পরদিন সকালবেলা কৌশিক এসে সলিলের ঘুম ভাঙাল। বন্দনা তখন স্কুলে চলে গেছে। সুটকেসটা টেবিলের উপরে রয়েছে। তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে এক কাপ চা খেয়ে সুটকেসটা নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে সলিলবাবু বেরিয়ে পড়লেন অলকানন্দার তীরে বদ্রিনাথের মন্দিরের উদ্দেশে।
হু-হু করে বাস ছুটে চলেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই হরিদ্বার। পথের পাশের একটা ছোট চটিতে বাস থামল। একটা ছোট চায়ের দোকান। তামার ঘটিতে ছাগলের দুধে প্রচুর গুড় মিশিয়ে ঘন চা তৈরি হচ্ছে। সলিলবাবু বাস থেকে নেমে এলেন।
এতক্ষণ বাসে কিছু বোঝা যায়নি। কিন্তু এখন বেশ ঠান্ডা। চারদিক হিম শীতল। এক গ্লাস চায়ের লোভে সলিলবাবু দাঁড়িয়ে কাঁপছেন।
বন্ধু কৌশিক চালাক লোক। বাস থেকে নামেননি। কাঁচের জানলা দিয়ে আকার-ইঙ্গিতে তার জন্যেও এক গ্লাস চা নিতে বলেছেন।
হঠাৎ উত্তর থেকে আরও ঠান্ডা হাওয়া আসছে। চা হতে দেরি হচ্ছে। বাসও সহজে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। ড্রাইভার, কন্ডাকটর চটির মধ্যে ঢুকে বসে আছে।
অতিরিক্ত ঠান্ডা বোধ হওয়ায় সলিলবাবু বাসে উঠে গেলেন। পায়ের নীচে রাখা সুটকেসটা খুলে একটা মাফলার বা আলোয়ান যাই হোক বার করে কান-মাথা-গলা জড়িয়ে নিতে হবে। সামনের খালি সিটের ওপর সুটকেসটা তুলে ডালা খুলতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সলিলবাবু। কোথায় গরম জামাকাপড়! পুরো সুটকেস ভরতি গত কয়েক মাসের খবরের কাগজ। সলিলবাবু কোনওরকমে উলটোদিক থেকে আসা একটা ভাড়াটে টাটা সুমো গাড়িতে কষ্ট করে উঠে দিল্লি ফিরে এলেন, কৌশিককে ফেলে। ফেরার পথে সমস্তক্ষণ ভাবতে লাগলেন জিরাফসুন্দরীকে এবার কী শিক্ষা দেবেন।
কিন্তু জিরাফসুন্দরী তথা বন্দনাকে কোথায় পাবেন সলিলবাবু। বন্দনাদেবী এখন গুরুজির আশ্রয়ে। স্বামীর ছাড়পত্র নিয়ে তিনি আজকেই গুরুজির আশ্রয়ে চলে গেছেন। ইস্কুলের প্রভিডেন্ড ফান্ড, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদির জন্যে নমিনি স্বামীর নাম কেটে গুরুদেবকে করে দিয়েছেন।
সলিলবাবু আর জীবনেও জিরাফের নাগাল পাবেন না।
নবারুণবাবু সুখে থাকুন
আজ কিছুদিন হল নবারুণবাবু কিছুটা মোটা হয়ে পড়েছেন। নবারুণবাবুর বয়েস এই আগামী পয়লা অগ্রহায়ণে পঁয়তাল্লিশ পূর্ণ হবে। এক স্ত্রী, এক কন্যা। খুব ঝামেলা ঝঞ্জাট নেই তার জীবনে। চিরকাল মাঝারি চাকরি করেছেন, মাঝারি ধরনের উচ্চাশা তার। খুব টানাটানিও নেই তার, আবার খুব সচ্ছলতাও নেই।
ভালভাবেই চলে যাচ্ছিল নবারুণবাবুর দিন। কিন্তু এইসব মাঝারি মানুষদের মধ্যে জীবনে একটা ধাক্কা আসে, মোটা হওয়ার ধাক্কা। মেদবৃদ্ধির প্রাবল্যে শরীরের মধ্যদেশ ফুলে ওঠে। বিনা কারণে শুয়ে-বসে সারাজীবন ধরে যেরকম চলা-ফেরা খাওয়া-দাওয়া হয়েছে তার কোনও পরিবর্তন না হলেও শরীরে অগাধ প্রাচুর্য কোথা থেকে চলে আসে কেউ জানে না।
নবারুণবাবুরও ঠিক তাই হয়েছে। তবে তিনি সুরসিক লোক, তিনি এই বয়েসে এই মোটা হওয়ার নাম দিয়েছেন: মাঝারি মানুষের মাঝারি বয়েসের মাঝারি অসুখ। নবারুণবাবু নিজে এই অসুখ বাধাননি। তিনি যে খুব অলস বা খুব বেশি খাওয়া-দাওয়া করেন তাও নয়। আসলে এই মোটা হওয়ার অসুখটা নবারুণবাবুদের বংশানুক্রমিক। তার পূর্বপুরুষেরা অনেকেই তাদের বিস্তৃতির জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তবে সেকালে মোটা হওয়া ব্যাপারটা নিয়ে লোকরা এত মাথা ঘামাত না, বরং সেটা ছিল সামাজিক মর্যাদার একটি বিশেষ প্রতীক। মা-ঠাকুমারা প্রাণপণ চেষ্টা করতেন ঘি, মাখন, দই, মিষ্টি খাইয়ে তাদের স্নেহভাজনদের মোটা, আরও মোটা, আরও আরও মোটা করতে। তখনও শুরু হয়নি রক্তপরীক্ষা। হার্টের অসুখ এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু একালে মোটা হওয়া বিপজ্জনক। পথে-ঘাটে, অফিসে বাজারে, চেনা-আধোচেনা যাঁর সঙ্গেই দেখা হোক, তিনি একটু ভুরু কুঁচকিয়ে নবারুণবাবুকে জিজ্ঞাসা করেন, আরে নবারুণবাবু যে, একদম চিনতেই পারিনি। সাংঘাতিক মোটা হয়ে গেছেন দেখছি! তারপর একটু থেমে কিছুটা অভিভাবকত্বের ভঙ্গিতে পরামর্শদান, এত মোটা হওয়া ভাল নয়। সাবধানে থাকবেন। মনে আছে। তো নগেনবাবুর ঘটনাটা। আর কিছুই নয়, উভয়েরই পরিচিত নগেনবাবু নামে এক ভদ্রলোককে বছরখানেক আগে রাস্তায় কুকুরে কামড়েছিল। শুভানুধ্যায়ীর বক্তব্যের সারমর্ম হল, নগেনবাবু অতটা মোটা না হলে দৌড়ে পালাতে পারতেন, পাগলা কুকুরের কামড় খেতে হত না, পেটে বড় বড় আঠারোটা ইঞ্জেকশন নিতে হত না।
মোট কথা এই যে নবারুণবাবু নিজে মোটা হয়ে যাওয়ার জন্যে চিন্তিত। ফলে তাঁকে স্থূলতা কমানোর জন্য বাধ্য হয়ে চেষ্টাশীল হতে হল।
ছাত্রজীবনের এক বন্ধুর সঙ্গে একদিন সন্ধ্যাবেলা বাজারে দেখা হলে তার পরামর্শে, বিশেষ করে ওষুধ-ফষুধ খেতে হবে না, তা ছাড়া ঘরের মধ্যেই স্কিপিং করা যাবে, এই সুবিধার কথা ভেবে নবারুণবাবু সেদিনের বাজারে কিছু পয়সা বাঁচিয়ে সেই পয়সা দিয়ে একটা ভাল স্কিপিং রোপ কিনে ফেললেন। বাড়িতে এসে কাউকে কিছু বললেন না।
কিন্তু স্কিপিং করার এত ঝামেলা একথা আগে কে জানত! নগেনবাবু থাকেন একটা পুরনো তেতলা বাড়ির দোতলায়। তার ভারী শরীর নিয়ে তিনি পরদিন সকালে শোয়ার ঘরে লাফাতে গেছেন। প্রথম লাফের শব্দে তার স্ত্রী চোখ খুলে আধো ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ দেখলেন, মালকোঁচা দিয়ে লুঙ্গি পরা নবারুণবাবু হাতে কী একটা লম্বা দড়ির মতো নিয়ে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন শূন্যে হাত তুলে। আগের দিন সন্ধ্যায় বাজার থেকে মাছ না আনায় নবারুণবাবুর সঙ্গে মালতীর, অর্থাৎ তার স্ত্রীর, খুবই কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এখন স্বামীকে শূন্যে হাত তুলে ঘরের মধ্যে আধো অন্ধকারে দড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে মালতী বুঝতে পারলেন নবারুণ মনের দুঃখে ও প্রচণ্ড অভিমানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুকের রক্ত হিম করা একটি সুতীক্ষ্ণ আর্ত চিৎকার করে উঠলেন।
