কেবল টিভিতে এই মাত্র চলতি কা নাম গাড়ি শেষ হয়েছে। সেই অসামান্য শেষ দৃশ্যের রেশটি, যেখানে মধুবালাসহ কিশোরকুমার, অশোককুমার, অনুপকুমার সকলেই ভাঙা গাড়িতে গান গাইতে গাইতে চলে যাচ্ছে, আবার মনের মধ্যে গেঁধে গেছে সহদেব ডাক্তারের।
এমন সময় মধুবালাকে সঙ্গে করে পটললাল ফিরে এলেন। দূরদর্শনের পর্দায় তখন অতিশয় হাল আমলের নায়িকা উদয় হয়েছেন। তিনি যেটুকু কাপড় পরে আছেন, সেও নাচের তালে তালে উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে মোহময়ী সুরে অর্থহীন মাদকতাভরা গান–
তুতু-তু, তুতু-তারা
ফাস গিয়া দিল বেচারা।
০৩. কালো টাকা
ফরসা ফরসা মুখে কালো কালো চশমা,
ফরসা ফরসা পকেটে কালো কালো টাকা।
পটললাল ও মধুবালা সহদেববাবুর ড্রয়িংরুমে এসে যখন বসল তখনও মধুবালা ফুঁসছে এবং সেই সঙ্গে হাঁফাচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই সহদেববাবুও জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? কী হল?
পটললাল বিষয়টা ব্যাখ্যা করে বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই মধুবালা বলল, একটা বেজম্মাকে একটু কড়কে দিলাম।
মধুবালার ভাষা ব্যবহার দেখে সহদেব ডাক্তার একটু থমকিয়ে গেলেন। ইতিপূর্বে জুলেখা ও মমের সঙ্গে তার আলাপ পরিচয় হয়েছে, কিন্তু তাদের ভাষা খুব সংযত ছিল।
এ মেয়েটির চেহারা, শরীরের খাঁজ-ঊাজগুলো যেমন টানটান, সালোয়ার-কামিজ যেমন রবারের পোশাকের মতো আঁটসাট, মুখ চোখের মধ্যেও উগ্র যৌনতা। কথাবার্তায় সেটা আরও মালুম হল।
মধুবালাকে কিছুক্ষণ অবলোকন করে পটললালের দিকে তাকিয়ে সহদেব ডাক্তার বললেন, কী খবর পটলবাবু? আপনার যে দেখাই নেই। আজকাল আপনি কোন লাইনে আছেন? কী করছেন?
পটললালের মনে একটা খটকা ছিল আগের সেই কালো পমেরেরিয়ান কুকুর হারিয়ে যাওয়ার কেসে গোয়েন্দার ফি দেওয়া হয়নি হয়তো মিঃ এস এস এবার প্রথমেই তাই নিয়ে ধরবেন।
কিন্তু সহদেব ডাক্তারের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করে আর ওষুধ থেকে ভাল আয় হয়, তার অন্য সত্তা গোয়েন্দা এস এস-এর আয় নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই।
আগেরবারের পাওনার কথাটা না ওঠায় পটললাল একটু আশ্বস্ত হলেন এবং সহদেব ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তরে খুব বিনয় সহকারে বললেন, আমি আর কী করব? আমার কি কিছু করা সম্ভব?
সহদেব ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, মিস জুলেখা? তার কী খবর?
পটললাল বললেন, জুলেখা দুবাই থেকে আর ফিরছে না। সেখান থেকে এক বেদুইন নাকি তাকে কিনে নিয়ে গেছে। এখন সে মরুদ্যানে খেজুর ঝোঁপের মধ্যে এয়ার কন্ডিশন ঘরে থাকে।
দুবেলা খেজুরের চাটনি, উটের দুধের ফিরনি আর দুম্বার মাংস খায়।
খাদ্যের বর্ণনা শুনে সহদেব ডাক্তার বললেন, সর্বনাশ!
পটললাল বললেন, জুলেখার কথা আর বলবেন না স্যার। আপনি মধুবালার একটু হিল্লে করে দিন। তা হলে আমার হয়ে যাবে।
সহদেব ডাক্তার চট করে মধুবালার সমস্যায় মাথা গলাতে চাইলেন না। তিনি পটললালের কাছে আবার জানতে চাইলেন, তা হলে এখন কিছু করছেন না। নিজের খাই খরচা চালাচ্ছেন কী করে?
পটললালকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখেছেন সহদেব ডাক্তার, তাই স্বাভাবিক কারণেই এরকম প্রশ্ন তিনি তাকে করতে পারেন, যদিও সাধারণত এই জাতীয় প্রশ্ন কোনও ভদ্রলোককে করা যায় না।
তবে সেই প্রচলিত অর্থে পটললালও তেমন ভদ্রলোক নন, চিরদিনই উঞ্ছবৃত্তি করে তার চলে, ভদ্র সমাজের প্রান্ত সীমানায় তার আনাগোনা। মেয়েমানুষদের মধ্যে যেমন হাফ-গেরস্থ আছে, তেমনিই পুরুষ মানুষদের মধ্যে আছে হাফ-ভদ্রলোক। শ্রীযুক্ত পটললাল পাল হলেন একজন হাফ ভদ্রলোক।
পটললাল সেটা জানেন এবং এতে তাঁর বিশেষ কিছু আসে যায় না। সহদেব ডাক্তারকে অকপটে তিনি যা বললেন, সেটাই এর প্রমাণ।
পটললাল বললেন, কালো টাকার কারবার করি।
সহদেব ডাক্তার বিস্মিত হলেন, মুখে বললেন, কালো টাকা ত কোটি কোটি টাকার ব্যাপার। আপনার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে না কোটি কোটি টাকার কারবার করছেন?
পটললাল বললেন, সে ধরনের বড় বড় কালো টাকার ব্যাপার আমার নয়। আমার সামান্য দু টাকার ব্যাপার।
মধুবালা এতক্ষণ আপনমনে নিজের কামিজের কোনা পাকিয়ে কান চুলকাচ্ছিল, এতে যে তার নাভি ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল অন্যদের, সে নিয়ে তার ভ্রুক্ষেপ ছিল না। এবার পটললালের কথায় সে কামিজ নামিয়ে একটু মুখ বিকৃত করে বলল, ছিঁচকে।
পটললাল এই বিশেষণে খুব বিচলিত হলেন বলে মনে হল না। বরং সহদেব ডাক্তারকে বললেন, আমার স্টোরিটা একটু শুনুন স্যার।
এসব ব্যাপারে সহদেব ডাক্তারের কোনও ধৈর্যের অভাব হয় না। গোয়েন্দাগিরিতে সাফল্যের চাবিকাঠি হল মনোযোগ দিয়ে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু দেখা এবং শোনা। সেই রীতি মেনেই চোখ বুজে সহদেব ডাক্তার পটললালের কাহিনি শুনলেন।
সে এক অবিশ্বাস্য কাহিনি। পটললাল আবার কোনও কথা সংক্ষিপ্ত করে গুছিয়ে বলতে পারেন। পাঠক-পাঠিকারা গোয়েন্দা নন। এই দীর্ঘ ব্যাপারে তাদের ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে এই আশঙ্কায় আমি পটললালের গল্পটি ডালপালা হেঁটে গুছিয়ে বলছি।
পটললাল এখন থাকেন নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে বাংলা থিয়েটারের এক মধ্যবয়সি অভিনেত্রীর কাছে পেয়িং গেস্ট হিসেবে। ঠিক পেয়িং গেস্টও নয়। লিভ টুগেদারও বলা যায়। এ ধরনের লিভ টুগেদার। আমাদের দেশে চিরকালই ছিল। জমিদার বাড়ির প্রৌঢ় প্রবাসী গোমস্তামশায় থাকতেন কালীবাড়ির হৃষ্টপুষ্টা পরিচারিকার সঙ্গে। বাজারের গুড়ের আড়তের সরকারবাবু বসবাস করতেন আগের সরকারবাবুর বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে। বহুকাল ধরে এসব চলে আসছে, এসব মোটেই সাহেবি কেতা নয়। সুতরাং পটললালকেও দোষ দেওয়া যায় না।
