন্নাথবাবু যাত্রাপাগল ছিলেন।
