কাজ হবে মানে পাঁচ মিনিটের মধ্যে হেঁচকি শুরু হবে। চলবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
জয়দেব জানালেন যে এখানে এসেই তিনি খোঁজ নিয়েছিলেন পানীয়ের এবং খুব কাছেই একটি নির্ভেজাল চোলাইয়ের দোকানের খবর পান। প্রতিদিন দারোয়ানকে দিয়ে তাই দু পাঁইট আনিয়ে নেন। এবং তাতেই তার একার চলে যায়।
প্রথম দিন খাওয়ার পর আর তিনি সেবাসদনের হেঁচকি করানো পানীয় গ্রহণ করেননি। সারারাত এবং পরের দিন সারা সকাল হেঁচকি উঠেছিল। তিনি নিশ্চিত যে পনেরো দিন কেন মাত্র এক সপ্তাহ যদি ওই পাউডার দেয়া নেশা কেউ করে, তা হলে সারা জীবনের মতো নেশা করার শখ তার কেটে যাবে।
গত এগারো দিন জয়দেব নিজে সন্ধ্যায় চোলাই খেয়েছেন আর ওই পাউডার দেয়া পানীয় তার জলের কুঁজোয় সঞ্চিত করে রেখেছেন। আজ সন্ধ্যাবেলায় ডাক্তার মল্লিক সমেত সেবাসদনের সমস্ত কর্মচারী এবং নেশার রোগীদের জয়দেব আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সবাইকে তার জন্মদিন এই কথা বলে। যারাই জয়দেবের পানীয় গ্রহণ করেছে তাদের পরিণতি মহিমাময় চোখের সামনেই দেখতে পেয়েছেন। ওই তো পিছনের বারান্দায় থাম ধরে দাঁড়িয়ে ডাক্তার মল্লিক নিজেই হেঁচকি তুলছেন। শুধু জয়দেব নিজে খাননি। তাই ঠিক আছেন।
মহিমাময়ের কেমন কৌতূহল হল। মদের নেশাটা ছেড়ে দেবার তাঁর নিজের অনেকদিনের ইচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই ছাড়তে পারছেন না। জয়দেবকে তিনি বললেন, ওই পাউডার দেয়া মদ তোর আর আছে?
জয়দেব বললেন, একটু থাকতে পারে কুঁজোর নীচে। তুই খাবি নাকি? খুব হেঁচকি উঠবে কিন্তু। মদ খাওয়ার সব শখ মিটে যাবে।
মহিমাময় বললেন, আমি শখটা মেটাতেই চাই। এই বাজে নেশাটা ছাড়তে পারলেই বাঁচি। আর যা খরচা বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মদের দাম।
কুঁজোর তলা থেকে গেলাস দুয়েক পানীয় বেরোল, পানীয়টা উৎকৃষ্ট ভাল হুইস্কিই হবে। পাউডারের গুঁড়োর তলানি বোধহয় নীচে বেশি পড়েছিল, তাই একটু ঝঝ বেশি। প্রতিফল পেতে পাঁচ মিনিট কেন দু মিনিটও লাগল না। গগনচুম্বী সব হিক্কা উঠতে লাগল মহিমাময়ের, অস্থির বোধ করতে লাগলেন, গা গোলাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন মহিমাময়। সেবাসদন থেকে বেরোনোর মুখে দেখলেন ডাক্তার মল্লিক আর মমতাজ দেবী সিঁড়ির প্রান্তে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে যুগ্ম হিক্কা তুলছেন। সামনের গেটের উপরে দারোয়ান আর কুঞ্জলালবাবু বসে, তাদের হেঁচকির আন্দোলনে ভারি গেট কাঁপছে।
মহিমাময়ের অবস্থাও সুবিধের নয়। কোনও রকমে রিকশায় বড় রাস্তায় পৌঁছে, সোজা ট্যাকসি নিয়ে বাড়ি। তখন হিক্কার গমক আরও বেড়েছে।
বাড়ি ফিরে গেলাসের পর গেলাস সাদা জল খেলেন। মহিমাময়ের স্ত্রী তার মাথায় ব্রহ্মতালুতে জোরে জোরে চাপড় দিলেন। মহিমাময় বীভৎস সব সমস্যার কথা ভাবতে লাগলেন। কিন্তু হিক্কার গতিও তো বেড়েই চলল।
এমন সময় সামনের টেবিলে সেদিনের ডাকে আসা চিঠিপত্রগুলো মহিমাময়ের চোখে পড়ল। সবচেয়ে উপরে রয়েছে ইলেকট্রিক বিল। গত মাসে দুশো দশ টাকা হয়েছিল। এবার বিল খুলে দেখলেন উঠেছে সাতশো বারো টাকা চল্লিশ পয়সা। তবে ওই চল্লিশ পয়সা এ মাসে দিতে হবে না। পরের মাসের হিসেবে যাবে।
সাতশো বারো টাকা বিল পেয়ে মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারের উপরে বসে পড়লেন মহিমাময়। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেতে বাড়ির সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সব ঘরের আলো-পাখা নিবিয়ে দিলেন। স্ত্রী রান্নাঘরে হিটারে মাছের ঝোল রাঁধছিলেন, মেয়ে টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখছিল–সব সুইচ তিনি অফ করে দিলেন। এবং তার পরেই ঘোর অন্ধকারে হঠাৎ একটা মুক্তির আনন্দ অনুভব করলেন। তিনি টের পেলেন যে তার আর হিক্কা উঠছে না।
অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে টেবিলের কাছে গিয়ে ইলেকট্রিক বিলটা হাতে নিয়ে কপালে ঠেকালেন। তারপর সন্তর্পণে একটা আলো জ্বালিয়ে দেরাজের নীচের থেকে একটা ছোট রামের বোতল বার করে নির্জলা খেতে লাগলেন। এখন আর হিক্কা উঠল না।
ধর্মাধর্ম
স্থান : দিল্লি প্রেস ক্লাব। একতলায় বার তথা রেস্তরাঁ।
তারিখ : ১৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার।
সময় : বেলা আড়াইটে।
দুজন মধ্যবয়সি সাংবাদিক মুখোমুখি বসে আছেন। এই দুই বাঙালি ভদ্রলোক দুজনে দুই বিপরীতমুখী সংবাদপত্রের বিশেষ সংবাদদাতা। কিন্তু দুজনের ভিতরে ব্যক্তিগত হৃদ্যতার অভাব নেই।
এর মধ্যে একজন হলেন কৌশিক দত্ত। অন্যজন সলিল দে।
সলিলবাবু এবং কৌশিকবাবু দুজনাই সমবয়েসি, পঞ্চাশের এদিকে ওদিকে বয়েস।
দুজনেই ভারি দুঃখী। তাঁদের স্ত্রীরা স্বামীদের মানুষের মধ্যে গণ্য করেন না।
কৌশিকবাবুর স্ত্রী ওখানে দিল্লিতে থাকেন না। কলকাতায় কলেজের অধ্যাপিকা তিনি, সুমলিনা দত্ত, পুজোর ছুটিতে কলকাতা থেকে স্বামীর কাছে দিল্লিতে ফিরেছিলেন। কালকেই কলকাতায় আবার চলে গেছেন। এঁদের একটি মেয়ে। তারও কলকাতায় বিয়ে হয়েছে।
সলিলবাবু লেবু দিয়ে ভদকা খাচ্ছিলেন।
লেবু ফুরিয়ে গেছে। বেয়ারাকে চেঁচিয়ে বললেন, লেবু।
লেবু এল। লেবু চিপে দুটো রস ভদকায় মেলালেন সলিলবাবু।
একবার সেদিকে তাকিয়ে কৌশিক বললেন, এত লেবু খেয়ো না, অম্বল হবে। চোয়া ঢেকুর উঠবে।
লেবু না খেলেও আমার অম্বল হয়, চোয়া ঢেকুর হয়। পরিতৃপ্তির সঙ্গে এক চুমুক ভদকা কণ্ঠস্থ করে সলিলবাবু বললেন, তবু লেবুর রস দিয়ে খেলে অম্বলটা একটু সুস্বাদু হয়, জিবটা তেতো হয় না।
