এদিকে কেবল টিভি নেওয়ার পর থেকে সহদেববাবুর হাটাচলা অনেক কমে গেছে। আগে সকালে উঠে ময়দানে হাঁটতে যেতেন। কিন্তু ওই সময়ে কেবল টিভির একটা চ্যানেলে পুরনো দিনের হিন্দি গান হয়। গান শোনার নেশা ধরে গেছে তার।
নেশা ধরে গেছে বললে অবশ্য ভুল বলা হয়। এই নেশা সহদেববাবুর বহুদিনের পুরনো। প্রথম যৌবনে তিনি হিন্দি সিনেমার পোকা ছিলেন। কী সব নায়িকা ছিল তখন, সুরাইয়া, নার্গিস, মধুবালা।
এর মধ্যে অবশ্য এই শেষের জনেরই প্রতি তাঁর অধিক অনুরাগ ছিল।
সেই আয়েগা-আয়েগা গান, মহল ছবিতে। অশোককুমার গায়ক, নায়িকা মধুবালা, জাফরির চৌকো ফাঁক দিয়ে আলো আঁধারিতে মধুবালার ঢলঢল মুখ, সে হল সহদেব শুক যখন নকুল শুকুল ছিলেন সেই প্রথম যৌবনের প্রথম প্রেম।
কাঁথি শহরে কাকার বাড়িতে থেকে স্কুলে ক্লাস নাইনে। চুরি করে মহল ছবি পাঁচবার দেখেছিলেন নকুল শকুল। অশোককুমার-মধুবালার ডায়ালগ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল স্কুল ছাত্র নকুলের।
(সহদেব শুক ওরফে নকুল শকুল প্রসঙ্গ বেশ জটিল। যাঁরা পটললাল ও মিস জুলেখা বইটি পড়েননি বা ভুলে গেছেন, একবার দেখে নেবেন।)।
সেই মহল থেকে শুরু। এর পরে বহুদিন মধুবালা জ্বরে ভুগেছিলেন সহদেববাবু। অশোককুমারের সঙ্গে মধুবালার আরেকটা বই দেখেছিলেন হাওড়া ব্রিজ। সেই বইয়ের শুটিং হাওড়া ব্রিজের ওপরে হয়েছিল। তখন সহদেব কলেজে পড়েন। রাতের বেলা ব্রিজে উঠে সে বইয়ের শুটিং দেখতে গিয়ে পুলিশের লাঠি খেয়েছিলেন।
তবে সহদেব সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন মধুবালার চলতি কা নাম গাড়ি দেখে। সেই বইতেও অশোককুমার ছিলেন কিন্তু নায়ক ছিলেন কিশোরকুমার। অশোককুমারের সব ভাইই চলতি কা নাম গাড়ি ছবিতে ছিলেন।
সেই ছবিতে কিশোরকুমারের সঙ্গে মধুবালার একটা নেচে নেচে গান, কী যেন লাইনগুলো ছিল তার,
হাল ক্যায়সা হ্যায় জনাব কা,
কেয়া খেয়াল হ্যায় আপকা।
সহদেববাবুকে একেবারে মাতিয়ে দিয়েছিল।
সেই সময়ে সহদেববাবুর বিয়ের প্রস্তাব আসে। ভাল বংশ, সুন্দরী পাত্রী, লেখাপড়াও ভাল, মাধ্যমিকের ছাত্রী পদ্মবালাকে তিনি বিয়ে করেননি বরং তার বদলে পদ্মবালার নাম একটু ঘুরিয়ে গান লিখেছিলেন তিনি। নিজেই সুর দিয়েছিলেন সে গানে, নিজের মনে মনেই গাইতেন,
কুলবালা গো, কুলবালা।
রাখো তোমার কুসুমমালা।
তুমি নওগো মধুবালা।
কুলবালা গো,…
০২. পটললালের প্রবেশ
তুতু-তু তুতু তারা
ফাঁস গিয়া দিল বেচারা।
এ কাহিনি পটললাল ও মধুবালার। সেই দিক থেকে গল্প এখনও আরম্ভ হয়নি। অথচ ভূমিকা খুব বড় হয়ে গেল। সে যা হোক গল্প এমন কিছু বড় নয়। পাঠক-পাঠিকাদের তেমন কিছু অসুবিধে হবে না।
এটা একটা গোয়েন্দা কাহিনি। গোয়েন্দা কাহিনির নিয়ম হল গোয়েন্দার কথা সাত কাহন করে বলা।
আমরা ডাঃ সহদেব শুকের কড়েয়া রোডের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি।
রবিবারের সকালবেলা। কড়েয়া রোডের বাড়ির একতলায় চেম্বারের পাশে ড্রয়িংরুমে বসে মনোযোগ দিয়ে কেবল টিভি দেখছেন। একটু আগে প্রাতরাশ সেরেছেন, কলা, ডবল ডিমের ওমলেট, জোড়া মাখন টোস্ট সহকারে। এখন ঘন দুধ-চিনি দিয়ে গরম কফি আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে পান করছেন।
বেশ আরামদায়ক পরিবেশ। সবচেয়ে আনন্দের কথা, টিভিতে ডাঃ সহদেব শুকের যৌবনের অতিপ্রিয় সেই মধুবালা অভিনীত চলতি কা নাম গাড়ি বইটা হচ্ছে।
আজ বহুকাল পরে ছবিটা দেখে সহদেববাবু অভিভূত হয়ে গেছেন। ছবি দেখতে দেখতে তার বারবার মনে পড়ছে, তার যৌবনকালের সেই স্বরচিত গানটি, কুলবালা গো কুলবালা, তুমি নওগো মধুবালা।
গানটি নিজের মনে ভঁজতে ভঁজতে সেই সঙ্গে মধুবালার ছবি দেখতে দেখতে সহদেব স্থির করলেন, তার পরের গানের ক্যাসেটটা এই গান দিয়েই আরম্ভ করবেন। শেষের দিকের লাইনগুলো মনে পড়ছে না। সে যা হোক নতুন করে লিখে নিলেই হবে।
ছবিটা এখন মারাত্মক জায়গায় এসে পৌঁছেছে। একটা মোটর গ্যারেজের মধ্যে মধুবালা আর কিশোরকুমার প্রেমের লুকোচুরি খেলা খেলছেন। নিজের গানের সুর ভঁজা বন্ধ করে ব্যর্থ হয়ে সহদেব ছবিটা দেখতে লাগলেন।
এমন সময় মূর্তিমান রসভঙ্গ হয়ে শ্রীযুক্ত পটললালের প্রবেশ। রোগীদের চেম্বার থেকে সরাসরি ড্রয়িংরুমের মধ্যে চলে এসেছেন পটললাল।
গোয়েন্দাপ্রধান মিঃ এস এস অর্থাৎ সহদেববাবু এত মনোযোগ দিয়ে, অভিনিবেশ সহকারে এই রকম একটা পুরনো রদ্দি হিন্দি ছবি দেখছেন এটা দেখে পটললাল একটু বিস্মিত হলেন।
ইতিমধ্যে ব্রেক হয়েছে। একটি নারকেল তেলের বিজ্ঞাপনে এক ভদ্রমহিলা নারকেল তেল কিনতে এসে প্রকাশ্য বিপণিতে নিজের মাথার চুল খুলে দেখাচ্ছেন আর এটা দেখে এক ব্যক্তি তো-তো করছেন।
বিজ্ঞাপন থেকে চোখ সরিয়ে সহদেব পটললালের দিকে তাকালেন।
পটললাল সব সময়েই একটা গোলমাল বাধিয়ে আসেন। এবারে নিশ্চয় তাই হয়েছে।
কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে পটললালের?
পটললালের চেহারা সাজপোশাক ঠিক কোনওদিনই ভদ্রলোকের মতো ছিল না। কিন্তু এরকম ভ্যাগাবন্ড চেহারায় সহদেব তাকে কখনও দেখেননি।
পটললালের চোখ-মুখ বসে গেছে। মাথায় বাবরি চুল। লম্বা জুলফি, বাটারফ্লাই গোঁফ। পরনে সাতরঙা, ময়লা নাইলনের গেঞ্জি, কালো ফুলপ্যান্ট। গলায় মাদুলি, হাতে স্টিলের তাগা। এ ধরনের চেহারার, সাজপোশাকের লোক দেখলেই ভয় হয়। মনে হয় এখনই ধার চাইবে, বলবে, দাদা, পনেরোটা টাকা হবে নাকি।
