সদর দরজায় প্রেমতোষ বেল টিপলেন। কোনও বেল বাজার শব্দ হল না, কিন্তু দামিনী এসে দরজা খুলে দিল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রেমতোষের দিকে রামকৃষ্ণ তাকালে তিনি বললেন, আমাদের কাজের মেয়ে। কানে শুনতে পায় না। তাই সুইচ টিপলে বেল বাজে না, আলো জ্বলে ওঠে, সেটা দেখে ও এসে দরজা খুলে দেয়।
বাইরের ঘরের টেবিলের সঙ্গেও একটা সুইচ লাগানো আছে। সোফায় বসে প্রেমতোষ পরপর তিনবার সুইচ টিপলেন, তার মানে হল চা।
রামকৃষ্ণবাবু অবাক হয়ে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন, এমন সময় তার চোখে পড়ল অসংবৃত টিভি সেটটির ওপর, সেদিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? প্রেমতোষ যথাসাধ্য সংক্ষিপ্ত করে টিভি-দুর্বিপাক আনুপূর্বিক ব্যক্ত করলেন।
বেশ মনোযোগ দিয়ে সব শুনে রামকৃষ্ণ বললেন, আমি আপনার সেটটা একটু চেষ্টা করে দেখব নাকি?
প্রেমতোষ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, সে কী? আপনি টিভি সারাতে পারেন নাকি?
রামকৃষ্ণ বললেন, হুগলি কলেজ থেকে বি. এসসি ফেল করে প্রথমে টিভি সারানোর লাইনে গিয়েছিলাম। তখন তো সদ্য সাদা-কালো টিভির জমানা শুরু হয়েছে। বড় ফোর টোয়েনটি লাইন, লোক ঠকানোর ব্যবসা। ঘেন্নায় ছেড়ে দিলাম।
প্রেমতোষবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর?
রামকৃষ্ণ সিংহ বললেন, তারপর থেকে সাত ঘাটের জল খেয়ে বেড়াচ্ছি। অবশেষে আপনাদের ঘাটে এসে ভিড়েছি।
ইতিমধ্যে দামিনী চা নিয়ে এসেছে। আজ সে অধিকতরা লজ্জাশীলা, কপালে ঘোমটা টেনে দিয়েছে।
চা খেয়ে রামকৃষ্ণবাবু টিভিটা দেখতে উঠলেন। একটু দেখে বললেন, পুরনো জিনিস। তবে খুব একটা খারাপ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তারপর বললেন, এটা তো রঙিন টিভি, আমি শিখেছিলাম সাদা কালো টিভির কাজ। তবু দেখি একটু চেষ্টা করে।
প্রেমতোষবাবুর ব্যবহৃত একটা পুরনো ব্লেড, একটা তরকারি কাটা ছুরি, আর রান্নাঘরের সাঁড়াশি দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই রামকৃষ্ণ সিংহ টিভি সেটটা প্রাণবন্ত করে তুললেন। শুধু একটা গোলমাল হল শব্দ-টব্দ সবই ঠিক আছে, ছবিও ঠিক আছে, কিন্তু রংটা এল না। তবে সাদা কালো নয়, ঝলমলে নীল রঙের ছবি এল।
দূরদর্শনে তখন হুহুক্কা হুহুয়া, হুহু, হুয়া এইরকম একটা মার-মার, কাট-কাট হিন্দি গান হচ্ছিল, কোনও এক বস্ত্র-কোম্পানি প্রণোদিত। ইতিপূর্বে প্রেমতোষবাবু তার হিসেবি মনোভাব নিয়ে ভেবেছেন এত কম জামাকাপড় পরা পাত্র-পাত্রীদের যদি বস্ত্র ব্যবসায়ীরা উপস্থাপন করেন, তা হলে তাঁদের ব্যবসা লাটে উঠবে, এ তো নিজের পায়ে নিজের কুড়ুল মারা।
আজ প্রেমতোষবাবু সংকোচবশত এ জাতীয় মন্তব্যের ধারে কাছে গেলেন না, বরং পুরুষ নর্তকেরা যখন গাছের আড়াল থেকে গলা বাড়িয়ে, হু-হুঁ হুয়াহু, হুয়াহু হুয়া-হুঁয়া করছিল, তিনি রামকৃষ্ণবাবুর দিকে তাকিয়ে খুবই অন্তরঙ্গভাবে বললেন, নীলবর্ণ শৃগাল কথা।
রামকৃষ্ণ সিংহ হাসলেন। কিন্তু তিনি সুরসিক লোক। ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললেন, টিভিটা এখন চলুক। এইভাবেই চলুক। আমি দু-চারদিনের মধ্যে একটা মিস্ত্রি পাঠিয়ে দেব। সে এসে সব ঠিকঠাক করে দেবে। ততদিন মনের আনন্দে যতক্ষণ ইচ্ছে ব্লু ফিল্ম দেখুন।
ঠিক এই সময়ে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে আজন্ম ব্রহ্মচারী মহীতোষবাবু নেমে আসছিলেন। বিকেলের এই সময়টায় তিনি ছাদে উঠে শীর্ষাসন করেন, অস্তগামী সূর্যকে নিজের পদদ্বয় দেখান।
আজ সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ছোট ভাইয়ের সঙ্গে এক অচেনা ভদ্রলোক দেখে এবং ব্লু ফিল্ম কথাটি শুনে তিনি বাইরের ঘরে উঁকি দিলেন। তখন আগের গান শেষ হয়ে নতুন জিনিস শুরু হয়েছে। এক দঙ্গল প্রায় উলঙ্গ তরুণী তাদের অঙ্গের গোলাকার প্রত্যঙ্গ সমূহের বহুরকম আবর্তন করে দুধ বনে যাবে, মালাই বনে যাবে, মাছ বনে যাবে, কাবাব বনে যাবে, ইত্যাদি নানা গোপন অভিপ্রায়ের কথা গানের সুরে জানাচ্ছে।
এই রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখে মহীতোষবাবু আঁতকিয়ে উঠে স্বগতোক্তি করলেন, ছিঃ! ছিঃ! এতবড় অনাচার। আমার বাড়িতে ব্লু ফিল্ম। গজগজ করতে করতে মহীতোষবাবু বেরিয়ে গেলেন, যদিও পৈতৃক বাড়ি, তার ধারণা তিনিই বড় ভাই বলে বাড়িটা তারই।
মহীতোষবাবু বেরিয়ে যাওয়ার মুখে রামকৃষ্ণবাবুর দিকে একবার অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকে লোপট বলে অভিহিত করে গেলেন।
রামকৃষ্ণ বিস্মিত হয়ে প্রেমতোষের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, প্রেমতোষ বললেন, আমার দাদা। তারপর নিজের মাথার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বোঝালেন যে মাথা খারাপ।
রামকৃষ্ণ আর দাঁড়ালেন না। তিনি পোড় খাওয়া লোক। বোবা, লজ্জাবতী পরিচারিকা, অপ্রকৃতিস্থ অগ্রজ–প্রেমতোষবাবুর বাড়িতে আর কী কী আছে সেটা জানার তার আর মোটেই আগ্রহ নেই।
এরপর সারা সন্ধ্যা চুটিয়ে দূরদর্শন উপভোগ করলেন প্রেমতোষবাবু। সংবাদ শুনলেন, মানে বার দশেক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বার দুয়েক মুখ্যমন্ত্রীর দেখা পাওয়া গেল। অন্যান্য ভাগ্যবান মন্ত্রীদেরও দেখতে পেলেন। শুনতে পেলেন ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের কিছু এলোমেলো সংবাদ। তারপর লংজাম্প, হাইজাম্প সহকারে জীবনমুখী সংগীত। বিশেষ বর্ণনা করে লাভ নেই, ভুক্তভোগী মাত্রেই এসব জানেন।
এদিকে রাত নটা বেজে গেছে। মহীতোষ এখনও বাড়ি ফেরেননি। প্রতিদিন রাত নটায় দুইভাই এক সঙ্গে বসে খান। আজ বাড়িতে অনাচার দেখে ব্যায়ামাচার্য ব্রহ্মচারী মহীতোষ পার্কে গিয়ে বসে আছেন।
