এরকম সুযুক্তির পরে আর কথা চলে না। কৌশিকবাবু পুরো আধ গেলাস বিয়ার গলাধঃকরণ করে চোখ বুজে গুনগুন করে হাম তুম এক কামরেমে গাইতে লাগলেন। একই পংক্তি ঘুরে ফিরে বারম্বার।
বেলা বারোটা থেকে সলিল এবং কৌশিক বারের এই একপ্রান্তে বসে। দুজনেই সংসার সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ। ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি ভদকা খেয়েছেন সলিলবাবু। কৌশিকবাবু একটু সাবধান। অল্প অল্প করে বিয়ার খাচ্ছিলেন। তা-ও দু বোতল হয়ে গেছে। একসঙ্গে দুজনের ভদকা ও বিয়ার ফুরোল। আর খাওয়া উচিত নয়। এবার উঠতে হয়। এমন সময় হই হই করে সোলেমান ঢুকল।
সোলেমান বাংলাভাষী, কলকাতার একটি উর্দু কাগজের দিল্লির রিপোর্টার। খুব আমুদে এবং গোলমেলে চরিত্রের।
সে দুবাহু প্রসারিত করে সলিল এবং কৌশিককে আটকিয়ে দিয়ে বলল, দাদারা যাচ্ছেন কোথায় এই ভরদুপুরে? কৌশিক গুম মেরে ছিলেন। কোনও কথা বললেন না। তবে সলিলবাবু বললেন, বাড়ি যাচ্ছি। দুপরে ভাত খেতে হবে না।
দুপুরে বারে মদ খাবেন। আবার বাড়িতে ভাতও খাবেন। এ তো সেই ধর্মে আছ, জিরাফেও আছ। সোলেমান বলল। সোলেমানের আন্তরিকতায় দুজনেই আবার বসলেন। সোলেমান তিনজনের জন্য তিন পেগ ভদকার অর্ডার দিল। কৌশিক আপত্তি করলেন না। যদিও আগে বিয়ার খাচ্ছিলেন। সে যা হোক, পান করতে করতে সলিলবাবু গসগস করতে লাগলেন, ধর্মে আছ। জিরাফেও আছ। জিরাফ কী জন্যে?
একসময় কৌশিক দত্ত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বললেন, এ তো শক্তিদার বিখ্যাত কবিতা। সলিলবাবু একটু রেগে গেলেন, বাংলা কবিতা নিয়ে আমাকে জ্ঞান দিও না। আমি একজন গুলি খাওয়া বাঘ। ফেল করা কবি।
কৌশিক বললেন, তাতে কী হয়েছে? সলিলবাবু বললেন, কিছু হয়নি। তবে তোমার চেয়ে এ ব্যাপারে আমি কিছু বেশি জানি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ধর্মে আছ জিরাফেও আছ নামে কোনও কবিতা নেই। এটা একটা তাঁর বিখ্যাত কবিতার বইয়ের নাম। সলিলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, জিরাফ ব্যাপারটা আমার পছন্দ নয়। সবাই চুপ। জিরাফের ব্যাপারটা সলিলবাবুর একটা যন্ত্রণার দিক। এটা প্রায় সবাই জানে।
সলিলবাবুর স্ত্রী বন্দনা সাধারণ বাঙালি মেয়ের তুলনায় অত্যন্ত বেশি লম্বা। প্রায় পৌনে ছফুট। সেইসঙ্গে অস্বাভাবিক রোগা। সব মিলিয়ে হঠাৎ জিরাফের কথা মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। জানা-চেনারা অনেকে আড়ালে-আবডালে তাকে জিরাফ বলেই বলে।
বন্দনা তথা জিরাফ দেবী লোক খারাপ নন। পাড়াপ্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনের কাছে তার সুনাম আছে। তিনি একটি হিন্দি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা। এখন এই মাঝবয়সে কিছুটা শুচিবায়ুগ্রস্ত, কিছুটা ধর্মপ্রাণা হয়ে উঠেছেন।
নিঃসন্তান এই মহিলার সংসারের উপর টান ক্রমশ কমে আসছে। আর স্বামীকে তো দেখতে পারেন না, বিয়ের পর থেকেই।
দোষটা অবশ্য সলিলবাবুরই। কেউ মদ খেয়ে শ্বশুরবাড়ি যায় ফুলশয্যার দিন। সেদিন শুধু মদ খাওয়া নয় সলিলবাবু রীতিমতো মাতলামিও করেছিলেন। খুড়শ্বশুরের থুতনি ধরে বলেছিলেন, বাবা দীর্ঘজীবী হও। এরপর খেতে বসে সলিলবাবু লাঠি চেয়েছিলেন। সবাই অবাক। শাশুড়ি ঠাকরুন বললেন, বাবা খেতে বসে লাঠি দিয়ে কী হবে? সলিলবাবু জবাব দিয়েছিলেন, বাঁহাতে বেড়াল মারা লাঠি না থাকলে আমার ডানহাতে খাবার ওঠে না।
এই সময় কনিষ্ঠ শ্যালক, বন্দনার ছোট ভাই, সে বন্দনার চেয়েও লম্বা এবং খুবই স্বাস্থ্যবান। সে খাবার ঘরে ঢুকল। সে ধমকের সুরে সলিলবাবুকে বলল, এখানে বেড়াল দেখছেন কোথা! এ প্রশ্নে সলিলবাবু হেসে ফেলেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, বেড়াল নেই? এখানে তো সবাই বেড়াল।
এরপরের ঘটনা সলিলবাবুর পক্ষে সম্মানজনক নয়। তবে বিপদের মুখে পড়ে সলিলবাবু নাকি সেদিন শ্যালকের হাত থেকে নিজের টুটি ছাড়াতে ছাড়াতে স্বীকার করেছিলেন যে না, সব বেড়াল নয়। এ ঘরে দুটো জিরাফ আছে।
তা, এসব অনেককাল আগেকার কথা। প্রায় পনেরো-বিশ বছর হয়ে গেল। এ বিয়ে কী করে যে টিকে আছে ভাবা যায় না। দুজনে একসঙ্গে একই ছাদের নীচে থাকেন। রান্নাঘর খাওয়া-দাওয়া বিছানা এক। শুধু একটি অলিখিত শর্ত আছে। শর্তটি হল কেউ কাউকে ঘটাবে না। এই শর্ত, বলা বাহুল্য সলিলবাবু যতটা মানেন জিরাফ দেবী ততটা মানেন না। এই এতকাল পরেও সলিলের মাতলামির ব্যাপার তাঁর ধাতস্থ হয়নি৷
সলিলবাবু দু-একবার অবরে অবসরে বন্দনাকে বুঝিয়েছেন, আমি হলাম সাংবাদিক। খবরের। কাগজের লোক। আমাকে মাতলামি করতেই হবে। মাতলামি না করলে আমার চাকরি থাকবে না। তুমি জান আমাদের অফিসে যে যত মাতাল তার তত প্রমোশন হয়। এই যে সেবার এক বোতল রাম খেয়ে মাও সে তুং-এর মৃত্যুর দিন নলিনীবাবু হেড লাইন করলেন, চিয়াং কাইশেক পরলোকে। সাতদিনের মধ্যে নলিনীদার এক হাজার টাকা ইনক্রিমেন্ট হল। সে বছর পদ্মশ্রীও পেলেন।
এইসব বাজে কথায় ভুলবার পাত্রী অবশ্য বন্দনা নন। তিনি বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস। তার ছাত্রীরা প্রায় সব কালোয়ার আর মারোয়াড়ি। মিথ্যে কথা শোনার এবং ধরার অভ্যাস যথেষ্ট আছে। স্বাভাবিক কারণে তিনি সম্প্রতি সংসারের উপরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
আজ কিছুদিন হল বাড়ির কাছে গোলবাজারে এক গুরুদেব এসেছেন। বন্দনা তার কাছে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। গুরুজির মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। গুরুজির কথাবার্তা সবই বন্দনাকে মুগ্ধ করেছে। গুরুজির বাছাই বাছাই শিষ্য-শিষ্যা, সংখ্যায় কম। বন্দনা গুরুজির কাছে প্রার্থনা করেছেন তাকে শিষ্যা করতে অর্থাৎ দীক্ষা দিতে ওই যাকে মন্ত্র নেওয়া বলে।
