নতুন বউ ভাস্বতী কিছু মনে করত কিনা বিরাজ তা টের পায়নি। তবে প্রথম প্রথম তারও ইচ্ছে করত, হয়তো ভাস্বতীর টানেই একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে। কিন্তু আজ্ঞা কেটে বেরিয়ে পড়া অত সোজা নয়, আড্ডার একটা মায়া আছে, আকর্ষণ আছে; বউ নতুন থাকবে অল্প দিন, আর আড্ডা চিরদিনের। আর একটা চক্ষুলজ্জার ব্যাপারও তো আছে। বন্ধুবান্ধব উপহাস করবে, টিটকিরি দেবে, বিশ্রী মন্তব্য করবে বউকে জড়িয়ে, নিজের হ্যাংলাপনা নিয়ে কোনও পুরুষমানুষই এটা চায় না, বিরাজও চায়নি। সুতরাং বিরাজ সেই মধ্যরজনী অতিক্রান্ত করেই বাড়ি ফিরত। সদ্য নিদ্রোহিতা ভাস্বতীর চোখেমুখে যে আগুন ঝলসাত, সে ভাবত সেটা প্রেমজ।
রানাঘাটের বাড়ির ভিড়ে ভাস্বতীর সঙ্গে তার কথাবার্তা কমই হত। ভাস্বতাঁকে সে মোটেই বুঝতে পারেনি, তা হলে সে রানাঘাট ছাড়ত না।
কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গেছে। বড় আশা করে গড়িয়ার শেষ প্রান্তের এই একঘরের বাসায়, এতটুকু বাসায় ভাস্বতাঁকে নিয়ে বিরাজ এসে উঠেছে। ভাস্বতী তার সামান্য ছোট সংসার তার নিজের, একান্ত নিজের সংসার, হুঁড়ি কড়াই-খুন্তি, শিল-নোড়া, জানলার পর্দা, দরজার পাপোশ, আলনা-চৌকি, (তক্তপোশ) চোদ্দোফুট বাই বারো ফুট ঘরের মধ্যে যতটা সম্ভব গুছিয়ে নিয়েছে, এমনকী দেওয়ালের এক কোণায় একটা লক্ষ্মীর পট বসিয়ে যথাসাধ্যি ধর্মাচরণের আয়োজন রেখেছে।
দুঃখের কথা, ভাস্বতীর এই ঘর গোছানোর সঙ্গে, সংসার সাজানোর সঙ্গে বিরাজের আড্ডাবাজি মিলছে না।
গড়িয়ার ঘরে এসে প্রথমে বিরাজ মোটেই কিছু টের পায়নি। সে যথারীতি প্রথম প্রথম সেই আগের মতোই, আড্ডা দিয়ে বেশি রাত করে বাড়ি ফিরতে লাগল।
গোড়ার দিকে দু-একদিন ভাস্বতী কিছু বলেনি, কিন্তু ক্রমশ সে কঠোর হতে লাগল। প্রথমে সে দরজা খুলতে দেরি করতে লাগল। অত রাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসে একঘণ্টা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সোজা কথা নয়।
কিন্তু সে-ও ছিল মন্দের ভাল। এরপর দেরি করে এলে ভাস্বতী কঠোর, নিষ্ঠুর সব মন্তব্য করতে লাগল। অন্য একদিন দরজায় তালা দিয়ে দোতলায় বাড়িওয়ালার স্ত্রীর কাছে শুয়ে রইল, বাড়িওয়ালা কাজে কোথায় বাইরে গিয়েছিলেন। বাড়িওয়ালার স্ত্রী একা ঘরে শুতে ভয় পান। পুরো দোতলাটা ফাঁকা। ভাস্বতী বলেছিল, কোনও অসুবিধে নেই, আমি আপনার কাছে শোব। গৃহস্বামীনী ভদ্রতাবশত প্রশ্ন করেছিলেন তোমার বর? ভাস্বতী স্রেফ মিথ্যে জবাব দিয়ে দিল, ওর কোনও অসুবিধে নেই। ও আজ রানাঘাটে যাবে।
কিছু বুঝতে না পেরে, কিছুই না জেনে সেদিন সারারাত বিরাজ তালাবন্ধ ঘরের সামনে বারান্দায় দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে কাটিয়েছিল।
দুঃখের বিষয় এর পরেও বিরাজের চরিত্র সংশোধন হল না। কিছুটা আড্ডার নেশায়, কিছুটা বন্ধুদের বিদ্রুপের ভয়ে সে আচ্ছা তাড়াতাড়ি ছেড়ে আসতে পারল না। দু-একবার চেষ্টা যে করেনি তা নয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুছিয়ে উঠতে পারেনি। বিরাজের খেয়াল ছিল না যে বিয়ের আগে ভাস্বতী পাড়াগাঁয়ের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিল। ক্রমশ মৌখিক কটুক্তির সঙ্গে ভাস্বতী হস্তচালনা শুরু করল। রীতিমতো প্রহার যাকে বলে তাই।
অত রাতে বাড়ি ফিরে দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্র মাথায় বা পিঠে খটাখট হাত-পাখার বাড়ি খাওয়া খুবই দুঃখের। আর, বউ মারছে এ নিয়ে তো চেঁচামেচিও করা যায় না।
নিঃশব্দ নিয়মিত প্রহৃত হতে হতে বিরাজ ক্রমশ সংশোধিত হতে লাগল।
কিন্তু সংশোধনের পথে বহু বাধা। ইতিমধ্যে ভাস্বতী সন্তানসম্ভবা হয়েছে, একসঙ্গে যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে। এবার নিজের টানেই বিরাজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু প্রথম যেদিন সে আড্ডা থেকে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ার চেষ্টা করল বাচ্চাদের শরীর খারাপ এই সাবেকি অজুহাতে, বন্ধুরা কিছু সন্দেহ করেনি।
বিরাজ চলে যেতেই আড্ডাটা কেমন যেন মিইয়ে পড়ল। সদানন্দ একা সামাল দিতে পারল না। সেদিন রাত আটটার মধ্যেই আড্ডা ভেঙে গেল।
পরের দিনও যখন বিরাজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করল, সবাই মিলে বাধা দিল। সেদিন বহু কষ্টে রাত নটা নাগাদ বাড়ি ফিরতে পেরেছিল সে। কিন্তু তাতে অব্যাহতি পায়নি সে, সেদিন বউ তাকে একটা খুন্তি দিয়ে পেটে খোঁচা দিয়েছিল।
ব্যাপারটা বেশিদিন চাপা রইল না। বন্ধুরা ক্রমে ক্রমে জেনে গেল ভাস্বতী বিরাজকে মারধর করে, বিরাজ ভাস্বতাঁকে ভয় পায়, খুব ভয় পায়।
ব্যাপারটা বন্ধুরা ভাল মনে মেনে নিতে পারল না। তারা ঠিক করল বিরাজকে সাহসী করে তুলতে হবে, তাকে আড্ডায় আটকাতে হবেই।
কিন্তু বিরাজ অসহায়, সে বউকে ভয় পায়। এ ঘটনা আর বিস্তারিত করে লাভ নেই। শুধু শেষ যেদিন বিরাজ আড্ডা চিরদিনের জন্যে চলে এল, সেইদিন সদানন্দের সঙ্গে তার বাক্যালাপের কিয়দংশ উদ্ধার করছি।
.
তুই কখনও ভেবে দেখেছিস, তুই একটা কাপুরুষ, কাপুরুষ নম্বর ওয়ান? সদানন্দ চাপা আক্রোশের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল।
বিরাজ কোনও উত্তর দিল না, মাথা নিচু করে বসে রইল।
মৌন থাকা মানেই স্বীকার করে নেওয়া এইরকম একটা পুরনো প্রবাদ আছে।
সুতরাং ধরে নেওয়া যায় যে, বিরাজ স্বীকার করল যে সে কাপুরুষ, কিন্তু পুরনো বন্ধু, প্রাণের বন্ধু সদানন্দ বিরাজচন্দ্রের এই মৌনতা মেনে নিল না।
