পটললাল কিন্তু টাকা চাইলেন না। উলটো দিকের সোফায় বসে বললেন, স্যার খুব গোলমাল।
তখন ছোট পর্দায় ছবিটা আবার শুরু হয়েছে। গভীর রাতে মধুবালার বাড়িতে চুপিসারে কিশোরকুমার প্রবেশ করেছেন। হাতের ইশারায় পটললালকে থামিয়ে সহদেব বললেন, দাঁড়ান, আগে বইটা শেষ হোক।
পটললালের আর তর সইছিল না। তার গোলমালের আশু সমাধানটা বোধহয় খুব জরুরি।
পটললাল বসে বসে উশখুশ করতে লাগলেন। কিন্তু গোয়েন্দাপ্রবর মিস্টার এস এসের কোনও চিত্তবৈকল্য ঘটল না। তিনি একাগ্র দৃষ্টিতে চলতি কা নাম গাড়ি দেখে যেতে লাগলেন।
বাধ্য হয়ে পটললাল উঠে দাঁড়ালেন, গোয়েন্দা স্যারের দৃষ্টি কোনও রকমে আকর্ষণ করে বললেন, স্যার, বাইরে মধুবালা একা একা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আপনি যদি বলেন তো মধুকে ঘরের মধ্যে ডেকে আনি।
পটললালের আর কোনও কথা সহদেব ডাক্তারের কানে যায়নি শুধু মধুবালা শুনেছিলেন। টিভির পর্দায় এখন মধুবালার দোর্দণ্ডপ্রতাপ অভিভাবক হম্বিতম্বি করছেন, সে দিক থেকে চোখ না সরিয়ে সহদেব বললেন, মধু? মধুবালা? মধুবালা আমার বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে? মিস্টার পটললাল আপনার কি মাথা খারাপ হল। উনি তো বহুকাল গত হয়েছেন।
ড্রয়িংরুম থেকে বেরোতে বেরোতে পটললাল বললেন, স্যার, এ মধুবালা সে মধুবালা নয়। এখনই ডেকে নিয়ে আসছি।
পটললালের মধুবালাকে নিয়ে ফিরে আসতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল।
সহদেব ডাক্তারের বাড়ির বাইরে ফুটপাথে যেখানে ওপরের দেওয়ালে সাইনবোর্ড টাঙানো আছে,
আর চিন্তা নাই।
ইঁদুরের কামড়ের অমোঘ ঔষধ;
দূর-দূর ইঁদুর
পরীক্ষা প্রার্থনীয়:
ডাঃ সহদেব শুক।
এই সাইনবোর্ডের মধ্যে একপাশে একটি করালদন্ত, কুম্ভীর বদন ইঁদুরের রঙিন ছবি আঁকা আছে, সেই ইঁদুরটির অতি দীর্ঘ লেজ নীচের দিকে নেমেছে।
সেই ইঁদুরের লেজের নীচের সইসই মধুবালাকে পটল দাঁড় করিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। এ তো আর মধ্যমগ্রামের কলোনি এলাকা নয়, কলকাতা শহরের পার্ক সার্কাস অঞ্চল। পটললাল মধুবালাকে সেই ইঁদুরের লেজের নীচে দাঁড় করিয়ে বলে গিয়েছিলেন, নট নড়ন চড়ন নট ফট।
কিন্তু পটললাল ফুটপাথে এসে দেখলেন মধুবালা সাইনবোর্ডের নীচে নেই। চিন্তিতভাবে একটু সামনের দিকে এগোতে দেখলেন কড়েয়া রোডের মোড়ে একটা ঘোড়া-নিম গাছের নীচে সিমেন্টের বাঁধানো বেদিতে বসে শ্রীমতী মধুবালা এক কানসাফাইওয়ালাকে দিয়ে কান পরিষ্কার করাচ্ছে।
পটললালের মতো সাতঘাটের জল খাওয়া, পোড় খাওয়া লোক জীবনে কোনওদিন কোনও মহিলাকে প্রকাশ্য রাস্তায় কান পরিষ্কার করতে দেখেনি।
তা ছাড়া এ কী দৃশ্য?
কামিজ হাঁটুর ওপরে তুলে, দুই পা ছড়িয়ে চোখ বুজে পরম আরামে মধুবালা কর্ণ কয়ন করছে।
পটললাল গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, এই বাবলি, এটা কলকাতার রাস্তা, কাপড়-চোপড় ঠিক করে বোস।মধুবালা তথা বাবলি তখন জীবনে প্রথমবার কর্ণকয়নের আবেগ অনুভব করছে, মধ্যে মধ্যে অত্যধিক আবেগে সাফাই-শিল্পীর দক্ষ হাতের মুঠি চেপে ধরে উঃ, আঃ করছে।
পটললালের চেঁচামেচিতে এতক্ষণে মধুবালা চোখ খুলল। তারপর আধো আধো গলায় বলল, কী বিরক্ত করছ পটলদা, একটু সুখ করতে দাও।
মধুবালার জন্যেই পটললালের সহদেব ডাক্তারের কাছে আসা, এখন মধুবালাই দেরি করছে। পটললাল খুব রেগে গেলেন কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। সে সাহসও তার নেই। বাঙালির চোপাকে তিনি খুব ভয় পান। একেবারে চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করে ছেড়ে দেবে।
সুখ করা শেষ হতে মধুবালার সঙ্গে কান সাফাইওয়ালার তুমুল কলহ শুরু হয়ে গেল। একেবারে যাকে বলে তুলকালাম কাণ্ড।
জুতো পালিশওয়ালাদের, কান সাফাইওয়ালাদের ট্রেড-ট্রিক হল প্রথমে একটা সাধারণ দাম বলা, যথা দু টাকা, তারপরে পালিশ করতে গিয়ে অস্পষ্টভাবে খদ্দেরকে বলা, ক্রিম দিয়ে দেই, খদ্দের অতি সচেতন না হলে চুপ করে থাকবে। কিন্তু এই ক্রিম মানেই দু টাকার পালিশ পাঁচ টাকা হয়ে গেল।
মাথা মালিশওয়ালা, জুতো পালিশওয়ালা তারাও একই কায়দা করে, প্রথমে দু টাকা তারপরে মাথা হাতে নিয়ে খদ্দেরকে বলে স্পেশাল, মানে পাঁচ টাকা। কাজ শেষ হলে যখন খদ্দের ভাবছে দু টাকা দিতে হবে সে বলে, পাঁচ টাকা। পরিণামে গোলমাল অনিবার্য।
আজ কান পরিষ্কার করার লোকটিও সেই বুদ্ধিই করছিল। কিন্তু তার কোনও ধারণা ছিল না। আজকের খদ্দের বিষয়ে। বাবলি ওরফে যাত্রায় নবাগতা মধুবালা এমন ভাষায় গালাগাল শুরু করল যে তা শুনলে মরা মানুষ উঠে বসবে। কান সাফাইয়ের লোকটির বাংলা ভাষা তেমন রপ্ত নয়, তবুও সে যা বুঝল তাতে বিনা বাক্য ব্যয়ে উচিত প্রাপ্য দু টাকা পর্যন্ত ফেলে বাক্স গুটিয়ে পিঠটান দিল।
তবুও মধুবালা তাকে ছাড়ে না। ওড়না কোমরে বেঁধে সন্ত্রস্ত লোকটির পিছু পিছু ছুটল। মধুবালার বক্তব্য, বদমাইসের মুখে কী একটা খারাপ জিনিস ঘষে না দিয়ে ছাড়বে না। পটললাল বহু কষ্টে তাকে নিবৃত্ত করল।
রাস্তায় তখন বেশ ভিড় জমে গেছে। সোমত্ত যুবতীর উত্তাল দেহ আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি সহকারে অশ্লীল গালাগাল জনতা খুবই উপভোগ করছিল। পটললাল মধুবালার হাত ধরে টেনে সহদেব ডাক্তারের বাড়িতে নিয়ে এলেন। অতি উৎসাহী দুয়েকজন পিছু নিয়েছিল, মধুবালা একবার ফোঁস করে তেড়ে যেতেই তারা উধাও হল।
