প্রশ্ন শুনে রাজারাম বলল, ও, ওই কথা! সে তো আমি আমার গাধার লেজ দেখে টের পাই। যত ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দেয় ততই আমার গাধার লেজটা শক্ত হয়ে খাড়া হয়ে উঠতে থাকে। আজকের সকালে ওটার লেজটা একেবারে টানটান খাড়া হয়ে উঠেছিল, তাই দেখে বুঝেছিলাম খুব ঝড়বৃষ্টি হবে।
তখন রাজা বললেন, তা হলে তোমার গাধাটাকেই নিয়ে এসো।
গাধাটা নিয়ে আসার পর গাধাটাকে রাজা তার পরামর্শদাতা ও রাজজ্যোতিষী নিয়োগ করলেন।
এবং সেই শুরু। তারপর থেকে শুধু গাধারাই উচ্চ রাজপথে নিযুক্ত হয়ে আসছে।
পটললাল ও মধুবালা
০১. মধুবালা
কুলবালা গো কুলবালা।
রাখো তোমার কুসুমমালা।
তুমি নওগো মধুবালা।
.
কড়েয়া রোড, পার্ক সার্কাসের হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার নকুল শুকুল ওরফে সহদেব শুক আজ সকাল থেকে স্মৃতিমধুরসে নিমজ্জিত হয়ে আছেন।
পাঠক-পাঠিকাদের স্মরণ থাকতে পারে যে, ডাঃ সহদেব শুক শুধু চিকিৎসক নন, তিনি ঝানু গোয়েন্দা ও সংগীতবিদ। গোয়েন্দাগিরির সময় তিনি তার নাম ও পদবির ইংরেজি আদ্যক্ষর দুটি, অর্থাৎ মিঃ এস এস ব্যবহার করতে ভালবাসেন এবং ওইভাবেই পরিচিত হতে চান। যদিও অনেকেই তাকে সহদেব ডাক্তার বা শুধু ডাক্তার বলে সম্বোধন করে। আগে গোয়েন্দাগিরির সময়ে এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করতেন, এখন মানিয়ে নিয়েছেন।
সহদেববাবু সংগীতচর্চাতেও পারঙ্গম। তার গানের ক্যাসেট আছে। সেই গানগুলি তিনি নিজেই রচনা করেছেন, নিজেই সুর দিয়েছেন এবং নিজেই গেয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজের ক্যাসেট নিজেই পয়সা খরচ করে বার করেছেন। এদিক থেকে তিনি হাল আমলের গায়কদের পূর্বসূরি।
.
যা বলছিলাম, আজ সকাল থেকে সহদেববাবু স্মৃতিরসে আপ্লুত হয়ে আছেন। আজ রবিবার সকালে তিনি রোগী দেখেন না।
গত মাস থেকে সহদেব ডাক্তার কেবল টিভির কানেকশন নিয়েছেন। দূরদর্শন পর্যবেক্ষণ করার মতো তার খুব যে অবসর আছে, তা নয়। টাকাও খুব কম নয়। কানেকশন নিতে পাঁচশো টাকা লাগে, তারপর মাসে একশো টাকা লাগে।
অবশ্য হোমিওপ্যাথ চিকিৎসা করে সহদেববাবু ভালই উপার্জন করেন। এরকম টাকা অল্পবিস্তর খরচ করতে তাঁর গায়ে লাগে না।
সবচেয়ে বড় কথা টাকার কথাটা তেমন কিছু নয়। কেবল টিভি নেয়ার পর ডাক্তার সহদেব শুকের জন্মান্তর ঘটে গেছে।
মেদিনীপুরের এক মহকুমা শহরের পাশের এক গ্রামের নকুল শকুল নামে একটি বালক পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে শহরের ইস্কুলে পড়তে আসত।
পটললাল কাহিনিমালার একাগ্র পাঠক-পাঠিকারা হয়তো খেয়াল করবেন এই নকুল শকুলই পরবর্তীকালে নিতান্ত পেশাগত কারণে যুক্তিসংগত ভাবে নাম ও পদবি অদল-বদল করে সহদেব শুক হয়েছিলেন। (পটললাল ও মিস জুলেখা দ্রষ্টব্য।)
নকুল শকুল ওরফে সহদেব শুক তখন ক্লাস এইটে পড়েন। ইস্কুলের নাম জগজ্জনী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়। তাঁর তখন বয়েস বারো-তেরো। ওই বয়সেই তিনি একজন তুখোড় গোলকিপার। শুধু ক্লাস টিমেই নয় স্কুল টিমেও তিনি গোলকিপার, যা সাধারণত নাইন টেনের ছেলেদের মধ্যে থেকেই নির্বাচন করা হয়।
কিন্তু এর পরেও আছে। শহরের শ্রেষ্ঠ ফুটবল টিম স্বাধীন স্পোর্টিং ক্লাবেরও তিনি বাঁধা গোলকিপার। অবশ্য সে টিমে আরও একজন গোলরক্ষক আছেন, তিনি হলেন নিনি মহামাত্র। এন। পাত্র নামে কলকাতায় বহুকাল এরিয়ান্সের বি টিমে খেলেছেন।
যে সময়ের কথা বলছি তখন নিনি মহাপাত্র মহোদয়ের বয়েস চুয়াল্লিশ, নকুল শকুলের বয়েস চৌদ্দ। শকুলের ওজন একমণ, মহাপাত্রের ওজন দুমণ। শকুলের উচ্চতা সোয়া পাঁচ, মহাপাত্রের উচ্চতাও সোয়া পাঁচ।
বয়েস এবং ভারী শরীরের জন্য গোলকিপার হিসেবে এন মহাপাত্রের কিছু অসুবিধে থাকলেও নকুল শকুল যেখানে তার পাতলা শরীর দিয়ে একটু ফুট প্রস্থ আটকাতে পারতেন, সেখানে দু মণি শরীরে নিনি মহাপাত্র দু ফুট এলাকা জুড়ে গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
ডাঃ সহদেব শুক কখনও কখনও ফুটবল মাঠে এখনও খেলা দেখতে যান কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই নিজে আর খেলার চেষ্টা করেন না। কিন্তু তার অবচেতন মনে কোথাও নিনি মহাপাত্রের প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাবেই হয়তো তার বর্তমান ওজন এখন দুমণ ছাড়িয়ে গেছে।
দুই বিঘা জমি নামক বিখ্যাত কবিতায় রবীন্দ্রনাথ দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে সমান হইবে টানা এরকম ভূমিলোভী এক বাবুর কথা বলেছিলেন। সহদেব শুক তত খারাপ বাবু নন, জমি লোভী নন, তবে তিনি নিজেই গায়ে গতরে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে সমান হইবে টানা হয়ে গেছেন।
সহদেব বাবু নিজে ডাক্তার হয়েও মেদবৃদ্ধির কারণে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। নানারকম খারাপ ভাল, মল-মূত্র-রক্ত ইত্যাদি বহুবিধ পরীক্ষার পরে বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, খাওয়া কমাতে হবে, ব্যায়াম করতে হবে, হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
কয়েকবছর আগে সহদেব বাবুর এক মক্কেল নৃত্যগীত পটিয়সী যাত্ৰানায়িকা জুলেখা অতিরিক্ত বাংলা মদ ও চোলাই এবং সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক চাট খেয়ে প্রভূত মেদশালিনী হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত আর নাচতে না পেরে যাত্রাপার্টি ছেড়ে সার্কাসের দলে যোগদান করেন, যেখানে তিনি বুকে হাতি তোলার কাজ করতেন।
সহদেববাবুর দুরবস্থা এখনও সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। স্থূলদেহ নিয়ে ডাক্তারির তেমন অসুবিধে নেই, সংগীত রচনা বা চর্চার জন্যেও মোটা হলে বাধা নেই। অবশ্য গোয়েন্দাগিরির কাজে কিছু দৌড়ঝাঁপ প্রয়োজন পড়ে তবে সে ধরনের কাজ সাধারণত তিনি এড়িয়ে যান।
