আমার বুকের মধ্যে ঢিব ঢিব করছিল। মহারাজকুমারী কিন্তু কোনও প্রশ্নই করলেন না, শুধু আমার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, বয়েস?
বয়েস বললাম। সামনে একটা স্লেট পেনসিল ছিল, সেটা হাতে নিয়ে আমার বয়েসটা লিখে দশমিক তেরো দিয়ে ভাগ দিলেন, ম্যানেজারবাবুকে বললেন, দেখুন তো ভাগটা।
ম্যানেজারবাবু দেখেশুনে বললেন, ঠিক আছে।
এবার মহারাজকুমারী আমাকে বললেন, না, তুমি বিশেষ অপয়া নও, তোমাকে দিয়ে চলবে।
এর আগে কখনও কুকুর পুষেছি কি না, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয়ে কোনও প্রশ্নই হল না, আমার চাকরি হয়ে গেল। ষাট টাকা মাইনে, খাওয়া-দাওয়া, পরের দিনই যোগ দিতে হবে। বিহারের এক স্বাস্থ্যকর শহরে মহারাজকুমারী দু মাসের জন্য যাচ্ছেন, তার সঙ্গে কুকুর নিয়ে আমাকে যেতে হবে।
জীবনের প্রথম চাকরি কিন্তু কুকুরের ভয়ে প্রাণে এক বিন্দু আনন্দ বা উত্তেজনার সঞ্চার হল না। মহারাজকুমারীর কথা শুনছি আর পরে পরে নটবর মামার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। এতটা দূর হওয়ার পর চাকরিটা আমার পক্ষে না নেওয়া চলে না তবু এই এক মারাত্মক সংশয়।
অচিরেই অবশ্য সংশয় ভঞ্জন হল। মহারাজকুমারীর কথা শেষ হলে ম্যানেজার বললেন, তা হলে সব ঠিক হল, এবারে আপনার ডিউটি বুঝে যান, কুকুরটাকে একবার…
ম্যানেজার বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলেন না, মহারাজকুমারী একেবারে খেঁকিয়ে উঠলেন, কুকুরটা কুকুরটা করছেন কেন, ওর একটা নাম নেই নাকি? ম্যানেজার একটু অপদস্থ এবং বিব্রত বোধ করতে লাগলেন। যা হোক, মহারাজকুমারীর সামনে থেকে গুটি গুটি আমরা তিনজন সরে বেরিয়ে এলাম।
ম্যানেজার বারান্দায় বেরিয়ে এলেন, কুকুরটার নাম হল জানলা।
জানলা? আমি বিস্মিত বোধ করলাম।
হ্যাঁ, ম্যানেজার জানালেন, মনে করুন এমন একজন কেউ মহারাজকুমারীর কাছে এসেছে, যাঁকে মহারাজকুমারী সহ্য করতে পারেন না আবার বলতেও পারেন না চলে যান। সেক্ষেত্রে তিনি কী করবেন? নিজের প্রশ্নেরই উত্তর দিলেন ম্যানেজারবাবু, মহারাজকুমারী কাউকে চেঁচিয়ে বলবেন–এই, জানলা খুলে দে– অতিথি কিছু বুঝতে পারবেন না কিন্তু এদিকে কুকুরটা শেকল থেকে ছাড়া পেয়ে মহারাজকুমারীর কাছে ছুটে আসবে। আর ওই রকম একটা বিশ্রী নেড়ি কুকুরকে সহ্য করবে এমন অতিথি রাজবাড়িতে আসে না।
আমি বিচলিত ভাবে বললাম, নেড়ি কুকুর বলছেন কী মশায়? এই বললেন পুলিশ ডগ, গোয়েন্দা কুকুর?
ম্যানেজারবাবু বললেন, আমি তো দেখেছি স্পষ্ট নেড়ি কুকুর। আপনার মামা এই নটবরবাবু আর আমার শালা দুজনে মহারাজকুমারীর কাছে গোয়েন্দা কুকুর বলে বেচে গেছেন দেড় হাজার টাকায়।
ইতিমধ্যে একটা মেটে রঙের বিশ্রী নেড়ি কুকুর আমাদের সামনে এসে লেজ নাড়তে শুরু করেছে। ম্যানেজারবাবু বললেন, এই হল আপনার জানলা।
এটা পুলিশ ডগ? আমি অবাক হয়ে নটবর মামার মুখের দিকে তাকালাম। নটবর মামা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, চুপ, বলছি না গোয়েন্দা কুকুর। এটাকে দেখলে যদি বোঝা যায় পুলিশ ডগ, তা হলে কাজ হবে নাকি! প্লেন ড্রেসে মানে সাদা পোশাকে ছদ্মবেশ, গোয়েন্দাদের কিছুই জানিস না না-কি?
যা হোক, আমার কী আসে যায়। আমার বরং নেড়ি কুকুর না হলেই অসুবিধে ছিল।
পরের দিন মহারাজকুমারী আর জানলার সঙ্গে হাওড়া স্টেশন থেকে রাতের গাড়িতে রওনা হয়ে গেলাম মহারাজকুমারীর স্বাস্থ্যনিবাসে। সাঁওতাল পরগনা আর কয়লাখনির মধ্যবর্তী অঞ্চলের ছোটখাটো জেলা শহর। বিরাট কম্পাউন্ডওয়ালা মহারাজকুমারীর নিজের বাড়ি পুকুরপাঁতিয়া নিবাস।
এক দিনেই জানলার সঙ্গে আমার বেশ ভাব হয়ে গেল। এমনি কোনও অসুবিধা ছিল না, শুধু নেড়ি কুকুর বোধ হয় ডগ সোপের গন্ধটা মোটেই সহ্য করতে পারে না। আর একটা চার্টে ছয় ঘণ্টা অন্তর ওর টেম্পারেচার রিপোর্ট করতে হয় মহারাজকুমারীকে, এই থার্মোমিটার লাগানোটা ভীষণ কঠিন। নাড়ির গতিরও রিপোর্ট থাকার কথা, কিন্তু কুকুরের নাড়ি শরীরের ঠিক কোথায় বুঝতে না পেরে ঘড়ি দেখে মিলিয়ে আমার নিজের নাড়ির গতি যা হত সেটা রিপোর্ট করতাম।
দু-চারদিন গেল। সপ্তাহে এক দিন জানলার নখ কাটাবার কথা। কিন্তু সারা বেলা খুঁজেও পুরো জেলা শহরে একটাও নাপিত কুকুরের নখ কাটতে রাজি হল না। আমি আর মহারাজকুমারী দুজনে আপ্রাণ চেষ্টা করলাম, কিন্তু না, অসম্ভব। জানলা ভীষণ লাফাতে লাগল। শেষে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে নখ কাটালাম।
বিপর্যয়টা ঘটল এর পরেই। বিকেলে জ্ঞান ফেরার পর জানলা পা উলটিয়ে ঘাড় চুলকোতে গিয়ে। ভীষণ অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগল। নখ কাটা গেছে, লোমের নীচের চামড়ায় কিছুতেই ধার লাগছে না। কী যে হল, ঘর বারান্দায় ছুটোছুটি করতে লাগল। মহারাজকুমারী সব দেখেশুনে আদেশ দিলেন, ওকে আজ রাতে আর বেঁধো না।
এবং ওই রাত্রিতেই জানলা নিরুদ্দেশ হল। পরদিন সকালে যখন আবিষ্কার করলাম জানলা পলাতক, মহারাজকুমারী ভীষণ হইচই বাধিয়ে দিলেন, যেন সমস্ত দোষটা আমার। আমি সকাল থেকে সারা বেলা ধরে সমস্ত তল্লাট চষে ফেললাম কিন্তু কোথাও জানলার কোনও পাত্তা পেলাম। না।
ম্লান মুখে পুকুরপাঁতিয়া নিবাসে ফিরে দেখি সেই প্রথম দিনের মতোই মহারাজকুমারী চিনেমাটির প্লেটে রিভলবারের গুলি কয়টা রোদে দিচ্ছিলেন। মহারাজকুমারী আমাকে দেখে একবার চোখ না তুলে মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন, যেভাবে তোক জানলাকে আমার ফিরে চাই। তারপর এক চোখ বুজে আর এক চোখে রিভলভারের নলটা লাগিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আরও ঠান্ডা গলায় আদেশ করলেন, যাও, থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি করে এসো, কুকুর ফিরে পেলে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, আর এখানে একটা পরগণা বার্তা না কী কাগজ বের হয় সেখানেও একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে এসো।
