কিন্তু গুরুজি রাজি হননি।
গুরুজি পোড় খাওয়া লোক। তিনি এর আগে একবার এলাহাবাদে এক সুন্দরী বালবিধবাকে মন্ত্র দিয়ে হাজতবাস করে এসেছেন। থানা হাজতে পুলিশ বেশ শক্ত দুচার ঘা দিয়েছিল। সে বেদনা এখনও প্রশমিত হয়নি।
আর একবার কলকাতার কাছে চন্দননগরে এক ধনী গৃহিণীকে মন্ত্র দিতে গিয়ে যৎপরোনাস্তি বেকায়দায় পড়েছিলেন। কীসে কী হল কিছু বুঝতে পারেননি গুরুজি। হঠাৎ মন্ত্রদানের নিভৃতকক্ষে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন হই হই করে ঢুকে পড়ে। প্রথমে গৃহিণীকে ঘাড় ধরে বাথরুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে ছিটকিনি দিয়ে দেয়। তারপরে গুরুজিকে গলায় নামাবলির প্যাঁচ দিয়ে টানতে টানতে রাস্তায় বার করে আনে। ভাগ্য ভাল, নামাবলিটি পুরনো ও পচা ছিল। ফলে সেটা ফেঁসে যায়। নাহলে গুরুজি দমবন্ধ হয়ে মারা যেতেন।
এরপর পাড়ার কালীতলায় হাঁড়িকাঠের পাশে বসিয়ে তাঁর সালিশি হয়। বলি-টলি দেয়নি তাকে। কিন্তু পিঠে সিগারেটের হ্যাঁকা দিয়ে ওঁ লিখে তাকে একবস্ত্রে জি টি রোডে ছেড়ে দেয়।
বন্দনা গুরুজির কাছে দীক্ষা নিতে চাইলে গুরুজি প্রথমে শিউরে উঠলেন। তারপর তার হাতে একটা ফর্ম ধরিয়ে দিলেন। সেই ফর্ম শুধু মহিলাদের জন্যে। পুরুষদের দীক্ষা নেওয়ার জন্যে কোনও ফর্ম পূরণের প্রয়োজন পড়ে না। (নারীবাদীরা ব্যাপারটা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। সেই ফর্মে নাম-ঠিকানা-বয়স ইত্যাদি ছাড়াও নীচের দিকে লিখতে হয়, আমি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে ভীত বা প্রভাবিত হয়ে গুরুজির কাছে দীক্ষা নিচ্ছি।নীচে পিতা কিংবা স্বামীর অনুমোদন, আমার কোনও আপত্তি নাই।
বন্দনা আজ কিছুদিন হল গুরুজির কাছ থেকে একটা ফর্ম নিয়ে এসেছেন এবং সলিলকে জোর করছেন ফর্মটি সই করে দিতে, কিন্তু সলিল স্ত্রীকে অত সহজে ধর্মাচার করার সুযোগ দিতে রাজি নন। তিনি বারবারই এড়িয়ে গেছেন। কিছুতেই সই দেননি।
আজ প্রেস ক্লাবে ছয় পেগের মাথায় প্রায় অকারণেই জিরাফের প্রসঙ্গ আসায় সলিলবাবু তার স্ত্রী ও গুরুজির প্রসঙ্গ নিয়ে খুব রসিয়ে গল্প বললেন। সোলেমান বলল, দাদা আপনি সত্যিই বউদিকে পারমিশন দেবেন না? এটা কিন্তু মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করা হচ্ছে। সলিলবাবু বললেন, পারমিশন দেব না তা নয়। কিন্তু আমারও একটা ধর্ম করার আছে। জিরাফসুন্দরী কেবলই বাধা দিয়ে যাচ্ছে। সেটা এবার উশুল করব।
ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বললেন সলিলবাবু। তার ইচ্ছে, বহুদিনের ইচ্ছে বদ্রিনাথের মন্দিরে যাবেন। কিন্তু সলিলবাবুর শ্লেষ্মর ধাত। বন্দনা দেবী স্বামীর মাতলামি ইত্যাদি ব্যাপারে যতই রুক্ষ হোন, তাঁর সুখ-স্বাস্থ্য রক্ষার চেষ্টা করেন। বন্দনা দেবী প্রতিবারই বাধা দেন, তুমি বদ্রিনাথে গেলে ঠান্ডায় জমে যাবে। তোমার যাওয়া হবে না।
সলিলবাবু বলেন, বেশ তো তুমি আমার সঙ্গে চল।
বন্দনা বলেন, আমার গুরুজি আছেন। আমার বদ্রিনাথ লাগবে না।
সলিল বলেন, বদ্রিনাথ সাক্ষাৎ ভগবান। এসব কথা বোলো না। পাপ হবে।
বন্দনা বলেন, আমি গুরু-আশ্রিতা। পাপ হলে গুরুর হবে। আমার কী!
এইভাবেই চলছিল ব্যাপারটা। আজ হঠাৎ প্রেস ক্লাবে এই পড়ন্ত দুপুরে সলিলবাবু সিদ্ধান্ত নিলেন বদ্রিনাথ যাব। অবশ্যই যাব। তার জন্যে বন্দনাকে ছাড়পত্র দিতে হয় তা হলেও রাজি। আমার ধর্ম আমি করব। বন্দনার ধর্ম বন্দনা করবে। এরকম ভাবতে ভাবতে সলিলবাবু বন্ধুদ্বয়কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরাও আমার সঙ্গে বদ্রিনাথ যাবে না কি?
সোলেমান রাজি হল না। কিন্তু কৌশিকবাবু সঙ্গে সঙ্গে রাজি। স্ত্রী চলে গেছেন। খালি বাড়ি। দুদিনের জন্যে বদ্রিনাথ গেলে ভালই হয়। প্রতিবছর বদ্রিনাথের পথ শীতের আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারিখটা জানা দরকার।
সোলেমান উঠে গিয়ে এক ট্যুরিস্ট অফিসে ফোন করে জেনে এল এবার কেদারবদ্রি বন্ধ হচ্ছে ১৭ নভেম্বর। সুতরাং কালকেই রওনা হতে হয়। না হলে দুরাত্রিও থাকা হবে না। বাসে হরিদ্বারে গিয়ে সেখান থেকে অটোতে হৃষিকেশ, আবার সেখান থেকে বাসে বদ্রিনাথ। পুরো দেড় দিনের ধাক্কা। এত ঝামেলা অফ সিজন বলে। ঠিক হল পরদিন সকালে কৌশিকবাবু সলিলবাবুর ওখানে যাবেন। তারপর সেখান থেকে দুজনে স্ট্যান্ডে গিয়ে হরিদ্বারের বাস ধরবেন।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা সলিলবাবু বাড়ি ফিরে দেখেন বন্দনা নেই। রাত সাড়ে নটা নাগাদ গুরুজির ওখান থেকে বন্দনা এলেন। মুখে গুনগুন করছে মীরার ভজন।
কোনওরকম রাখঢাক না করে সলিলবাবু সরাসরি বন্দনাকে বললেন, আমি কাল বদ্রিনাথ যাচ্ছি। মীরার ভজন থামিয়ে দিয়ে বন্দনা বললেন, তুমি নির্ঘাৎ মারা যাবে। ওখানে ঠান্ডায় জমে যাবে। তারপর বললেন, অবশ্য আমার সুবিধেই হবে গুরুজির ফর্মে তোমার সই দরকার পড়বে না। এতক্ষণ বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়েছিলেন সলিলবাবু। তিনি সোজা হয়ে উঠে বসে বললেন, শোনো, একটা চুক্তি হয়ে যাক। আমি তোমার ফর্মে সই দিয়ে দিচ্ছি। তুমি আমার সুটকেসে গরম জামাকাপড় গুছিয়ে দাও। আমি তিন দিনের জন্যে বদ্রিনাথ থেকে ঘুরে আসি।
সঙ্গে সঙ্গে বন্দনা তার ফর্ম এনে সলিলের সই করিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, আমি তোমার সুটকেস একটু পরে গুছিয়ে রাখছি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তুমি চায়ের টেবিলে পেয়ে যাবে।
