পটললাল বললেন, শালীন-অশালীন নিয়ে মধুবালা মাথা ঘামায় না। নিজের আনন্দে তো ও হাসে না। ও হাসে পেটের দায়ে।
পেটের দায়ে হাসে? একটু অবাক হলেন যেন সহদেব ডাক্তার।
পটললাল বললেন, আজ্ঞে ঠিক তাই। এবার বাহাদুর অপেরায় মধুবালা সাইন করেছে। বাহাদুর অপেরার বুড়ো কর্তা তিনু পুরকায়েত মধুবালাকে বলে দিয়েছেন, কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি, রতিকলা যা কিছু করতে চাও আমি আছি। তিনুবাবু খুব রক্ষণশীল ব্যক্তি, তাঁর কথা হল স্টেজে ওসব বেলেল্লাগিরি চলবে না। এবার তিনি যে নতুন পালা নামাচ্ছেন তার নাম, রানি আসে, হাসতে হাসতে।
রানি আসে হাসতে হাসতে বইয়ের পাতায় পাতায়, পরতে পরতে হাসি। পড়তে গিয়ে প্রম্পটার থেকে পরিচালক পর্যন্ত হেসে গড়িয়ে পড়ে।
ওই নাটকেরই মুখ্য স্ত্রী চরিত্রে রানির ভূমিকা পেয়েছে মধুবালা। রীতিমতো অট্টহাসির পার্ট। এটাই মধুবালার জীবনে প্রথম বড় সুযোগ।
মধুবালা কিন্তু একবারের জন্যেও তিনুবাবুকে বলেনি বা জানতে দেয়নি যে হাসলে তার হেঁচকি ওঠে। তা হলে তিনুবাবু হয়তো তাকে নায়িকার ভূমিকা থেকে কিংবা পালা থেকেই সরিয়ে দেবেন।
ওদিকে নায়িকার পার্ট করতে গিয়ে যদি প্রাণ খুলে, গলা খুলে হাসতে হয় তা হলে প্রথম দৃশ্য থেকেই মধুবালার হেঁচকি উঠতে থাকবে, দ্বিতীয়-তৃতীয় দৃশ্য নাগাদ হেঁচকি তুলতে তুলতে স্টেজে বসে পড়বে। পুরো পালা বরবাদ হয়ে যাবে।
মধুবালার সমস্যাটা সত্যিই জটিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলেন পটললাল।
কিন্তু মধুবালা কি কাউকে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার সুযোগ দেয়। সে এমন চুলবুল করতে লাগল যে তাতে সহদেব ডাক্তারের কেন পুরাকালের মুনি-ঋষিদের ধ্যানভঙ্গ হয়ে যেত। এই হাঁটু মুড়ে বসছে, পরক্ষণেই মাথার ওপরে হাত তুলে দেহবল্লরী বিকশিত করে এলো খোঁপা ঠিক করছে।
অবশেষে সহদেব ডাক্তার বললেন, আমাকে একদিন সময় দিতে হবে। আপনারা কালকে আসুন পটললাল বাবু। তবে আমাকে একটু ওই আপনাদের বুড়ো কর্তা তিনুবাবুর ঠিকানা আর ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাবেন।
তিনুবাবুর ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিয়ে চলে যাওয়ার সময় পটললাল বললেন, তিনুকর্তার কাছে বিশেষ কিছু সুবিধে হবে না স্যার।
সহদেব বললেন, দেখি।
মধুবালার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে যেতে পটললাল আরেকটা কথা বললেন, স্যার, কালকে আমার একটু অসুবিধে আছে।
সহদেব বললেন, ঠিক আছে, পরশু আসুন।
পটললাল বললেন, কিন্তু স্যার, মধুবালার ব্যাপারটা একটু জরুরি। দুয়েকদিনের মধ্যেই ওর পালার মহড়া শুরু হয়ে যাবে।
একটু বিরক্ত হয়ে সহদেব ডাক্তার বললেন, আমাকে কী করতে হবে বলুন।
পটললাল মধুবালার সঙ্গে জনান্তিক একটু কথা সেরে নিয়ে বললেন, স্যার, ও যদি কাল সন্ধ্যাবেলা একলা আসে?
সন্ধ্যায় মধুবালা একাকিনী। একটু ইতস্তত করে তারপর ভয়ের এবং দ্বিধার ভাবটা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সহদেব ডাক্তার বললেন, ঠিক আছে।
০৫. মধুর সমাধান
তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত…
নেহি তুছকো কোই হোঁশ
তুছ পর যৌবনকা যোশ যোশ…
হৃদয়ের মধ্যে একটা দেহজ আবেগ বহুদিন পরে জাগিয়ে দিয়ে মধুবালা পটললালের সঙ্গে চলে গেল। এক কালে জুলেখার সাহচর্যে এরকম হয়েছিল। তখন বয়েস পাঁচ বৎসর কম ছিল।
এ বয়েসে কি আর এসব পোষায়।
মনটাকে শান্ত রাখার জন্যে মধুবালাকে বাদ দিয়ে মধুবালার সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন সহদেব সারা দিন, সারা সন্ধ্যা ভাবলেন।
বার কয়েক চিৎপুরে তিন পুরকায়েতকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাইনে পেলেন না। তিনু কর্তা রবিবার ফোন ধরেন না, কোনও যন্ত্রপাতি স্পর্শ করেন না।
সহদেব ডাক্তার এটা বুঝেছেন তাঁর এই মামলার নিষ্পত্তির চাবি কাঠি তিনু কর্তার হাতে রয়েছে। তিনু কর্তাকে যেকোনও ভাবে হাসির পালা করা থেকে নিরস্ত করতে পারলে মধুবালাকে রক্ষা করা যায়।
চিন্তা করতে করতে সহদেব ডাক্তারের রাতের ঘুম চটে যায়। শেষ রাতের দিকে হালকা মতন একটু ঘুম আসে। একটা গোলমেলে স্বপ্ন দেখে সহদেব ডাক্তারের স্বপ্ন ভেঙে গেল। তিনি সমুদ্রের নীল নীল বড় বড় ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে যাচ্ছেন, মধুবালা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তীরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
আজ বহুদিন পরে সকালবেলা সহদেব হাঁটতে বেরোলেন। ঘণ্টাখানেক খোলা বাতাসে মাথা ও শরীর ঠান্ডা করে বাড়ি এসে প্রথমেই ফোন করলেন তিনু পুরকায়েতকে।
তিনু কর্তা নিজেই ফোন ধরলেন। গাঁজা খাওয়া খ্যান খ্যান গলা। অনেকটা সাবেক দিনের নবদ্বীপ হালদারের মতো।
সহদেববাবু নিজের পরিচয় গোপন রেখে বললেন, আমি সাপ্তাহিক এত রঙ্গ বঙ্গ দেশে পত্রিকার সম্পাদক বলছি। আপনার নতুন পালার খবর নিচ্ছিলাম।
তিন কর্তা পত্রিকার লোক উপযাচক হয়ে খবর নিচ্ছে শুনে বেশ খুশি হলেন বলে মনে হল। বললেন, আমরা এবার মারমার কাটকাট, দম ফাটা হাসির পালা করছি। রানি আসে, হাসতে হাসতে।দর্শকেরা চেয়ার থেকে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে যাবে। এমন একটি সুরসিকা নায়িকা পেয়েছি মশায়, কী বলব। দেহাতের আসল চালানি জিনিস।
গম্ভীর হয়ে সহদেব ডাক্তার বললেন, যা দিনকাল পড়েছে কর্তা। হাসির পালা কি চলবে? জীবনে কোথাও তো আর হাসি নেই।
তিনু কর্তা বললেন, সেই জন্যেই তো চলবে। লোকে একটু হাসুক। আর কতকাল পকেটের পয়সা খরচ করে লোকে গোমড়া মুখে বুক চাপড়ানি, শাখা ভাঙা, সিঁদুর মোছা দেখবে।
