আবার বেরিয়ে গেলাম। সারা দিন স্নান খাওয়া কিছুই হয়নি। তবু চাকরি করতে গেলে কত কী করতে হয়।
থানায় কিছুতেই কুকুর হারানোর ডায়েরি নেবে না। তারপর যখন বললাম পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার, জমাদার কেমন অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগল, তারপর তিন গেলাস জল খেল, কুকুরের বর্ণনা শুনে আরও তিন গেলাস। ডায়েরি লিখে নিয়ে বলল, ঠিক হ্যায়, কাল সুবাহমে মিল যায়গা।
জমাদার সাহেবের কথায় যে খুব ভরসা পেলাম তা নয়, খুঁজে খুঁজে এর পরে সাপ্তাহিক পরগণা বার্তার অফিসে গেলাম। পরগণা বার্তা তখন ছাপা হচ্ছে, পরের দিন রবিবার সকালে বেরোবে। বিজ্ঞাপন আছে শুনে তাড়াতাড়ি ম্যানেজার প্রেস থেকে ম্যাটার নামিয়ে সম্পাদককে ডেকে আনলেন। সম্পাদক একটা বিজ্ঞাপন এসেছে শুনে তিন গেলাস জল খেলেন, তারপর বিজ্ঞাপনটা পড়ে আরও তিন গেলাস জল খেলেন। অনেকক্ষণ পরে দম নিয়ে আমাকে ভাল করে দেখলেন, বললেন, আঁ, পাঁচ হাজার?
যা হোক, আমি ফিরে এলাম। ডায়েরি করে এসেছি আর বিজ্ঞাপন দিয়েছি মহারাজকুমারীকে জানালাম। মহারাজকুমারীর কোনও ভাবান্তর নেই।
একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে, রাতের মধ্যে জানলা ফিরে আসতে পারে। কিন্তু ফিরল না।
পরদিন সকালে উঠে প্রথমেই গেলাম পরগনা বার্তার কার্যালয়ে। ভাবলাম বিজ্ঞাপনটা এনে মহারাজকুমারীকে দেখালে যদি একটু কাজ হয়। আর জানলা যখন নেই, আমার চাকরিও শেষ। আমি মানে মানে কেটে পড়ব।
পরগনা বার্তার অফিসের পথে একটা পত্রিকার স্টল। সেখানে খোঁজ করলাম, না পরগনা বার্তা বেরোয়নি। পরগনা বার্তা অফিসে গিয়ে দেখি দরজা হাটখোলা, মেশিনে আধছাপা পত্রিকা, আশে-পাশে ঘরে বাইরে কেউ কোথাও নেই।
অনেকক্ষণ এদিক ওদিক করে তারপরে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। তাজ্জব কাণ্ড, লোকগুলো সব উধাও হয়ে গেল কোথায়? হঠাৎ পাশের একটা ছোট টিলার নীচে ঝোঁপের ভিতর থেকে সম্পাদক বেরিয়ে এলেন, উসকোখুসকো চুল, চোখ লাল দেখে মনে হয় সারারাত ঘুমোননি, সম্পাদক আমাকে চিনতেই পারলেন না, আমি কিছু বলার আগেই তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, মশায়, একটা মেটে রঙের নেড়ি কুকুর দেখেছেন কোথাও? জানলা বলে ডাকলে সাড়া দেয়!
আমি আর কিছু না বলে এগিয়ে গেলাম। বাজারের পথে প্রেসের ম্যানেজারকে দেখলাম একটা মিষ্টির দোকানের সামনে গোটাকয়েক নেড়ি কুকুরকে জিলিপি খাইয়ে নারকেলের দড়ি দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করছে। পথে এদিকে ওদিকে আরও দু-একজনকে দেখলুম, কেউ একটা কুকুর কাছে নেওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ চেন বকলস নিয়ে ঘুরছে, মনে হল এদের কাউকে কাউকে যেন কাল ওই প্রেসে দেখেছি।
থানায় গেলাম। লক-আপ মালখানা পর্যন্ত হাটখোলা, সেপাই জমাদার দারোগা কয়েদি বা আসামি পর্যন্ত নেই। বারান্দায় একটা বেল, ঘণ্টা পেটা হয় তাতে। একটা বাচ্চা ছেলে একটা টুলের ওপর ওঠে ছুটির ঘণ্টা ইস্কুলে যেভাবে পেটায় সেইভাবে ঢং ঢং করে বাজাচ্ছে।
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার?
সে বলল, ছুটি। আজ কুকুর হারানোয় ছুটি হয়ে গেছে। বাবা কুকুর খুঁজতে গেছে। বলে আরও ঢং ঢং করে ঘণ্টা পেটাতে লাগল।
আমি ক্লান্ত অবস্থায় পুকুরপাঁতিয়া নিবাসের দিকে ফিরলাম। একটা মোড় ঘুরলে প্রায় শ তিনেক গজ দূরে বাড়িটা, সেই মোড় পর্যন্ত পৌঁছে ভীষণ হট্টগোল হইচই, শ দেড়েক কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনতে পেলাম। এগিয়ে দেখি সাংঘাতিক ব্যাপার। সেপাই, জমাদার, দারোগা, কম্পোজিটার, মেশিনম্যান, প্রেস ম্যানেজার কারওর কোলে, কারওর কাঁধে, কারওর হাতে নারকেলের দড়িতে বাঁধা চেন বকলসে লটাকানো অসংখ্য নেড়ি কুকুরের একটা হাট জমে গেছে নিবাসের সামনে। আর সমস্ত কুকুর পরস্পরকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে, কোথাও বা রীতিমতো মারামারি চলছে।
দূর থেকে পুকুরপাঁতিয়া নিবাসের ভিতরের দিকে তাকালাম। দেখলাম চিনেমাটির প্লেট থেকে রোদ্দুরে শুকোতে দেওয়া কার্টিজগুলো মহারাজকুমারী স্থির হাতে একটা একটা করে রিভলভারের মধ্যে ভরছেন।
আমার আর পুকুরপাঁতিয়া নিবাসে ফেরা সম্ভব হয়নি। প্রায় দিন তিনেক পরে কলকাতায় খবরের কাগজে একটা সংবাদ পড়েছিলাম, মফস্সল বার্তায় কুকুরের উৎপাত এই হেড লাইনের নীচে–
কী এক অজ্ঞাত কারণে শতাধিক কুকুর অদ্য মধ্যাহ্নের কিছু পূর্বে পুকুরপাঁতিয়া নিবাস সমবেতভাবে আক্রমণ করে। এইরূপ ঘটনা এখানে আর কখনও ঘটে নাই। ফলে এতদঞ্চলে যথেষ্ট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইয়াছে। পুকুরপাঁতিয়ার মহারাজকুমারী বিরাটেশ্বরী দেবীকে অবশেষে আত্মরক্ষার্থে রিভলভার পর্যন্ত চালাইতে হয়। সৌভাগ্যবশত ঘটনার সময়ে সেপাই জমাদার সহ স্থানীয় থানার দারোগা অকুস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনিই অবস্থা আয়ত্তে আনেন। সংবাদপত্র পরগণা বার্তার প্রতিনিধিরাও অকুস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং অবস্থা আয়ত্তাধীনে আনিতে থানার দারোগাকে যথেষ্ট সাহায্য করেন।…
নীল আলো
নিলামে একটা রঙিন টিভি কিনেছিলেন প্রেমতোষ। নতুনের দামের প্রায় অর্ধেক দামে। অনেকদিনই একটা রঙিন সেটের শখ ছিল প্রেমতোষের। খোঁজ নিয়ে দেখেছিলেন পাঁচ অঙ্কের টাকা একটা নতুন সেটের দাম।
টাকার পরিমাণ দেখে দমে গিয়েছিলেন প্রেমতোষ। প্রেমতোষের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ তা বলা যাবে না। ফল সংরক্ষণের একটি কেন্দ্রীয় সরকারি আন্ডারটেকিংয়ে ফিনান্স অফিসারের চাকরি করেন তিনি। তার কোম্পানি এখনও কোনও রকম ফল সংরক্ষণের কাজে হাত দেয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে কী করা হবে তারই ছক কষার জন্য শ তিনেক লোক কাজ করে।
