চুপ করে থাকাই এ ক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ বুঝে নিয়ে সহদেববাবু চুপ করে থেকে তিনু কর্তার কথায় হু হু করে সায় দিতে লাগলেন।
তিনুবাবু বলে চললেন, ওই সব বস্তাপচা মাল মশাই, সতীনের ছেলের বড় গলা, সাপের সঙ্গে বাঘিনীর দেখা, ডাইনি আমার শাশুড়ি মা আর চলবে না মশায়। জানেন আমার বইতে দেড়শো কমিক রিলিফ, বাহাত্তুরটা হাসির সিচুয়েশন। তা ছাড়া অন্তত একশো জোক, তারাপদ রায়ের জ্ঞানগম্যি আর শোধবোধ থেকে সাক্ষাৎ টোকা।
সহদেববাবু বলতে যাচ্ছিলেন, ও বই দুটোও আগাগোড়া টোকা। তা না বলে বিনা বাক্যব্যয়ে টেলিফোনটি নামিয়ে রাখলেন। হাস্যরসের রীতিমতো অ্যাকিউট কেস, এই রোগ সারানোর সাধ্য তার নেই।
রোগ সারানোর কথাটা মাথায় আসতেই কিন্তু সহদেব ডাক্তার চলমান হয়ে উঠলেন। তিনি ভুল দিক থেকে কেসটার ব্যাপারে এগোচ্ছিলেন। গোয়েন্দা হিসেবে নয়, একজন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক হিসেবে পুরো ব্যাপারটা দেখতে হবে। মধুবালাকে একজন রোগিণী হিসেবে চিকিৎসা করলে, যার অসুখটা হল হাসলেই হেঁচকি ওঠে সমস্যাটা সমাধান হতে পারে।
যেমন ভাবা তেমনই কাজ। ইংরেজি-বাংলা মোটা মোটা চার ভলিউম মেটিরিয়া মেডিকা আছে ডাক্তার সহদেব শুকের। বহুদিন পরে ধুলো ঝেড়ে সহদেব সেগুলো খুলে বসলেন। সারাদিন ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন, কিন্তু কোথাও পেলেন না হাসলে হেঁচকি উঠলে কী চিকিৎসা করা উচিত সে বিষয়ে কোনও চিকিৎসা, ওষুধপত্রের নির্দেশ।
ক্লান্ত হয়ে বিকেলের দিকে চেম্বারেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন সহদেববাবু। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখেন অন্ধকার হয়ে গেছে। কাজের লোকটিকে ডেকে এক কাপ চা দিতে বললেন আর বললেন, আজ সন্ধ্যায় রোগী দেখব না। রোগীদের বলে দিন ডাক্তারবাবুর শরীর খারাপ করেছে।
সন্ধ্যার একটু পরেই মধুবালা এল। একটা বন্য দেহাতি কালো জলের নদীর মতো সে প্রবেশ করল সহদেববাবুর ড্রয়িং রুমে। নীল ফুল ফুল ছাপ সুতির একটা খাটো ফ্রক পরনে, সেটাও পাতলা কাপড়ের। থই থই করছে যৌবন। সোফায় এসে বসতে হাঁটুর ওপরে উঠে গেল ফ্রকের ঝুল।
সহদেব ভয় পেয়ে গেলেন, কোনও একটা পাগলামি না করে বসি। মধুবালাকে কী বলবেন সেটাও বুঝতে পারছেন না। এমন সময় তার খেয়াল হল ডাক্তার তথা গোয়েন্দা হিসেবে তাঁর একবার যাচাই করে দেখা উচিত মেয়েটার হাসলে কেমন হেঁচকি ওঠে।
মধুবালাকে সহদেব বললেন, একটু হাসো দেখি।
মধুবালা বলল, হঠাৎ হাসব কেন?
সহদেব বললেন, হঠাৎ নয়, হাসলে তোমার কেমন হেঁচকি ওঠে সেটা দেখতে হবে।
মধুবালা বলল, আমার তো হাসিই আসে না।
সহদেব বললেন, তবু একটু চেষ্টা করো।
মধুবালা বলল, পারব না। হেঁচকি উঠবে ভয়ে আমার হাসি আসে না।
ডাক্তার হিসেবে সহদেব ভেবে দেখলেন, যদি এর হেঁচকি ওঠাটা সারিয়ে দেওয়া যায় হাসির অসুবিধেটা নিশ্চয় থাকবে না। হেঁচকির নানারকম চিকিৎসা আছে, সেটা নিয়ে সমস্যা হবে না।
কিন্তু মধুবালা কিছুতেই হাসে না। চোখের কোণে হাসির ঝিলিক ঠোঁটে চাপা হাসি কিন্তু যে হাসি তাকে পালায় হাসতে হবে, যে হাসি হাসলে তার হেঁচকি ওঠে সে হাসি সে কিছুতেই হাসে না। হাসতে গিয়ে থমকে যায়।
সহদেববাবু নানা কায়দা করলেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। তিনি মধুবালাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি সেই বোকা মেয়ের কথা শুনেছ যে সব সময়েই না বলে।
মধুবালা বলল, না।
সহদেববাবু বললেন, তুমিই সেই বোকা মেয়ে।
এই রসিকতাতেও মধুবালা হাসল না। তবে সহদেব ডাক্তারের আন্তরিকতা তাকে স্পর্শ করল। সে বলল, আমাকে কাতুকুতু দিলে আমি হাসতে পারি।
সহদেববাবু খুশি হয়ে বললেন, ঠিক আছে কাতুকুতু দাও।
মধুবালা রাগ রাগ গলায় বলল, নিজেকে নিজে কাতুকুতু দিলে আমার হাসি পায় নাকি। আপনি আমাকে কাতুকুতু দিন।
এই ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা সহদেব ডাক্তার একটু আগেও ভাবেননি, তা হলে এতটা এগোতেন, কিন্তু এখন আর কোনও উপায় নেই। এরই মধ্যে মধুবালা এগিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কী আর করবেন। সহদেব খুবই সংকোচের সঙ্গে মধুবালাকে কাতুকুতু দিতে লাগলেন।
ধীরে ধীরে মধুবালার হাসির বেগ আসতে লাগল। শরীরের যে সমস্ত খাঁজে-ভাঁজে কাতুকুতু দিলে হাসি বেশি পায় সেই সব নিষিদ্ধ জায়গায় মধুবালা সহদেবের হাত চেপে চেপে ধরতে থাকল। তারপর প্রথমে ঝিরঝির বৃষ্টির মতো খিলখিল করে অবশেষে উদ্দাম পাহাড়ি ঝরনার মতো বারবার করে হাসতে লাগল।
আর সেই হাসতে হাসতেই মধুবালার হেঁচকি শুরু হল। আর সে কী হেঁচকি। একের পর এক গমকে গমকে, ধমকে ধমকে বিয়ারের বোতলের ফেনার মতো হেঁচকি তুলতে লাগল মধুবালা।
শেষ পর্যন্ত হেঁচকি আর সামলাতে না পেরে সহদেব ডাক্তারের গলা জড়িয়ে ধরল মধুবালা। ডাক্তারবাবু প্রৌঢ় বটে কিন্তু তিনু কর্তার চেয়ে অনেক যুবক। হেঁচকি তুলতে তুলতে সহদেব। ডাক্তারের গায়ের ওপর এলিয়ে পড়ে গেল মধুবালা।
০৬. অতঃপর
পুরনো মধু নতুন মধু
কোন মধুটি সেরা!
অতঃপর আর কিছুই নয়।
আপনারা যা ভাবছেন তা মোটেই নয়। সহদেব ডাক্তার মোটেই দুর্বল চরিত্রের লোক নন।
তিনি একটু কষ্ট করে মধুবালার হাত ছাড়িয়ে চেম্বারে গিয়ে একটা কড়া ডোজ হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এনে মধুবালাকে খাইয়ে দিলেন। অত্যন্ত তেজি ওষুধ। এক ডোজেই মধুবালার হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়ে গেল। সে চোখ বুজে হেঁচকি তুলছিল। এবার চোখ খুলে বলল, বাবা, যেমন তেজ, তেমন কড়া।
