প্রেমতোষবাবু অনুনয় করলেন, শনি-রবিবার সম্ভব হবে না? ওই দুদিন আমার ছুটি থাকে।
দোকানদার বললেন, অসম্ভব। শনিবার বন্ডেল, রবিবার গোলপার্ক।
অগত্যা প্রেমতোষবাবু বহুদিন পরে বৃহস্পতিবার একটা হাফ ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে দুপুরে বাসায় ফিরে এসে বসে রইলেন।
তিনটে বা সাড়ে তিনটে নয়। মিঃ পাল এলেন পাঁচটা পার হয়ে। চোখে সানগ্লাস, গায়ে স্পোর্টস গেঞ্জি, হাতে ভি আই পি সুটকেস।
মি. পাল কলিংবেল বাজিয়ে পরপর চারটে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করলেন। প্রথমেই জানতে চাইলেন, আপনিই প্রেমতোষ চৌধুরি?
প্রেমতোষবাবু দরজা খুলে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ।
টিভি খারাপ হয়েছে?
প্রেমতোষবাবু আবার বললেন, হ্যাঁ।
বাড়িতে কুকুর নেই তো?
প্রেমতোষবাবু জানালেন, না।
জুতো খুলতে হবে নাকি?
প্রেমতোষবাবু বললেন, দরকার নেই।
মি. পাল জুতো মশমশ করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে টিভির সামনে একটি সোফায় বসে একটা কিং সাইজ সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা প্রেমতোষবাবুর দিকে এগিয়ে বললেন, চলবে নাকি?
প্রেমতোষবাবু করজোড়ে সিগারেট প্রত্যাখ্যান করলেন।
সিগারেট টানতে টানতে গভীর অভিনিবেশ সহকারে মি. পাল টিভি সেটটাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ দেখার পরে জিজ্ঞাসা করলেন, এ মডেলের মাল কোথায় পেলেন মশায়? এ যে মিলিটারি ডিসপোজালের পুরনো চোরাই মাল।
প্রেমতোষবাবু সংবাদটা শুনে একটু বিচলিত হলেন। তবে বুঝতে দিলেন না, বললেন, নিলামে কিনেছি।
দেখা গেল মি. পাল বহুদর্শী লোক। অনেক কিছু খোঁজখবর রাখেন। নিলামের কথা শুনে তিনি বললেন, মিডলটন স্ট্রিটের নিলাম তো? গুজরাতি হাজব্যান্ড অ্যান্ড ওয়াইফ, মি. অ্যান্ড মিসেস দেশাই, সব বেচে দিয়ে বড় মেয়ে কানাডায় ডাক্তার, তার কাছে চলে যাচ্ছেন, তাই তো৷ ছিঃ ছিঃ! কালীঘাটের ভোলা হালদার হয়েছে মি. দেশাই, আর রিপন স্ট্রিটের রেহানা হয়েছে মিসেস দেশাই। ছিঃ! ছিঃ! জাত ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে চিটিং করছে!
প্রেমতোষবাবু হতভম্ব হয়ে গেলেন।
মি. পাল সোফা থেকে উঠে ভি আই পি সুটকেস খুলে যন্ত্রপাতি বার করে টিভির বাক্সটা অবলীলাক্রমে খুলে ফেললেন। পিছনের ঢাকনাটা উপুড় করে দিয়ে তার মধ্যে ভিতরের ছোট বড় নানারকম জটিল যন্ত্রাংশ খুলে খুলে রাখতে লাগলেন। তারপর হাত-পা হঠাৎ ছেড়ে গেলে লোকে যেভাবে কী পরিমাণ ক্ষত হয়েছে সেটা অনুধাবন করার চেষ্টা করে সেটের ভেতরটা একটু ঘাড় নামিয়ে দেখলেন, অবশেষে নিদান হাঁকলেন, একেবারে শেষ অবস্থা, টিউবটা একেবারে গেছে।
এবার মি. পাল উঠলেন। নিজের সুটকেসটা একটু গুছিয়ে নিলেন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, চোখের কালো চশমাটা যেটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে জামার ওপর পকেটে রেখেছিলেন সেটাকে সুটকেসের মধ্যে ভরে নিলেন। ধীরে সুস্থে একটা সিগারেট ধরিয়ে প্রেমতোষকে বললেন, সোমবার একবার যাবেন, এস্টিমেট পেয়ে যাবেন। টিভিটা যন্ত্রপাতি খোলা অবস্থায় সেই রকম পড়ে রইল।
তবে এস্টিমেটটা সোমবার পাওয়া গেল। হাজার চারেক টাকা লাগবে। পিকচার টিউব থেকে নাট বলটু সবই মেরামত করতে হবে কিংবা পুরোপুরি বদলাতে হবে।
এত সহজে চার হাজার টাকা খরচ করবার লোক প্রেমতোষ নন। দোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাথে এসে দামি এস্টিমেটটা ছিঁড়ে ফেলে ছিলেন। ফুটপাথের পাশের একটা কাঠের বেঞ্চিতে লুঙ্গি ও হাতকাটা কালো গেঞ্জি পরে মি. পাল বিড়ি সহযোগে ভাড়ে চা খাচ্ছিলেন, এস্টিমেটটা ছিঁড়ে ফেলতে দেখে তিনি কটমট করে তাকালেন প্রেমতোষের দিকে।
টিভির শোক সামলে উঠতে পারছিলেন না প্রেমতোষ। বাড়ি ঢুকলেই বসার ঘরে নাড়িভুড়ি বার করা সেটটা চোখে পড়ে। এদিকে এত খরচ করাও বিশেষ করে জোচ্চোরের গছানো রদ্দি টিভির জন্যে, প্রেমতোষবাবুর মনঃপূত নয়।
কিন্তু হঠাৎই সমস্যাটার আংশিক সুরাহা হয়ে গেল। প্রেমতোষের অফিসের একটা কারখানা বানানো হচ্ছে, কলকাতার কাছেই শহরতলিতে। ফলের রস তৈরি করার কারখানা। প্রেমতোষ গিয়েছিলেন কারখানা নির্মাণের ব্যয়ের সরেজমিন তত্ত্বাবধান করতে।
কারখানা তৈরির টেন্ডার পেয়েছিলেন রামকিষেণ সিং নামে এক পাঞ্জাবি কন্ট্রাক্টর। একটু রোগা, একটু বেঁটে, সর্দারজি হিসেবে একটু বেমানান, কিন্তু দাড়ি আর জবরদস্ত পাগড়ি মাথায় ভদ্রলোক। একেবারে চোস্ত শিখ।
দু-চারদিন কাজের পর সর্দারজির সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠল প্রেমতোষবাবুর। সেই সময়ে। একটা চমকপ্রদ তথ্য অবগত হলেন তিনি।
সর্দারজি মোটেই পাঞ্জাবি নন। তিনি ষোলো আনা বাঙালি। তার নাম রামকিষেণ সিং নয়, রামকৃষ্ণ সিংহ। হুগলি জেলার লোক। গুরুমুখী ভাষা মোটেই জানেন না, খুচখাচ হিন্দি আর ইংরেজি ও বাংলা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেন।
রামকৃষ্ণবাবুর কাছেই প্রেমতোষবাবু জানতে পারলেন এসব ব্যবসায় বাঙালিদের কদর খুব কম, এমনকী বাঙালিরাও কদর করে না, বরং পারলে শত্রুতা করে, শিখ কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে সেটা সাহস পায় না। তা ছাড়া বাংলা জানা অবাঙালিদের এখন খুব রমরমা। সেই সুযোগটাই রামকৃষ্ণবাবু সদ্ব্যবহার করেছেন।
কাজের জায়গা থেকে বাড়ি ফেরার সময় কোনও কোনও দিন রামকৃষ্ণ প্রেমতোষকে বাড়িতে নামিয়ে দেন। ভদ্রতার খাতিরে একদিন প্রেমতোষ রামকৃষ্ণকে বললেন, একটু বসে এক কাপ চা খেয়ে যান।
