সহদেববাবুরও তাড়াতাড়ি আছে। ছুটির দিনের সকাল হলেও এগারোটা বেজে গেছে, এর পরে স্নান খাওয়া আছে, বিশ্রাম আছে। সহদেব ডাক্তার রবিবার বিকেলে অল্প কিছুক্ষণ চেম্বারে বসেন, রোগী দেখেন। বিকেল চারটে বাজার আগে থেকেই রোগী আসতে থাকে।
তবে পটললাল মধুবালার বিষয়ে বলা আরম্ভ করার আগে সহদেব ডাক্তারের দুয়েকটা জিজ্ঞাসা ছিল, তিনি পটললালের কাছে জানতে চাইলেন, মিস মধুবালার নাম কি পিতৃদত্ত? বাবা-মার দেওয়া?
পটললাল ঘাড় নেড়ে বললেন, না। না স্যার। আমাদের লাইনে সন্ন্যাসীদের মতো বাড়ির নাম চলে না। নতুন নাম দেওয়া হয়।
সহদেববাবু স্মৃতি রোমন্থন করে বললেন, হ্যাঁ। আপনার গিন্নি তো শ্রীলেখা থেকে জুলেখা হয়েছিলেন।
পটললাল তাড়াতাড়ি সহদেববাবুকে থামিয়ে বললেন, জুলেখার কথা বাদ দিন স্যার। মধুবালার কথা বলছি। ও হল বিহারের দেহাতি মেয়ে। মধুপুরের কাছে বাড়ি ছিল। আগে নাম ছিল, বোধহয়, রাধা সিং। ডাক নাম ছিল বাবলি। এই বলে পটললাল মধুবালার দিকে তাকাল।
মধুবালা অপাঙ্গে হেসে সম্মতি জানাল। সে সহদেব ডাক্তারের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে রইল।
মধুবালা চশমাটা খুলে নিয়েছে। তার মুখের দেহাতি বন্যতা, শ্যামকায়ার নিখুঁত বাঁধন রীতিমতো চিত্ত বিভ্রমকারী, মোহ সঞ্জারী। ঘনীভূত এই যৌন রসায়নের দিক থেকে সহদেব ডাক্তার তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলেন।
পটললাল বললেন, বাবলি মধুপুর থেকে এসেছে তাই নাম রাখা হয়েছে মধুবালা। যাত্রা পিতামহ দুকড়ি দত্ত মশায় নিজে এই সব নাম দেন। আজকাল পুরনো দিনের হিরোইনদের নাম চলছে। দুকড়ি দত্ত যে যে জায়গায় থেকে এসেছে জায়গার নামে তার নাম মিলিয়ে দেন। বাবলি মধুপুর থেকে এসেছে তাই নাম হয়েছে মধুবালা। নাগেরবাজার থেকে একটা মেয়ে এসেছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে নার্গিস। পুরসুরা থেকে খুকু এসেছে, সে এখন সুরাইয়া, দারুণ নাম করেছে।
আধুনিক নার্গিস, সুরাইয়া, মধুবালাদের এই নাম বৃত্তান্ত শুনে গোয়েন্দাপ্রবর চমকৃত হলেন। একটু থেমে থেকে তারপর বললেন, এইবার মধুবালার সমস্যাটা বলুন।
দেখা গেল, মধুবালার সমস্যাটা অভাবনীয়। কারও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে সহদেব ডাক্তার কখনওই ভাবেননি।
যাত্রায় করুণ রসের খুব প্রাবল্য। মধুবালার তাতে কোনও অসুবিধে হয় না। সে ইচ্ছে করলেই কপাল চাপড়িয়ে কাঁদতে পারে। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে গড়াগড়ি যেতে পারে, মুহূর্তের নোটিশে চোখে জল আনতে পারে।
বীর রস বা রৌদ্ররসেও বেশ পারঙ্গমা। সে চিৎকার করে খামোশ কিংবা চোপরও বললে যাত্রার আসরে ঘুমন্ত শিশুরা কঁকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জেগে ওঠে।
এসব তেমন বড় কথা নয়। পালার আসরে সব ছোটবড় অভিনেতাই এটা করে, করতে পারে।
কিন্তু মিস মধুবালার প্রধান উৎকর্ষ হল শৃঙ্গার রসে বা আদি রসে। প্রেম ও প্রণয়ের দৃশ্যে শুধু নয়, ঘনিষ্ঠ শয্যা দৃশ্যে। ধর্ষণ ও বলাৎকারের দৃশ্যে। মধুবালার নাকি তুলনা হয় না। ব্যভিচারিণী, বিপথগামিনী রমণীর ভাল চরিত্র পেলে মধুবালা একেবারে ফাটিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু সকলের তো সব বিষয়ে যোগ্যতা থাকতে পারে না। একেকজনের একেক ব্যাপারে অসুবিধে থাকে।
মধুবালার অসুবিধে হল হাস্যরস নিয়ে। মধুবালা হাসতে পারে না।
মধুবালা বিষয়ে বক্তব্য এই পর্যায়ে আসার পর হঠাৎ পটললালের কী খেয়াল হল। সহদেব ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলেন, স্যার মধুবালার একটা বেডসিন দেখবেন? আপনি ওই বড় সোফাটার ওপরে চলে যান, গিয়ে শুয়ে পড়ুন, মধুবালা আপনার সঙ্গে বেডসিন করে দেখাবে।
দেখা গেল মধুবালাও প্রস্তুত। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে বড় সোফার এক পাশে হাত-পা এলিয়ে শুয়ে পড়ল।
সহদেব ডাক্তার রীতিমতো অপ্রস্তুত। জীবনে ছোটখাটো দু-চারটে সিন বা গান যে কখনও করেননি তা নয়, কিন্তু বেডসিন করার মনোবল তার মোটেই নেই। তিনি শশব্যস্ত হয়ে জানালেন, না। না। তার দরকার নেই।
সহদেববাবুর ব্যাপার-স্যাপার দেখে খুবই নিরাশ হয়ে পড়ল মধুবালা। সে ধীরে ধীরে সোফার ওপরে শোয়া অবস্থা থেকে বসা অবস্থায় নিজেকে নিয়ে এল। এই নিয়ে আসা, রীতিমতো সময় নিয়ে, নানা রকম শারীরিক কায়দা কৌশল করে। অ্যাডালট মার্কা সিনেমার নায়িকারা বিশেষ বিশেষ দৃশ্যে যেমন করে, মধুবালাও তাই করল।
গোয়েন্দা বা গীতিকার কিংবা চিকিৎসক যাই হোন না সহদেববাবু রক্তমাংসের মানুষ। তিনি বুঝতে পারলেন এরপর উত্তেজনা দমন করা কঠিন হয়ে যাবে। এরপর হয়তো বেডসিন করার লোভ দেখা দিতে পারে।
তাই উত্তেজনাটা চাপা দেওয়ার জন্যে সহদেববাবু পটললালকে বললেন, মধুবালার আসল সমস্যাটা তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন তো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
পটললাল আর দেরি করলেন না। সরাসরি বলে ফেললেন, হাসলে মধুবালার হেঁচকি ওঠে, হেঁচকি ক্রমাগত উঠতেই থাকে। এমনিতে ছোটখাটো চাপা হাসি, চোখের কোণে কামনা মদির হাসি, ঠোঁটে লালসাময় হাসি। এগুলোতে মধুবালার তেমন অসুবিধে হয় না। কিন্তু হো-হো করে, হা-হা করে, গলা খুলে চেঁচিয়ে হাসলেই মধুবালার হেঁচকি ওঠে।
এ কথা শুনে সরল বালকের মতো সহদেব ডাক্তার বললেন, হো-হো করে, হা-হা করে চেঁচিয়ে হাসার দরকার কী? একজন মহিলার পক্ষে এভাবে হাসাটা মোটেই শালীন নয়।
