প্রেমতোষ মাইনে যা পান তাতে এক মাসের আয়ে একটা নতুন সেট টিভি কেনা চলে। কিন্তু প্রেমতোষ মিতব্যয়ী লোক। সব কিছুতে একটু সাশ্রয় করার চেষ্টা করেন। বাজারে ছোট আলু, ছোট পটল কেনেন। কেজি প্রতি পঞ্চাশ পয়সা কম লাগে বলে।
এরকম তো অনেকেই করে। কিন্তু প্রেমতোষের সাশ্রয় করার ধরনটা একটু অন্যরকম। একটা ছোট উদাহরণ দিই।
সকালবেলায় অফিস যাওয়ার আগে স্নান করার সময় তিনি দাড়ি কামান। দাড়ি কামানোর পরে সাবানের বুরুশ কিন্তু ধুয়ে ফেলেন না। বুরুশটা ধুয়ে ফেলেন ভাত খেয়ে উঠে আঁচানোর সময়। এতে হাত ধোয়ার জন্যে আর আলাদা করে সাবান লাগে না, বুরুশের সাবানেই কাজটা হয়ে যায়, বুরুশটাও ধোয়া হয়ে যায়। তা ছাড়া দাড়ি কামানোর সাবানের একটা সৌরভ আছে, তাতে হাতে একটা সুগন্ধ লেগে থাকে।
রঙিন টিভি কেনার ব্যাপারে একটা মওকা পেয়ে গিয়েছিলেন প্রেমতোষ। হঠাৎ রবিবারের ইংরেজি কাগজে একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছিল, একটি গুজরাতি পরিবার বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাদের বাড়ির জিনিসপত্র ফার্নিচার, টিভি, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি তারা সেই রবিবার সকালেই নিলামে বেচে দেবে।
সাহেব পাড়ায় মিডলটন স্ট্রিটের ঠিকানা। পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে বাস থেকে নেমে খুঁজতে খুঁজতে ঠিকানাটায় পৌঁছে ছিলেন প্রেমতোষ চৌধুরি।
টিভিটা চালু অবস্থাতেই ছিল। হাঁকাহাঁকি করে যে দাম উঠল সেটাও আয়ত্তের মধ্যে। নগদ দাম চুকিয়ে টিভিটা একটা ট্যাকসি করে বাড়ি নিয়ে এলেন তিনি।
বাড়িতে প্রেমতোষবাবু তাঁর এক গোলমেলে দাদার সঙ্গে থাকেন। দুই ব্যাচেলার সংসার দেখাশোনা করে একটি বোবা কাজের মেয়ে। ঠিক মেয়ে বলা চলে না, মধ্যবয়সিনী। প্রেমতোষবাবুর সুবিধে সে বোবা বলে কম মাইনে দিলেও কিছু বলতে পারে না। বোবা মেয়েটির নাম দামিনী। কিন্তু যে কানে শুনতে পায় না, তার নাম দিয়ে আর কী হবে।
দামিনী কিন্তু সেয়ানা আছে। সে ভালই জানে তার কত মাইনে হওয়া উচিত। কিন্তু সে কম মাইনে নেয় এই আশায় যে ওই দুই ভাইয়ের মধ্যে যেকোনও একজন তাকে কখনও বিয়ে করবে। দামিনী সব সময়ে লজ্জানা, ব্ৰীড়ানতা ভঙ্গিতে থাকে। মাঝে মাঝেই জিব কাটে।
দামিনীর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। তার সঙ্গে ঝগড়া করে না পেরে আগের স্বামী পালিয়ে যায়। প্রেমতোষ এ খবর শোনার পর মাথা ঘামিয়ে ছিলেন কী করে বোবা বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করত লোকটা, আর সেই ঝগড়ায় হেরে যেত। কিন্তু পাশের বাড়ির যে বুড়ি দাসী দামিনীকে দেয়, সে প্রথমেই সাবধান করে দিয়েছিল, দামিনী এমনিতে খুব ভাল, কিন্তু বড় ঝগড়াটে।
প্রেমতোষবাবুর দাদা মহীতোষবাবু চিরকাল অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন না। তিনি একটি পাঁচতারা হোটেলের হেলথ ক্লাবের ব্যায়াম নির্দেশক। সেখানে বিভিন্ন বয়সি স্থূলদেহী পুরুষ এবং মহিলার পরিচর্যা করে করে এখন সব কিছুই বড় বড়, মোটা মোটা দেখেন। দানাদার দেখলে ভাবেন রাজভোগ, পাতে ছোট এক টুকরো মাছ দিলে বলেন এত বড় মাছ। অবশ্য প্রেমতোষবাবুর ধারণা অতিরিক্ত শীর্ষাসন করে তার দাদার এই অবস্থা। উলটো দিক থেকে দেখে দেখে দৃষ্টিভঙ্গিটাই পালটিয়ে গেছে।
সে যা হোক, প্রেমতোষ তো পুরনো টিভি সেটটা কিনে বাড়ি নিয়ে এলেন। মহীতোষ জিনিসটা দেখে খুব বিরক্ত বোধ করলেন, মুখে শুধু বললেন, আস্ত একটা সিনেমা বাসায় নিয়ে এলি।
মহীতোষ টিভির ঘরে একদম এলেন না। দামিনী মাঝে মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখে। উদ্দাম নাচের কিংবা ঘনিষ্ঠ প্রেমের দৃশ্যে জিব কেটে পালিয়ে যায়।
দু-চারদিন টিভিটা মোটামুটি চলেছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন চলতে চলতে ফুস করে নিবে গেল।
ইতিমধ্যে প্রেমতোষবাবু বুঝে ফেলেছিলেন, ওই গুজরাতি পরিবারের বিদেশ যাত্রার ব্যাপারটা পুরো ভুয়ো। ওটা একটা কায়দার বিজ্ঞাপন। প্রত্যেক সপ্তাহেই ইংরেজি কাগজের নির্দিষ্ট কলমে ওই একই মিডলটন স্ট্রিটের ঠিকানা দিয়ে একইরকম জিনিসের বিজ্ঞাপন বেরোয়। কখনও লেখা থাকে গুজরাতি পরিবার আমেরিকা যাচ্ছে, কখনও থাকে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান দম্পতি অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছে।
নিতান্ত কৌতূহলবশত পরের এক রবিবার প্রেমতোষবাবু ওই নিলামের ওখানে আরেকবার গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেছিলেন, আগের বার যারা ডাকাডাকি করে নিলাম হাঁকছিল এবারেও প্রায় তারাই তিন হাজার-সাড়ে তিন-পৌনে চার হাজার-চার এই রকম ডেকে ডেকে জিনিসের দাম তুলে দিচ্ছে। তার মানে, এরাও সাজানো মাইনে করা লোক। বিজ্ঞাপন দেখে অনভিজ্ঞ দু-চারজন উটকো। খদ্দের আসে, তাদের ঠকানোর কারবার।
টিভি খারাপ হয়ে যেতে প্রেমতোষ গড়িয়াহাট মোড়ের এক টিভি মিস্ত্রির খোঁজ করলেন। দোকানদার অবশ্য মিস্ত্রি কথাটা পছন্দ করলেন না, তিনি বললেন, মেকানিক ডাকতে গেলে একশো টাকা জমা দিয়ে নাম বুক করতে হবে। ঠিকানা দেখে মেকানিক সময় মতো চলে যাবেন। তারপর তিনি দেখে এসে রিপোর্ট করবেন।
প্রেমতোষ বললেন, উনি কখন যাবেন জানতে পারলে সুবিধে হয়। বাড়িতে বিশেষ কেউ নেই, তা হলে আমি তখন বাসায় থাকব। দোকানদার প্রেমতোষবাবুর ঠিকানা জানতে চাইলেন, খাতাপত্র দেখে বললেন, আপনার দিকে মিস্টার পাল রাউন্ডে যান বৃহস্পতিবার, তার মানে পরশুদিন। দোকানদার আবার খাতা দেখে কী একটা সূক্ষ্ম হিসেব করে বললেন, পরশুদিন তিনটে, সাড়ে তিনটে নাগাদ পৌঁছে যাবে।
