প্রেমতোষ হাত দিয়ে নানারকম ইঙ্গিত করে দামিনীকে বুঝিয়ে তাকে পার্কে পাঠালেন দাদাকে ডেকে আনতে।
দামিনীকে দেখে উত্তেজিত হয়ে মহীতোষ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ব্লু ফিল্ম, ওই নীল ছবি বন্ধ করেছে প্রেম? দামিনী জিব কেটে, ঘোমটা টেনে ঠিক কী জবাব দিল সেটা বোঝা গেল না।
পার্কে মহীতোষবাবুর পাশেই কয়েকটি সমাজ সচেতন যুবক বসেছিল। তারা ব্লু ফিল্ম শুনে চঞ্চল হয়ে উঠল। তারা মহীতোষবাবুদের বাড়ি চেনে। পার্ক থেকে বেরিয়ে তারা সরাসরি সেখানে এসে বাইরের ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি দিল।
সেই অতর্কিত মুহূর্তে প্রেমতোষবাবুর টিভির ঘন নীল আলোয় দিল্লি দূরদর্শনের কেন্দ্রীয় সম্প্রচারে একটি অতি রোমান্টিক দক্ষিণী সিরিয়ালের প্রগাঢ় প্রেমের দৃশ্য প্রতিভাত হচ্ছিল। উদ্ভিন্ন যৌবনা নায়িকাকে সুনীল সাগরের সবুজ কিনারে শালপ্রাংশু মহাভুজ নায়ক সবলে আকর্ষণ করেছেন। নায়িকার সেকী ছটফটানি; লুঙ্গি পরিহিত, খালি গা নায়কের গোঁফের প্রান্তে বিজয়ীর হাসি।
সমাজসেবী যুবকেরা পলক মাত্র নীল দৃশ্যটি দেখে নিজেদের কর্তব্য স্থির করে ফেলল। তারা গলির পিছন দিকে ছুটল।
সেখানে গলির মোড়েই হাজরা ফাঁড়ি। সেই ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত দারোগা হাজারি হাজরা সাহেব। একটু সাবেকি জমিদারি চালে চলেন। দোতলায় তার কোয়ার্টার, সারাদিন সেখানেই থাকেন। খুব গোলমেলে ব্যাপার হলে ফোন ধরেন, সেও কদাচিৎ, বাসায় মাদ্রাজি সিল্কের লুঙ্গি পরে থাকেন আর রঙিন গেঞ্জি। সন্ধ্যা সাড়ে আটটার পরে স্নান-টান করে, পাউডার মেখে চিকনের কাজ করা পাঞ্জাবি আর আলিগড়ি পাজামা পরে থানার অফিস ঘরে দর্শন দেন।
হাজারি হাজরার পূর্বাশ্রমে নাম ছিল ক্ষেত সরকার। হাজরা ফাঁড়িতে এক নাগাড়ে বহু বছর আছেন তাই পাবলিক তাকে মিঃ হাজরা বলে সম্বোধন করে এবং সেই সঙ্গে উনি হাজার টাকার কম ছেন না বলে নাম হয়েছে হাজারি, দুইয়ে মিলে হাজারি হাজরা।
হাজারি হাজরা নবযৌবনে নকশাল হয়েছিলেন। তারপর উনিশশো পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর সালে জরুরি অবস্থার গলিঘুজি দিয়ে দারোগাগিরিতে ঢুকে পড়েন। তদবধি বহাল তবিয়তে আছেন, যখন যে গাছে নৌকো বাঁধা উচিত, সেখানেই নৌকো বাঁধেন।
আজ সন্ধ্যাবেলা একটু আগেই একটা গোলমেলে খবর এসেছিল। থানার অদূরে অনিল ঘোষাল লেনে অনেকদিন ধরে একটা বাড়িওয়ালা-ভাড়াটে গোলমাল চলছিল। বাড়িওয়ালা সপ্তাহ তিনেক আগে মারা গেছেন। গতকালই ভাড়াটে গজু শ্রীমানী এক গামলা লিচু আর আম, সেই সঙ্গে নগদ হাজার টাকা দিয়ে গেছে।
একটু আগে খবর এসেছে বাড়িওয়ালার বিধবা স্ত্রী ও বোনকে প্রায় উলঙ্গ করে গজু রাস্তায় প্যারেড করাচ্ছে। এইরকম সময়ে গা ঢাকা দেওয়াই রীতি।
সমাজসেবী যুবকেরা দারোগাবাবুকে উদ্ধার করল। তাদের মুখে নীল ছবির বার্তা পেয়েই, থানার ভার এক সদা অর্ধনিদ্রিত জমাদারের ওপর ছেড়ে দিয়ে, তিনি অকুস্থলে রওনা হলেন।
তখনও দামিনী মহীতোষকে নিয়ে পার্ক থেকে ফেরেনি। প্রেমতোষবাবু টিভির বিচিত্র লীলা উপভোগ করছেন, এমন সময় সদলবলে হাজারি হাজরার প্রবেশ।
স্বভাবতই প্রেমতোষবাবু একটু হকচকিয়ে গেলেন। টিভিতে এখন তার রঙের খেলা ছাড়া বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছিল না। নীলরংটা গাঢ়, আরও গাঢ় হতে হতে হঠাৎ ফিকে, হালকা হয়ে গিয়ে চুপসে যাচ্ছিল, আবার গাঢ় হচ্ছিল।
হাজারি হাজরা নিজের হাতের রুলটা নাচিয়ে একটা ধমক দিলেন প্রেমতোষের দিকে তাকিয়ে, কী, এসব কী, হচ্ছেটা কী?
প্রেমতোষ চৌধুরীও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন, একটা সামান্য টিভি সেটের মধ্যে এতটা বর্ণবৈচিত্র্য তিনি আশা করেননি।
দারোগাবাবু এবার তার ডানদিকে দাঁড়ানো বিহারি জমাদারকে বললেন, তেওয়ারি, হাত লাগাও, আর প্রেমতোষকে বললেন, আপনাকে একবার আমার সঙ্গে থানায় যেতে হবে।
কিন্তু প্রেমতোষবাবুকে থানায় যেতে হল না। জমাদারসাহেব টিভির নবে তার লাঠির খোঁচা দিয়ে সেটা বন্ধ করতে গিয়েছিলেন। পরিণাম যা হল অতি ভয়াবহ। পুরো টিভির বাক্সটা থরথর করে কেঁপে শূন্যে ছয় ইঞ্চি লাফিয়ে উঠল। তার ভেতর থেকে তীব্র নীল জ্যোতি এবং শতশত শঙ্খ গর্জনের শব্দ বেরতে লাগল। সপারিষদ হাজারিবাবু ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন।
এই সময় মহীতোষবাবু দামিনীর সঙ্গে বাসায় ফিরে এসেছেন। দামিনীর উপস্থিত বুদ্ধি অতি প্রখর। সে ছুটে সিঁড়ির নীচে গিয়ে মেইন সুইচটা অফ করে দিল।
টিভির গর্জন ও শূন্য পরিক্রমা বন্ধ হল। কিন্তু নীল আলোটা রয়ে গেল। গতিক সুবিধের নয় দেখে হাজারি হাজরা পশ্চাদপসরণ করলেন।
পরদিন সকালে টিভি সেটটাকে তুলে নিয়ে মহীতোষবাবু পাড়ার মোড়ের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসেছেন। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত, অবৈজ্ঞানিক কারণে একটা অতি ক্ষীণ নীল আলোর রেশ
এখনও রয়ে গেছে; প্রেমতোষবাবু ঘরে ঢুকলেই সেটা টের পান।
পঞ্চতন্ত্রের শেষ গল্প
অস্তি কস্মিংশ্চিৎ নগরে রাজারাম নামে এক রজক ছিল। এই নগর এক রাজ্যের রাজধানী, সেই রাজ্যের রাজার নামও রাম, অর্থাৎ কিনা রাজা রাম।
না। ইনি অযোধ্যার রাজা রাম নন। এসব গোলমালের মধ্যে জড়িয়ে পড়ার সাহস নেই আমার। আমার গল্পের এই রাজা পরবর্তীকালের অন্য এক রাজ্যের অধিপতি।
আসলে এ গল্প আমার নয়। এটা বিষ্ণু শর্মার পঞ্চতন্ত্রের শেষ গল্প।
