প্রতিদিন সকালে চা বিস্কুট খেয়ে পটললাল বাজারের থলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। দুজনের সংসারের দৈনিক বাজার করার দায়িত্ব তার। বাজারের পয়সাটাও তাকেই যে করে তোক জোগাতে হয়। সেটা বর্তমান অবস্থায় পটললালের পক্ষে খুব সোজা কাজ নয়।
পটললালের বহুদিনের অভ্যেস বাজারে ঢোকার মুখে নিত্যরঞ্জন টি স্টলে বসে একটা ডাবল-হাফ চা খাওয়া। ডাবল-হাফ চা আজকাল কলকাতায় দু-চারটি পুরনো দোকান বাদ দিলে, আর পাওয়াই যায় না। তাই একালের পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ডাবল-হাফ হল চায়ের লিকার কম, দুধ বেশি, চিনি বেশি। শক্তি বর্ধক পানীয় এটা। কলকাতারই আবিষ্কার ওই পানীয় বহুদশক ধরে এই শহরের ক্লান্ত নাগরিকদের উজ্জীবিত করেছে।
নিত্যরঞ্জন টি স্টলে পটললাল যে শুধু চা খেতেই যান তা নয়। ওখানে থিয়েটার-যাত্রার লাইনের অনেক তালেবর ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়। কখনও কখনও কাজকর্মের কিছু সুলুক-সন্ধান পাওয়া যায়।
একদিন সকালে বহুকাল পরে নিতাইবাবুর সঙ্গে পটললালের দেখা। নিতাইবাবু কৃতকর্মা লোক। থিয়েটারের প্রম্পটার থেকে যাত্রার মালিক হয়েছিলেন। একবার এক নায়িকার আত্মহত্যার মামলায় ফেঁসে গিয়ে বছর দশেক আগে নিতাইবাবু ফেরার হয়ে যান।
তারপরে এতদিন বাদে তার সঙ্গে এই দেখা। নিতাইবাবু বললেন, তিনি এখন ওড়িয়া যাত্রা করছেন। কটকে অফিস করেছেন। বাংলা যাত্রার মতো অত ঝুট-ঝামেলা নেই। পাবলিক ভাল, অভিনেতা-অভিনেত্রী গোলমেলে নয়। নায়কেরা কথা রাখে।
নিতাইবাবু পটললালের এলেম জানতেন। তিনি পটললালকে কটকে চলে আসতে বললেন। বললেন, যা হোক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
পটললাল নিতাইবাবুর কাছে তার ঠিকানা চাইতে হাতের কাছে কোনও কাগজ না থাকায় চায়ের দোকানের মেঝে থেকে একটা পুরনো খবরের কাগজের ঠোঙা তুলে তার থেকে এক টুকরো কাগজ চৌকো করে ছিঁড়ে নিজের মানিব্যাগ থেকে একটা ছোট ভোতা পেনসিল বার করে কটকের ঠিকানাটা লিখে দিলেন।
পটললাল ঠিকানার কাগজটা পকেটে নিয়ে বাজার করতে চলে গেলেন। বাজার করে বাড়ি ফিরে এসে পকেটে খুঁজতে গিয়ে দেখলেন কাগজটা নেই।
বাজারে পড়ে গেল নাকি। এদিকে পকেটে একটা দু টাকার নোট রয়ে গেছে। এটা হওয়ার কথা নয়। পটললালের দৈনিক বাজারের বাজেট বারো টাকা। দুশো গ্রাম রুই মাছের বাচ্চা ছয় টাকা, তরকারি চার টাকা, শোকলা দু টাকা। দৈনিক টায়ে-টোয়ে বাজার। চা খাওয়ার জন্যে এক টাকার একটা কয়েন আলাদা করে রাখা থাকে।
আজ আবার নিতাইবাবু চায়ের দামটা দিয়ে দিয়েছেন। সেই জন্যে কয়েনটা আছে। সঙ্গে একটা ময়লা, ছেঁড়া দু টাকার নোট।
আজকাল সব দু টাকার নোটেরই এই অবস্থা। এক টাকা, পাঁচ টাকাও তাই। তবে সে নোটগুলো দুর্লভ। ছোটখাটো কেনাবেচা চলছে ময়লা দু টাকার নোটে। ছেঁড়া একেবারে, আশ্চর্য তবুও চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ পটললালের মনে হল নিতাইবাবুর ঠিকানা লেখা খবরের কাগজের ময়লা ঘেঁড়া অংশটা দু টাকার নোট হিসাবে নিজের অজান্তে চালিয়ে দিয়েছেন।
তারপর থেকে পটলবাবুর বুদ্ধি খুলে গেছে। বাসায় খবরের কাগজ রাখা হয় না। রাস্তাঘাটে যেখানে খবরের কাগজের টুকরো, ভেঁড়া ঠোঙা কুড়িয়ে পান তুলে পকেটে করে বাসায় নিয়ে আসেন। সেগুলোকে দু টাকার নোটের মাপে কাটেন তারপরে জলে ভেজান। শুকিয়ে গেলে উনুনের ছাই মাখান। পারলে একটু কেরোসিন তেল, একটু মাছের ঝোল বা উদ্বৃত্ত ডাল ছিটিয়ে দেন, যেদিন যেমন সম্ভব। তারপর তিন ভাঁজ করে চালের হাঁড়িতে রেখে দেন। প্রতিদিন বাজারে যাওয়ার সময়ে সেই হাঁড়ি থেকে গোটা ছয়েক কাগজের টুকরো নিয়ে চলে যান, বারো টাকার বাজার ভালভাবে চলে যায়।
পটললাল কবুল করলেন, আমি জানি, জিনিসটা অন্যায়। কিন্তু স্যার, কখনও ওই বারো টাকার বেশি জোচ্চুরি করি না।
পটললালের কথা শুনে সহদেব ডাক্তার তাজ্জব হয়ে গেলেন। বললেন, এ তো সাংঘাতিক কথা। বাজারের নোট দেখে আজকাল অবশ্য কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু ধরা পড়লে জাল টাকা চালানোর দায়ে আপনার জেল হয়ে যাবে।
পটললাল বললেন, ঠিক জাল টাকা নয় স্যার, কালো টাকা বলতে পারেন। কালো টাকার জন্যে কারও জেল হয় না।
সহদেব কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পটললালের কথায় মধুবালা ফিকফিক করে হেসে উঠল। তার দিকে তিনি কটমট করে তাকাতেই সে তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা কালো চশমা বের করে সেটা চোখে দিল। ঘরের মধ্যে হঠাৎ সানগ্লাস চোখে দেওয়ার কী প্রয়োজন পড়ল সহদেব ডাক্তার বুঝতে পারলেন না।
এদিকে নির্বিকারভাবে চশমাটা চোখে দিয়ে হাতব্যাগ থেকে একটা ছোট গোল আয়না বের করে নিজের চশমা পরিহিতা মুখশ্রী দেখতে দেখতে মধুবালা ভুল সুরে, ভুল হিন্দি উচ্চারণে গাইতে লাগল,
গোরি গোরি মুখমে
কালি কালি চশমা।..
তারপর মধুবালা হঠাৎ গান থামিয়ে পটললালকে এক ধমক দিয়ে বলল, পটলদা বাজে গল্প রেখে এবার আমার কেসটা বলো।
০৪. মধুবালার সমস্যা
রূপ সুহানা লাগতা হ্যায়
চাঁদ পুরানা লাগতা হ্যায়।
মধুবালার আচরণে পটললাল রীতিমতো বিরক্ত বোধ করলেন। কিন্তু সহদেব ডাক্তার এটাও বুঝতে পারলেন যে পটললালের মতো দুর্বল চরিত্রের ব্যক্তির পক্ষে মধুবালার মতো খলবলে যুবতাঁকে আয়ত্তে রাখা কঠিন।
পটললাল একটু সামলিয়ে নিয়ে সহদেব ডাক্তারকে বললেন, এবার তা হলে মধুবালার সমস্যাটার কথা বলি।
