আরও নিষ্ঠুরভাবে, দাতে দাঁত চেপে কমষ করে চিবিয়ে চিবিয়ে সদানন্দ আবার আক্রমণ করল, বলে ফেলল, তুই একটা নপুংসক।
ক্ষীণ প্রতিবাদ জানাল বিরাজচন্দ্র, চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, এ কথা বলিস কী করে? জানিস আমার যমজ ছেলে আছে। তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল সদানন্দ, তা হলে এত ভয় পাস কেন? তুই আর তোর যমজ ছেলে। দলেবলে তোরা তিনজন আর ভাস্বতী না আধসতী কী যেন নাম তোর বউয়ের, সে তো একা, তাকে এত ভয় পাস কী জন্যে?
বিরাজ নিরুত্তর।
কে সদানন্দকে বোঝাবে যে নিতান্ত শিশু, দুই যমজ পুত্রসন্তান কীভাবে রক্ষা করতে পারে তাকে, আর তা ছাড়া তারা যে মায়ের পক্ষে না গিয়ে বাপের পক্ষেই যাবে তারই বা নিশ্চয়তা কী।
বিরাজের স্তব্ধতা আরও ক্ষিপ্ত, প্রজ্বলিত করে তুলল প্রাণের বন্ধু সদানন্দকে। এবার মোক্ষম কথা বলল সে, আসলে তুই একটা ছুঁচো, একটা ইঁদুর, একটা নেংটি ইঁদুর।
এতক্ষণে ম্লান হেসে বিরাজচন্দ্ৰ কবুল করল, সদানন্দের অভিযোগ মোটেই সত্যি নয়, সে মোটেই ইঁদুর, ছুঁচো কিংবা নেংটি ইঁদুর নয়।
রাশভারি ফৌজদারি উকিলের মতো সদানন্দ জেরা করল, এ বক্তব্যের সমর্থনে কোনও প্রমাণ আছে?
অধিকতর ম্লান হেসে বিরাজচন্দ্র বলল, অবশ্যই আছে।
এই প্রথম বাধা পেয়ে সদানন্দ একটু থমকে গিয়ে বলল, একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করল, কী প্রমাণ দিতে পারিস তুই, তুই যে ইঁদুর নয়, সে কথাটা বোঝানোর জন্যে।
বিরাজ বলল, খুব সোজা প্রমাণ। আমি যে ইঁদুর নই, সেটা আমি বুঝতে পেরেছি এইজন্যে যে, আমার বউ মানে ভাস্বতী, ইঁদুর দেখে ভীষণ ভয় পায়। আমি যদি ইঁদুর হতাম তাহলে আমাকে দেখে ও নিশ্চয় ভয় পেত।
অবশেষে শেষ তীর নিক্ষেপ করল সদানন্দ। বলল, তাহলে তুমি একটা আরশোলা।
বিরাজ অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে জবাব দিল, না আমি আরশোলাও নই। আমার বউ আরশোলাও খুব ভয় পায়।
বিরাজচন্দ্র এবার ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ছুটে গিয়ে সদানন্দ তার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে তুমি কী?
গমনের গতি বিন্দুমাত্র না থামিয়ে, রোষকষায়িত ভাস্বতীর মুখমণ্ডল স্মরণে রেখে উপনিষদের ভাষায় উত্তর দিল বিরাজ, সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি।
নিরুদ্দেশ জানলা
নটবর মামা একদিন এসে বললেন, কুকুর পুষেছিস কখনও? তখন আমার একটা কাজের খুব দরকার। আত্মীয়-বন্ধু, জানা-চেনা সবাইকে অনুরোধ করে ক্লান্ত হয়ে গেছি। চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির কম্পাউন্ডার থেকে রেলের টিকেট কালেক্টর প্রত্যেক দিন ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছি।
এমন সময় নটবর মামাই আনলেন এই কাজের খবরটা। একটা কুকুরের দেখাশোনা করতে হবে, পুকুরপাঁতিয়ার মহারাজকুমারী বিরাটেশ্বরী দেবী নাকি এমন একজন লোকের অনুসন্ধান করছেন, যে কুকুরের তত্ত্বাবধান, পরিচর্যা ইত্যাদিতে মোটামুটি অভ্যস্ত।
অল্প বয়সে দু-একটা নেড়ি কুকুরকে পাতের ভাত খাইয়েছি, একবার সপ্তাহ দুয়েক রাস্তা থেকে একটা কুকুরের বাচ্চা কুড়িয়ে এনে ইজের বাঁধবার দড়ি গলায় বেঁধে পোষ মানাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সে নেড়ি কুকুর হলে কথা ছিল, এইসব রাজা-মহারাজাদের কুকুর দশাসই বুলডগ কিংবা অ্যালসেসিয়ান-ই হয়তো হবে। চাকরির আমার খুব দরকার, কিন্তু…
আমার দোনামনা ভাব দেখে নটবর মামা বললেন, তুই একটা সামান্য কাজও যদি না করতে পারিস, এই দুর্দিনে কাজ দেবে কে তোকে? তোদের বয়েসে রং-মিস্ত্রিদের সঙ্গে কাজ করেছি, মনুমেন্ট-হাওড়া ব্রিজের মাথায় উঠে রং মাখিয়েছি।
আমি বললাম, রাজা-মহারাজার কুকুর, কী জাতের কে জানে, শেষে কামড়ে-টামড়ে মেরে ফেলবে নাকি!
নটবর মামা বললেন, তবু চল, দেখাই যাক না। তার কথায় কী যেন এক আশ্বাসের আভাস রয়েছে।
পরের রবিবার সকালে নটবর মামা আমাকে নিয়ে গেলেন পুকুরপাঁতিয়ার মহারাজকুমারীর। কাছে। পুকুরপাঁতিয়ার ম্যানেজারের এক শালা নটবর মামার কী করে যেন পরিচিত, সেই সূত্র। বরানগরে এক বিরাট বাড়ি; পুকুরপাঁতিয়ার মহারাজার ওই হল কলকাতার বাসা। মহারাজা দীর্ঘদিন পরলোকগত, একমাত্র সন্তান মহারাজকুমারী, এখন প্রায় চল্লিশ বছর বয়েস হল, নটবর মামা যতদূর জানেন, বোধহয় অবিবাহিতা।
রাজবাড়িতে গিয়ে প্রথম ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা হল। তিনি বললেন, আপনি এ কাজ আগে কখনও করেছেন?
আমার হয়ে নটবর মামা বললেন, না, এর আগে এরকম সুযোগ পায়নি।
আমি উশখুশ করছিলাম ম্যানেজারকে আর বিশেষ কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, আপনাদের কুকুরটা কী জাতের বলতে পারেন?
ম্যানেজার আমার দিকে একটু বক্রদৃষ্টিতে তাকালেন, তারপর বললেন, পুলিশ ডগ, গোয়েন্দা পুলিশেরা যে কুকুর পোষে এ হল গিয়ে সেই কুকুর।
ইতিমধ্যে মহারাজকুমারীর তলব এল। ম্যনেজার আমাকে আর নটবর মামাকে নিয়ে উপস্থিত করলেন। আমার তখন কাজ করার ইচ্ছা একেবারে চলে গেছে। পুলিশের কুকুর মানে বিরাট জাতের কোনও অ্যালসেসিয়ানই হবে, তার আদর যত্ন তদ্বির করা আমার সাধ্য নয়।
মহারাজকুমারী ভিতরের বারান্দায় গলা উঁচু গেঞ্জির কাপড়ের কামিজ আর থ্রি-কোয়ার্টার খাকি কাপড়ের প্যান্ট পরে একটা রিভলভারের নল পায়রার পালক দিয়ে পরিষ্কার করছিলেন। সামনে কয়েকটা গুলি একটা চিনেমাটির প্লেটে সাজানো, দেখে মনে হয় যেন আচার রৌদ্রে দেওয়া হয়েছে।
